চর আলেকজান্ডার ভ্রমণ!

জায়গার নাম: চর আলেকজান্ডার

শুরুতে বলে রাখছি, আব্বু চাকরির সুবাদে থাকেন নোয়াখালীতে আর আমি কুমিল্লাতে। যাই হোক, সময় থাকলে আমি কোথাও ঘুরতে যাওয়া অনেক পছন্দ করি। এজন্য যেকোনো সময় মনকে ফ্রেশ করার জন্য হোক বা কোনো কিছু সম্পর্কে জানার জন্য হোক চলে যাই বিভিন্ন স্থানে। যদিও করোনা ভাইরাসের মহামারির কারণে দীর্ঘদিন বাড়িতে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হয়েছে।ঘুরতে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছা থাকার পরেও যাওয়া হয়নি। এমন অবস্থায় প্রায় ছয় মাস কেটে গেল বাড়িতে। এর মধ্যে এক দিন হঠাৎ করে আব্বুর ফোন ফেলাম। সময়টা ছিল একদম মাসের শেষ দিকে। দরকারি কিছু কাগজপত্র নিয়ে নোয়াখালীতে আব্বুর কাছে যেতে হবে। তাই বাসার বাইরে যেতে পারব বলে মনে মনে অনেকটা খুশিও হলাম। যদিও করোনার এমন পরিস্থিতিতে আম্মা যেতে দিতে চাইনি বাসার বাইরে। এদিকে আব্বুর প্রয়োজন তাই এক প্রকার বাধ্য হলো, যেতে না করতে পারল না। আর এভাবে কাকতালীয়ভাবে খুলে গেল আমার চর আলেকজান্ডার ভ্রমণের রাস্তা!

নোয়াখালী ও কুমিল্লার দূরুত্ব অনেকটাই। তাই নোয়াখালী গেলে দিনের ভেতর ফিরে আসা বেশ কষ্টকর। তাই ওখানে ১-২ দিন থাকব ভাবলাম। আর এ সুযোগে আমি ঠিক করে ফেললাম নোয়াখালীর কোথাও ঘুরতে গেলে খারাপ হয় না। ইন্টারনেটে বিভিন্ন স্থান দেখতে লাগলাম। বিভিন্ন স্থানের ছবি দেখে বিশেষ করে  চর আলেকজান্ডারকে ভালো লেগে গেল।  এরপর বেশ কিছু ছবি দেখলাম। চর আলেকজান্ডার হলো মেঘনা নদীর একটি অংশ।

যেহেতু আমি নতুন তাই  নোয়াখালীর একজন স্থানীয় বন্ধু (বিশ্ববিদ্যালয়ের), তাকে বললাম আগামীকাল চর আলেকজান্ডার যাব। কীভাবে কী  যাওয়া যাবে, সে যেন বিস্তারিত আমাকে জানায়। সে জানালো ওখানে যেতে তাদের সূবর্ণচরের ওপর দিয়ে যাওয়া যায়। একদম খাপে খাপ  মিলে গেল। একসাথে দুই জায়গায় যাওয়া হবে, বন্ধুর সাথেও দেখা হবে।

এসব কুমিল্লাতে বসেই প্ল্যান করেছিলাম। পরেরদিন মানে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে বাসা থেকে নোয়াখালীতে গেলাম। ওইদিন রাতে আব্বুর কাছে  ছিলাম। পরের দিন সকাল আব্বুকে বললাম ঘুরতে যাব- চর আলেকজান্ডার, সময়টা ভোর আটটা। আব্বু কিছু না বলে রাজি হলো, আমি তো ভীষণ খুশি। রাতেই বন্ধুকে বলেছিলাম, আমি সকালে আসবো এবং তাকে  ফোন দেবো। বন্ধুও ঠিক আছে বলেছিল।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশে ভ্রমণ করার মতো কয়েকটি স্থান!

