ঐতিহ্যটিপস এন্ড ট্রিকসফিচারলোকসংস্কৃতি

ইলিশের বাহারি পদ!

ভোজান রসিক বাঙালির অত্যন্ত প্রিয় মাছ ইলিশ। স্বাদে অতুলনীয়, বর্ণে রূপালী, গন্ধে মোহনীয় ইলিশ যুগ যুগ ধরেই বাংলার মানুষের রসনা তৃপ্তি মিটিয়ে আসছে। তাইতো মাছের রাজা ইলিশ নিয়ে বাঙালির বিভিন্ন পদ তৈরির শেষ নেই। এক ইলিশের হাজার পদ। অঞ্চলভেদেও রয়েছে ইলিশ মাছের ঐতিহ্যবাহী বাহারি পদ রান্না। যা সে অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে জড়িয়ে আছে। সাধারণত ইলিশের মৌসুমে নদী ও সাগর মোহনায় জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ মাছ ধরা পড়ে। বাংলাদেশে বিশ্বের মোট ইলিশের প্রায় ৮৫% উৎপাদিত হয়। তাইতো ইলিশের মৌসুমে পড়ে যায় ইলিশের রকমারি পদের ধুম আর বাড়িতে বাড়িতে তৈরি হয় ইলিশের সুস্বাদু খাবার। চলুন আজকে জেনে নিই- ইলিশের কিছু বাহারি পদ সম্পর্কে!

ইলিশের বাহারি পদ:

বরিশালের ঐতিহ্যবাহী ইলিশ মাছের মরিচ ট্যাঙ্গা:

বর্ষাকালে বরিশালে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ে। তাই এসময়ে ইলিশ রান্নার হিড়িক পড়ে বরিশালের বিভিন্ন বাড়িতে। ইলিশের সাথে জড়িয়ে আছে বরিশালের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। বরিশালের ঐতিহ্যবাহী ইলিশ মাছের মরিচ ট্যাঙ্গা খুবই জনপ্রিয় ও সুস্বাদু একটি খাবার। যা বরিশালের মানুষের খুবই পছন্দের। ইলিশ মাছ, সরিষার তেল, পেঁয়াজ-টমেটো কুঁচি, আদা বাটা, হলুদ-মরিচ-ধনিয়ার গুঁড়া, চিনি, পানি, কাঁচামরিচের সমন্বয়ে রান্না করা যায় বরিশালের জনপ্রিয় এই খাবারটি। প্রথমে কড়াইয়ে তেল দিয়ে এতে সরিষা, শুকনো মরিচ, পেঁয়াজ বাটা, আদা বাটা, পানি, ধনিয়ার গুঁড়ো, মরিচের গুঁড়ো, হলুদের গুঁড়ো, লবণ, টমেটোকুচি ও ইলিশ মাছ দিয়ে ভালোভাবে কষিয়ে নিন। এরপর কষানো হলে পানি দিয়ে রান্না করুন। সবশেষে কাঁচামরিচ ও চিনি দিয়ে কিছুক্ষণ রান্না করে নামিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করুন মজাদার ইলিশ মাছের মরিচ ট্যাঙ্গা। অল্প সময়ের মধ্যেই রান্না করে পরিবেশে করা যায় এই খাবারটি।

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী আদা-লেবু দিয়ে ইলিশ:

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী একটি রেসিপি হলো আদা-লেবু ইলিশ। যা সিলেটবাসীর খুবই পছন্দের একটি খাবার। হলুদ-লবণ দিয়ে কড়াইয়ে ইলিশ মাছ ভেজে তেলের উপর আদা-রসুন-পেঁয়াজ বাটা, লবণ দিয়ে কষিয়ে হলুদ-মরিচ-জিরা-ধনে গুঁড়া দিয়ে ফালি করা লেবু দিয়ে পানি দিতে হবে। এভাবে মিনিট পাঁচেক ঢেকে রান্না করে ভাজা ইলিশ মাছ দিয়ে রান্না করুন। নামানোর আগে ধনে পাতা দিয়ে নামিয়ে পরিবেশন করুন সিলেটী খাবার আদা-লেবু ইলিশ।

ইলিশ মাছ ভাজা:

