উচ্চশিক্ষাক্যারিয়ারফিচাররিভিউশিক্ষা

আইন: কেন পড়বেন, কোথায় পড়বেন?

পৃথিবীর সুপ্রাচীন পেশা হিসেবে আইন পেশা বা ওকালতি বেশ পরিচিত। বহু আগে থেকেই এই দেশে আইনকে বেশ সম্মানজনক পেশা হিসেবে দেখা হয়। এক সময়, বিশেষ করে ব্রিটিশ ভারতে আইন পেশায় যুক্ত হওয়াকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখা হতো। যা এখনও বহাল আছে। উকিল, ব্যারিস্টার, বিচারক, বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেল, ইত্যাদি নামগুলো শুনলেই আমাদের মনে প্রথম আসে আইনের কথা। আইনের ছাত্রছাত্রীরা সাধারণত এই ধরণের পেশায় যুক্ত হন। চলুন আজ জেনে নেওয়া যাক “আইন” বিষয়ে পড়াশোনা, এর ভবিষ্যত ও ক্যারিয়ার নিয়ে।

আইন পেশার আদ্যোপান্ত

আইন কেন পড়বেন?

যদি আপনার স্বপ্ন থাকে একজন আইনজীবী বা বিচারক হওয়ার, তবে অবশ্যই আপনাকে ল পড়তে হবে। শুধু কি তাই? এ বিভাগে পড়াশোনা করলে আপনি আইনজীবী বা বিচারক হওয়া ছাড়াও আরও অসংখ্য ক্ষেত্রে নিজের ক্যারিয়ারকে সমৃদ্ধ করতে পারবেন। আইনের মত মহৎ পেশায় যুক্ত থেকে যে কেউ তার মেধা ও শ্রম নিয়োগ করে প্রতিনিয়ত কাজ করে যেতে পারেন শোষিতের পক্ষে। আত্মনিয়োগ করেন রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায়। “ল” থেকে ডিগ্রি অর্জন করে দেশের সেবায়, সবার জন্য সুবিচার নিশ্চিতকরণে আপনিও কিন্তু বিরাট অবদান রাখতে পারেন। এই বিভাগে পড়ে আপনি দেশ বিদেশের বিভিন্ন ল, সংবিধানের নানান ধারা সম্পর্কে জানতে পারবেন। প্রত্যক্ষ জনসেবার পাশাপাশি দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতেও ভূমিকা রাখতে পারবেন আপনি!

আইন বিষয়ক ক্যারিয়ার:

আইন খুবই বিস্তৃত বিষয়। তবে এ দেশে পেশাগত ক্ষেত্রে আইনের সঠিক বিকাশ হয়নি বলে মানুষ এখনো কয়েকটি গতানুগতিক পদ্ধতির কথাই ভাবে। যেমন, আদালতে ওকালতি, বিচারক কিংবা শিক্ষক হওয়া। তবে এর বাইরে আরও অনেক অনেক কিছুই করা সম্ভব। যেমন আইন পড়ে গবেষকও হওয়া যায়। গবেষণা যে শুধু আইনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে তা নয়। সমাজবিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব, অর্থনীতি, মেডিকেল সায়েন্স সবকিছুর সাথেই আইন নিয়ে গবেষণা সম্ভব। এ কারণে আইনকে আন্তঃগবেষণা ক্ষেত্রও বলা যায়। পৃথিবী যতই এগিয়ে যাক না কেন, আইন পেশার গুরুত্ব সব সময় থাকবে। কেননা মানু্ষ যতদিন আছে, আইনী জটিলতা, অপরাধ আর নিত্যনতুন আইন তৈরি ও বিলুপ্তির প্রক্রিয়া ততদিন চলমান থাকবে।

আরও পড়ুন# গুচ্ছে সাবজেক্ট চয়েজ দেবেন যেভাবে!

আইনজীবী হিসেবে সফল ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ তো আছেই। এছাড়াও আইনের শিক্ষার্থীরাও প্রায় সব নন টেকনিক্যাল পদে অনায়াসে ক্যারিয়ার গড়তে পারেন। ‘জুডিশিয়াল সার্ভিস’ অর্থাৎ সহকারী জজ ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ‘সরকারি ফার্স্ট ক্লাস গেজেটেড অফিসার’ হওয়ার সুযোগ আছে, যা শুধু আইনের শিক্ষার্থীদের জন্যেই বরাদ্দ। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের ক্যাডার হিসেবে পররাষ্ট্র, প্রশাসন, পুলিশ, কাস্টমস ইত্যাদি নন টেকনিক্যাল ক্যাডারে যোগ দিতে পারবেন। শিক্ষকতার কথা বিবেচনা করলে দেশের প্রায় প্রতিটি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের শিক্ষকের চাহিদা আছে। কমিশনড অফিসার পদমর্যাদায় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীতে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ‘জাজ অ্যাডভোকেট জেনারেল’ হিসেবে যোগ দেওয়া যায়। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘সহকারী সচিব’ হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার কথাও ভাবতে পারেন।