খুব সাধারণ অথচ বাংলাদেশের ঘরে ঘরে খুবই প্রিয় একটি খাবার হলো মুচমুচে ইলিশ মাছ ভাজা। ছোটবেলায় পাঠ্যবইয়ে পড়া এই ছড়াটি আজও আজও বাঙালির মনে গেঁথে আছে- ‘ইলিশ ভাজা’ খেতে মজা গরম গরম হলে’। তখনকার সময়ে অবশ্য ইলিশ মাছ এমন দুঃস্পাপ্য ছিল না, আর ইলিশের স্বাদ ও গন্ধ ছিল অতুলনীয়, ঝাঁকে ঝাঁকে তাজা তাজা রূপালি ইলিশ ধরা পড়ত জেলেদের জালে। পদ্মার ইলিশ যা দেখতে একটু চ্যাপ্টা ধরনের, আর একটু লম্বাটে ধরনের মাছটি পদ্মা বাদে সাগর থেকেও ইলিশ ধরা হতো। তবে পদ্মার ইলিশের স্বাদ দূর্দান্ত। ইলিশ মাছ ভাজার জন্য প্রথমে ইলিশ মাছ, হলুদ গুঁড়া, মরিচ গুঁড়া, ধনে গুঁড়া, জিরা গুঁড়া, স্বাদ মতো লবণ ও হালকা সরিষার তেল ১০ মিনিট মাখিয়ে রাখুন। তারপর কড়াইয়ে সরিষার তেল গরম করে তাতে মাছের টুকরাগুলো দিন। তেল গরম হওয়ার পর ভাজার সময় চুলার আঁচ কমিয়ে রাখুন। অল্প আঁচে মাছের টুকরাগুলো ভালো ভাজা হয়, দেখতে গাড় বাদামি রঙ হলে নামিয়ে রাখুন। শুধু খেয়াল রাখবেন যাতে পুঁড়ে কালো না হয়ে যায়। এরপর শুকনা মরিচ ও পেঁয়াজ ভাজি দিয়ে মুচমুচে মজাদার ইলিশ ভাজা পরিবেশন করুন। খিচুড়ি দিয়ে বর্ষার দিনে ইলিশ ভাজি বেশ লোভনীয় ও মজাদার খাবার।

ইলিশ মাছের ডিমের ঝোল:

যদিও ডিমওয়ালা ইশিল ধরা নিষেধ তবুও বাজারে এটি পাওয়া যায়। একটা সময় ডিমওয়ালা ইলিশের চাহিদা ছিল ব্যাপক। ইলিশ খেতে যেমন সুস্বাদু ইলিশের ডিমও তেমনি সুস্বাদু। ইলিশের ডিমের ঝোল বাঙালির খুবই পছন্দের একটি খাবার। বিশেষ করে ছোটদের। মাছের ডিমগুলো ও আলুগুলো চৌকো করে কেটে নিন। গরম তেলে ডিম ও আলু ভেজে তাতে পেঁয়াজ কুঁচি দিয়ে হালকা নেড়ে সমস্ত মশলা দিয়ে রান্না করে পরিবেশন করুন মজাদার ইলিশ মাছের ডিমের ঝোল।

আলু দিয়ে ইলিশ মাছের ঝোল:

আলু দিয়ে ইলিশের ঝোল বাঙালির খুবই পছন্দের একটি খাবার। গরমের দিনে বা হালকা তরকারি হিসেবে এটি বেশ জনপ্রিয়। ইলিশ মাছ ভেজে কড়াইয়ের তেলে গোটা জিরা, তেজপাতা দিয়ে আলু ভেজে নিন তারপর পানি দিয়ে হালকা হলুদ-জিরা গুঁড়া, লবণ দিয়ে পানিতে ভাজা মাছ দিয়ে ১৫-২০ মিনিট রান্না করে পরিবেশন করুন আলু দিয়ে ইলিশ মাছের ঝোল।

সরষে ইলিশ:

বাঙালির মধ্যে প্রচলিত অন্যতম জনপ্রিয় খাবার হলো সরষে ইলিশ। বর্ষার দিনে ইলিশের এই অনবদ্য খাবারের জুড়ি নেই। প্রথমে মাছ হলুদ-লবণ মাখিয়ে সরষে তেলে ভেজে নিন। তারপর কড়াইয়ে গরম তেলে সরষে-কাঁচা মরিচ-সামন্য লবণ একত্রে বেঁটে তা দিয়ে দিন। সামান্য হলুদ দিয়ে হালকা পানি দিয়ে ঢেকে দিন। তারপর মাছগুলো দিন সাথে গোটা কাঁচা মরিচ দিয়ে নামানোর আগে সরিষার তেল দিন। এরপর গরম গরম পরিবেশন করুন মজাদার সরষে ইলিশ।

ইলিশের বাহারি পদ!
সরষে ইলিশ

লাউপাতায় ইলিশ ভাপা:

ইলিশ মাছের নানা পদের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী ও মজাদার পদ হলো লাউপাতায় ভাপা ইলিশ। খাদ্যরসিক বাঙালির খুবই পছন্দের একটি খাবার এটি৷ ইলিশ মাছের টুকরো ভালো করে ধুয়ে আদা বাটা, রসুন বাটা, হলুদ বাটা, কাঁচা মরিচ, সরষের তেল ও লবণ দিয়ে মাখিয়ে রেখে দিতে হবে।

এরপর মাখানো ইলিশ মাছের টুকরোগুলো আলাদা আলাদা করে লাউপাতাতে মুড়িয়ে সুতা দিয়ে বেঁধে নিন। মাড় ঝড়ানো একটি ভাতের হাঁড়ি মৃদু আঁচে চুলায় কিছুক্ষণ বসিয়ে রাখুন। এরপর হাঁড়ির মাঝখান থেকে কিছু ভাত সরিয়ে তাতে লাউপাতাতে মোড়ানো মাছগুলো দিয়ে দিন। এখন সরানো ভাতগুলো দিয়ে মাছগুলো ঢেকে দিয়ে হাঁড়ির ঢাকনা দিয়ে দিন। ২০/২৫ মিনিট পর ঢাকনা সরিয়ে মাছগুলো তুলে নিয়ে গরম গরম ভাতের সাথে পরিবেশন করুন সুস্বাদু লাউপাতায় ইলিশ ভাপা।

দই ইলিশ:

ঐতিহ্যবাহী ও সুস্বাদু মজাদার একটি খাবার হলো দই ইলিশ। ভোজনবিলাসীদের বিলাসী একটি খাবারের নাম দই ইলিশ। ইলিশের টুকরা ভালো করে ধুয়ে সামান্য পোস্তদানা পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। আরেকটি বাটিতে সামান্য সরষে পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। এবার সামান্য লবণ ও দুটি কাঁচামরিচ দিয়ে ভিজিয়ে রাখা এই দুই উপকরণ ভালো পাটায় বেঁটে নিন। মিশ্রণটি একটি বাটিতে ঢেলে ফেটিয়ে রাখা দই, লবণ, হলুদ গুঁড়া, মরিচ গুঁড়া, চিনি ও সরিষার তেল মিশিয়ে নিন। মাছের টুকরাগুলো মিশ্রণে দিয়ে উল্টেপাল্টে নিন। আর ১৫ /২০ মিনিট রেখে দিন এভাবেই ঢেকে রেখে দিন।

চুলায় কড়াই বসিয়ে মিশ্রণসহ মাছ দিয়ে দিন। চুলার জ্বাল বাড়িয়ে দিন ও ফুটে ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। ফুটে উঠলে সামান্য সরিষার তেল দিয়ে চুলার জ্বাল কমিয়ে দিন। এবার হালকা নেড়ে সাবধানে উল্টে দিন মাছের টুকরাগুলো। আধা কাপ গরম পানি দিয়ে কড়াইটি ৭/৮ মিনিটের জন্য ঢেঁকে দিন। ঢাকনা তুলে উল্টে দিন মাছের টুকরোগুলো। ৪/৫ টি কাঁচামরিচ মাঝখান থেকে চিরে দিয়ে দিতে হবে এ পর্যায়ে। এভাবে আরও কয়েক মিনিট ঢেকে রাখুন পাত্রটি। এরপর নামিয়ে গরম ভাতের সাথে পরিবেশন করুন মজাদার দই-ইলিশ।

ইলিশের বাহারি পদ!
দই ইলিশ

ইলিশের দোপেঁয়াজা:

ইলিশের আরও একটি বাহারি পদ হলো ইলিশের দোপেঁয়াজা। অসাধারণ এই খাবারটি খেতে মজাদার। বাঙালিরা এই খাবারটিকেও রেখেছেন পছন্দের তালিকায়।