এ ছাড়া বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি দূতাবাস, ব্যাংক ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে ‘ল অফিসার’ হিসেবে নিয়োগ পাওয়া যায়। দেশের বিভিন্ন আদালতে সরকারি আইন কর্মকর্তা বা পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হিসেবে নিয়োগ হয়। বিদেশে ইমিগ্রেশন কেস অফিসার বা ল অফিসার হিসেবে কাজ করেন অনেকে। তা ছাড়া মানবাধিকার কিংবা নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে যদি কেউ কাজ করতে চান, তবে তাঁর জন্য সেরা প্ল্যাটফর্ম আইনপাঠ।

আইনের ডিগ্রিধারীদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা—যেমন ইউএনএইচসিআর, ইউএনডিপি, ডব্লিউএইচও, ইউনিসেফ, আইওএম, আইএলও ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ। আইনি পরামর্শক বা উপদেষ্টা হিসেবেও ক্যারিয়ার গড়তে পারেন।

কোথায় পড়বেন আইন?

দেশের প্রায় প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই আইন অনুষদ বা বিভাগ রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এ চারটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববদ্যালয়েই রয়েছে এই বিভাগ। এসব বিভাগ সারা দেশ তো বটেই, আইন বিষয়ক পাঠদানের ক্ষেত্রে গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেও পেয়েছে প্রশংসা। এছাড়াও অন্যান্য প্রায় সব পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে আইন বিভাগ। এসব বিভাগে চার বছর মেয়াদী স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি চালু আছে। ব্র‍্যাক, নর্থ সাউথ, গ্রিন ইউনিভার্সিটির মতো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ নামডাক। এছাড়াও সরকারি বেসরকারি ল কলেজগুলোতে রয়েছে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ।

কী কী পড়ানো হয়?

আইন বিষয়ের সকল দিক আলোচনা করা হয়ে থাকে। এই বিষয়ের সমস্ত কোর্সই খুব বেশি গুরুত্বপূর্ন। দেশ চালনার কেন্দ্রবিন্দুতে আইনের অবস্থান তা বলে বোঝানো লাগবেনা আশা করি। সংবিধান বলেন বা বিচারব্যবস্থা সবই এই আইনের মাধ্যমেই আইনের শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত।

আরও পড়ুন# হাওয়াই মিঠাই : বাংলার ঐতিহ্যবাহী মিঠাই

তবুও যদি গুরুত্বপূর্ন কোর্সের কথা বলতেই হয় তবে জুরিস্প্রুডেন্স, কন্সটিটিউশনাল ল, কন্ট্রাক্ট ল, CPC, পেনাল কোড, CrPC, মুসলিম ফ্যামিলি ল, হিন্দু ও ক্রিস্টান ফ্যামিলি ল, ট্রান্সফার অফ প্রোপার্টি ল, ল্যান্ড ল, ক্রিমিনোলজি, কোম্পানি ল, মেডিকেল জুরিস্প্রুডেন্স সহ প্রায় ৫০ টির অধিক কোর্স পড়ানো হয়।

আছে আইন বিষয়ে বৃত্তির সুযোগ:

বাইরে স্কলারশিপ পেতে হলে একাডেমিক রেজাল্ট ভালো থাকা চাই। এল এল বি করে এল এল এম এর জন্য বাইরে যেতে পারেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের প্রতিটি শিক্ষকই তিন চারটি দেশ থেকে ডিগ্রিধারী। প্রথম বর্ষের এক শিক্ষিকা কিছুদিন আগেই অক্সফোর্ড পাড়ি দিয়েছেন,এর আগে তিনি ছিলেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। এমন কি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া সহ নামকরা দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে রয়েছে অনেক অনেক সুযোগ। বেশিরভাগ দেশেই আইন বিষয়ক পড়াশোনা বেশ ব্যয়বহুল। তাই এসব বৃত্তি যে কোনো শিক্ষার্থীর জন্যেই বেশ লোভনীয়!

শেষ কথা:

আইন বিষয়ে পড়ার জন্যে চাই তুখোড় মেধা ও একাগ্রতা। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম সারিতে থাকা শিক্ষার্থীরাই ল পড়ার সুযোগ পায়। এজন্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির শুরুতে নিতে হবে বেশ যত্নের সাথে। যথাযথ অনুশীলন আর পড়াশোনার মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষায় খুব ভালো ফলাফল করতে পারলে তবেই না মিলবে বহুল আকাঙ্ক্ষিত এই বিভাগ! তাই গড়িমসি না করে প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে থাকুন। সফলতা আসবেই!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button