কড়ায়ে তেল গরম করে হলুদ লবণ মাখানো মাছের টুকরোগুলো ভেজে নিতে হবে। এরপর তেল গরম করে গোটা জিরা ফোঁড়ন দিয়ে তাতে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে হালকা বাদামী করে ভেজে নিন। এরপর একে একে আদা বাটা, রসুন বাটা, হলুদ গুঁড়া, জিরা গুঁড়া, ধনিয়া গুঁড়া ও সামান্য পানি দিয়ে ভাল করে কষিয়ে নিতে হবে।

ভালো করে কষানো হয়ে গেলে মাছের টুকরা গুলো দিয়ে দিন এবং সামান্য কিছু পানি দিয়ে আরো কিছুক্ষণ ঢেকে রান্না করতে হবে। রান্না প্রায় শেষের দিকে হয়ে এলে এতে কয়েকটি কাঁচামরিচ দিন। আর একটু ফুটিয়ে নামিয়ে ফেলুন। দেখতে আকর্ষণীয় করার জন্য উপরে একটু পেঁয়াজ বেরেস্তা ছড়িয়ে দিতে পারেন। এরপর গরম ভাতের সাথে গরম গরম পরিবেশন করুন ইলিশের দোপেঁয়াজা।

আলু-বেগুন দিয়ে ইলিশের ঝোল:

ইলিশ বাঙালীর মন-প্রাণ জুড়ে, তাই বাঙালির মনে ইলিশ একটা আলাদা স্থান দখল করে আছে। বাঙালীর সাথে ইলিশের সম্পর্ক চিরন্তন। ইলিশ শুনলে আমাদের মনে আসে মুচমুচে ইলিশ ভাজি, সরষে ইলিশ কিংবা ভাপা ইলিশের কথা। কিন্তু বাহারি এসব ইলিশের লোভনীয় পদের পাশাপাশি আলু-বেগুন দিয়ে ইলিশের ঝোলও কম সুস্বাদু নয়। এই পদটি একবার খেলে মুখে লেগে থাকবে। ইলিশ মাছ ভাল করে ধুয়ে তাতে হলুদ গুঁড়ো, লবণ মাখিয়ে ডুবো তেলে ভেজে নিতে হবে। এবার অল্প লবণ, হলুদ মাখিয়ে আলু ও বেগুনের চৌকো করা টুকরোগুলিও হালকা করে ভেজে নিতে হবে।

তারপর সেগুলি তুলে নিয়ে আরও একটু তেল দিয়ে তেজপাতা ও কালো জিরা ফোঁড়ন দিন। হলুদ গুঁড়ো, ধনে গুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো ও লবণ দিয়ে কষিয়ে পরিমাণ মতো পানি দিয়ে ঢেকে দিন। এসময় চুলার আঁচ স্বাভাবিক রাখুন। ফুটে উঠলে তাতে ইলিশ মাছের ভাজা টুকরো আর ভেজে রাখা আলু-বেগুন দিয়ে দিন। ফালি করে রাখা কাঁচা মরিচ সঙ্গে দিয়ে দিন। তারপর অল্প কাঁচা সরিষার তেল দিয়ে চার-পাঁচ মিনিট রান্না করে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে ইলিশ বেগুনের মজাদার মাছের ঝোল। গরম ভাতে ইলিশের সাধারণ এই পদটি খেতে কিন্তু বেশ দারুণ।

কাঁচা আম দিয়ে ইলিশের ঝোল:

কাঁচা আম দিয়েও যে ইলিশের অনবদ্য এক পদ তৈরি করা যায় তা এর স্বাদ গ্রহণ না করলে বোঝা যায় না৷ কাঁচা আমের ইলিশের এই পদ রান্না করাও খুবই সহজ। ইলিশ মাছগুলোকে অল্প নুন আর হলুদ মাখিয়ে রেখে দিতে হবে। এবার একটি বাটিতে পেঁয়াজ কুচি, ফালি করা কাঁচা মরিচ, স্বাদ মতো লবণ, চিনি আর অল্প হলুদ নিয়ে হাত বা চামচ দিয়ে ভালমতো মাখিয়ে ইলিশ মাছগুলো দিয়ে একটু মেখে ১০-১৫ মিনিট রাখতে হবে। এরপর কড়াইয়ে সরিষার তেল গরম করে ইলিশ মাছ পেঁয়াজ কুঁচিসহ ঢেলে দিয়ে অল্প আঁচে সামান্য পানি দিয়ে কিছুক্ষণ রান্না করুন। তারপর আগে করে রাখা আমের কুঁচি দিয়ে দিয়ে দিন। রান্নার শেষের দিকে আস্ত কাঁচা মরিচ ও সামান্য চিনি ছিটিয়ে দিন। টক ও ঝালের সামঞ্জস্যতা বজায় থাকে। এরপর নামিয়ে ফেলুন কাঁচা আমের ইলিশের ঝোল। গরম ভাতে খুব ভালো লাগে ভিন্ন স্বাদের এই পদটি।

নোনা ইলিশের চালকুমড়ো পাতার বড়া:

ইলিশ মাছ অনেকদিন সংরক্ষণের জন্য ইলিশ মাছ লবণ দিয়ে নোনা ইলিশ বানানে হয়। এ প্রক্রিয়াতে ইলিশ অনেকদিন সংরক্ষণ করে খাওয়া যায়।নোনা ইলিশ দিয়েও বাহারি পদের খাবার তৈরি করা যায়। এর মধ্যে মুখরোচক একটি পদ হলো নোনা ইলিশ চালকুমড়ো পাতার বড়া। গরম ভাতের সঙ্গে এই খাবারটি বেশ দারুণ লাগে। ঐতিহ্যবাহী এই খাবারের প্রচলন বরাবরই ছিল।

চালকুমড়ো পাতা সংগ্রহ করে ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিন। ১৫/২০ মিনিট মতো লবণ মাখিয়ে সেটি রেখে দিন। এরপর নোনা ইলিশের টুকরোর সাথে পেঁয়াজ বাটা, মরিচ বাটা, ধনে বাটা আর রসুন বাটা মাখিয়ে নিতে হবে। এবার পাতাগুলো থেকে হাত দিয়ে চেপে চেপে পানি বের করুন ও তা চিপে ফেলে দিন। এতে পাতাগুলো নরম হয়ে যাবে। পাতাগুলো খুলে পাতলা করে বিছিয়ে নিন একটা প্লেটে। মাখা নোনা ইলিশ একটি একটি করে মসলাসহ প্রতিটি পাতায় দিয়ে সুতা দিয়ে বেঁধে মুড়িয়ে দিন। এরপর কড়াইয়ে অল্প তেল দিয়ে বড়া ভেজে নিন। চুলা থেকে নামিয়ে সুতা কেটে ফেলে দিন। গরম ভাত কিংবা খিচুড়ির সঙ্গে পরিবেশন করুন রকমারি এই মজাদার পদ।

হরগৌরী:

বাঙালি হিন্দু রন্ধনশৈলীর অন্তর্গত একটি ঐতিহ্যবাহী মাছের পদ হলো হরগৌরী বা গঙ্গাযমুনা। যেখানে মাছের এক পাশটা হয় ঝাল ও অন্য পাশটা টক। ঝাল ও টক দুইয়ের সমাহার থাকায় এই পদটিকে অনেক সময় টক-ঝালও বলা হয়ে থাকে। হরগৌরী যে কোনো মাছেরই হতে পারে, বিশেষ করে রুই, বোয়াল, চিতল, ইলিশ, রাইখর ও কই মাছের হরগৌরী বাঙালিদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়। বাংলার বিভিন্ন জমিদার বাড়ী ও বনেদী বাড়ীতে জামাইষষ্ঠী, দুর্গাপুজা ও অন্যান্য বিশেষ অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে এই পদটি রান্না হয়। এখনও তার প্রচলন রয়েছে।

হরগৌরীর প্রধান উপাদান মাছ। কই মাছ বেশি প্রাধান্য পেলেও ইলিশের হরগৌরী খেতে দুর্দান্ত। হরগৌরীতে মশলা হিসেবে ব্যবহার করা হয় সর্ষে, জিরে, কাঁচা মরিচ, শুকনো মরিচ গুঁড়ো, হলুদ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, তেঁতুল, চিনি ও স্বাদ মতো লবণ। প্রথমে মাছগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করে লবণ, হলুদ ও রসুন বাঁটা দিয়ে মেখে রাখা হয়। তারপর মাছগুলিকে তেলে ভেজে নেওয়া হয়। এরপর সরিষা বাঁটা, কাঁচা মরিচ বাঁটা, আদা বাঁটা ও হলুদ দিয়ে কষিয়ে নেওয়া হয়। তারপর তাতে পানি দিয়ে মাছগুলো ছেড়ে আরও খানিকটা কষানো হয়। তবে মাছগুলি উল্টানো যাবে না। এতে মাছের এক পাশটা ঝাল হয়। আবার অন্য পাশের জন্য একটি পাত্রে পেঁয়াজ বাঁটা, আদা বাঁটা, শুকনো মরিচ গুঁড়ো, হলুদ ও পানি দিয়ে কষিয়ে নেওয়া হয়। তাতে তেঁতুলের রস ও চিনি দেওয়া হয়ে থাকে টক স্বাদের জন্য। খানিকটা মাখা মাখা হলে নামিয়ে নেওয়া হয়। এতে নিচের পাশটা হয় ঝাল ও উপরটা টক। ঐতিহ্যবাহী এই পদটি খেতে অসাধারণ।

আরও পড়ুন: জন-মানবশূন্য এক গ্রামের গল্পকথা!

ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই ইলিশ পোলাও:

মাছের রাজা ইলিশের মৌসুমে ইলিশের বাহারি পদ এর হরেক রকম রান্না হয় প্রতি ঘরে। শুধু নামেই রাজা নয়, স্বাদে, গুনেও বিশ্বের অন্যতম সেরা মাছ এই ইলিশ। এদিকে খাবার-দাবারে পুরান ঢাকার একটি আলাদা ঐতিহ্য আছে। ইলিশের তেমনি এক ঐতিহ্যবাহী পদ হলো ‘ঢাকাই ইলিশ পোলাও’।

একটি কড়াইয়ে তেল ও ঘি গরম করে তাতে পিঁয়াজ কুচি দিয়ে ভেজে তুলে নিতে হবে। এখন পিঁয়াজ বাটা, আদা বাটা, রসুন বাটা, লাল মরিচ গুড়া, চিনি ও লবন দিয়ে সাথে পানি দিয়ে কষাতে হবে।মাছের টূকরাগুলো মশলায় ছেড়ে দিয়ে নারিকেলের দুধ দিয়ে মিশিয়ে ঢেকে দিয়ে মাঝারি আঁচে রান্না করতে হবে ১০ মিনিট মতে।এরপর টকদই মিশিয়ে মাছ দিয়ে আরো ৫ মিনিট অল্প তাপে রান্না করতে হবে। এখন কাঁচা মরিচ মাছের উপর ছড়িয়ে দিয়ে চুলা বন্ধ করে দিতে হবে।মাছের টুকরা গুলো ঝোল থেকে তুলে আলাদা রাখুন। এরপর হাঁড়িতে ঘি দিয়ে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে ভেজে নিতে হবে। চালে একটু আদা-রসুন বাটা দিয়ে মৃদু আঁচে চাল ভেজে নিন। গন্ধ বের হলে নেড়ে গরম পানি, মাছের ঝোল, দুধ ও লবণ দিয়ে ফুটতে দিন। পানি কয়েকবার ফুটে উঠলে কিছু কাচামরিচ দিয়ে নাড়ুন। ঢাকনা দেয়ার ২০/২৫ মিনিট পর পোলাও চুলা থেকে নামিয়ে নিন। ঢাকনা দেয়ার পরে কোনোক্রমেই ঢাকনা খুলবেন না এবং পোলাও নাড়বেন না। কারণ পোলাও ঝরঝরা হওয়ার জন্য এটি খুবই জরুরি। কিছু পোলাও হাঁড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে মাছের টুকরা গুলো পোলাওয়ের উপর বিছিয়ে তার উপর ঘি ছিটিয়ে আবার উঠানো পোলাও দিয়ে ঢেকে দমে ১৫ /২০ মিনিট রাখতে হবে। পেঁয়াজ বেরেস্তা দিয়ে পরিবেশন করুন মজাদার স্বাদের ঢাকাই ইলিশ পোলাও।

ইলিশের বাহারি পদ!
ঢাকাই ইলিশ পোলাও

আরও পড়ুন: হাওয়াই মিঠাই: বাংলার ঐতিহ্যবাহী মিঠাই!

পরিশেষে বলা যায়, স্বাদে, গন্ধে অন্যন্য মাছের রাজা ইলিশ। ইলিশের মৌসুমে ইলিশের বাহারি পদ এর আয়োজন ছিল প্রাচীন কাল থেকেই। সুস্বাদু এই এক মাছ দিয়ে যে কতো রকমের পদ রান্না করা যায় তা বলাই বাহুল্য। রসনাবিলাসী মানুষের কাছে ইলিশের নানা পদ তাই অতি পছন্দের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button