এখানে একটা মজার ঘটনা ঘটল, আমি সকালে কখন মাইজদি থেকে সূবর্ণচর ( বন্ধু সাথে দেখা করব) সেটা বলা হয়নি। যার কারণে মাইজদি থেকে আমি অটোতে করে তাকে ফোন না দিয়েই সোনাপুর বাসস্ট্যান্ডে চলে গেলাম। যেহেতু আগে আমি বন্ধুর সাথে দেখা করব, পরে একসাথে চর আলেকজান্ডার যাব।

কিন্তু তার বাসার রাস্তা জানা ছিল না, তাই তাকে ফোন দিলাম। কিন্তু কল রিসিভ করছিল না। বার বার কল দিচ্ছিলাম। যদিও ভুলটা আমার, আমি আগে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম যে, সকাল সকাল তার বাসায় আসব। অনেকটা নাজেহাল ও বিরক্তিকর পরিস্থিতি। মনে মনে ভাবলাম আর নিজেকে বকা দিলাম; এমন জানলে ঘুরতেই আসতাম না। এদিকে আমি ফিরেও আসতে পারছিলাম না! কারণ মন চাইছে ঘুরতে, কীভাবে ফিরে আসবো। এমন সময় নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আমার একজন মামার (এম এ সাঈদ) কথা মনে পড়ল! যদিও তার পড়াশোনা শেষ, এখানে মেসে থেকেই জবের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে! বাসায় খুব কম যেতেন ওনি। অবশেষে তাকে ফোন দিলাম, এরপর এই পরিস্থিতিটা বললাম মামাকে! উনি সোনাপুর বাসস্ট্যান্ডের পাশেই মেসে থাকতেন, আমাকে মামা বলল- আমি আসতেছি তুমি অপেক্ষা করো। কিছুক্ষণ পরে মামা আসলেন এবং আমাকে কাছে টেনে নিলেন! আসলে মামা-ভাগিনার অনেক দিন পরে দেখা। এরপর একটা হোটেলে নিয়ে গেলেন। সকালের নাস্তা করার জন্য খাসির মাংসসহ রুটি দধি খাওয়ালেন। পরে মামা আমার বন্ধু (রহিমের) বড়ো ভাইকে ফোন দিয়ে তার ঘুম ভাঙালেন এবং যথারীতি সূবর্ণচরের সিএনজিতে উঠিয়ে দিলেন।

অবশেষে মনের মধ্যে চর আলেকজান্ডার দেখার আশ্বাস নিয়ে চলতে থাকলাম। সূবর্ণচর থেকে বন্ধু ( রহিম) কে নিয়ে চললাম আবার! লক্ষীপুর (রায়গঞ্জ) থেকে চর আলেকজান্ডারের জন্য গাড়িতে উঠলাম; অনেকটা পথ যেতে যেতে গল্প আর আড্ডায় জমে গেলাম! অনেক দিন পরে বন্ধুর সাথে দেখা। রাস্তার পাশের বিভিন্ন স্থানের সাথে পরিচিত হচ্ছিলাম বন্ধুর মুখ থেকে তার শৈশবস্মৃতি, স্কুল – কলেজের গল্প শুনে শুনে।

অবশেষে আমরা গন্তব্যে পৌঁছালাম! চর আলেকজান্ডারের তীর ঘেঁষে রাস্তা দিয়ে গাড়িতে করে প্রধন ফটকের দিকে গিয়ে নামলাম। আসলে নদী আর পাহাড় দেখার প্রতি আমার ইচ্ছেটা একটু বেশিই বটে। যখন আমরা পৌঁছালাম, দুপুর ১২ টা বাজে। সকাল ৮ থেকে ১২ টা, আসলে মাঝখানে অনেকটা সময় কেটে গেছে। চর আলেকজান্ডারের প্রধান ফটকে গিয়ে নদীর পানির দিকে তাকাতেই চোখ বন্ধ হয়ে হয়ে আসছিল। দুুপুরের কড়া রোদ মনে হচ্ছে নদীর পানিতে পড়েই আমার চোখের ওপরে এসে পড়ছে। যদিও অনেকটা দুপুরবেলায় চর আলেকজান্ডারে মানুষের ভিড় নেই বললেই চলে! নদীর পানিও হালকা ঢেউ দিচ্ছিল। আর আমি ছবি তোলা নিয়ে ব্যস্ত। প্রায় ২ ঘণ্টা ঘুরাঘুরির পরে আমি ও রহিম চর আলেকজান্ডারের পাশে একটা হোটেলে হাত মুখ ধুয়ে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ফিরে আসার জন্য প্রস্তুত হলাম।

অসম্ভব ভালো একটা ট্যুর ছিল। পরে বুঝতে পারলাম বন্ধুকে রাতে বলে রাখলে হয়তো সকাল সকাল আর কষ্ট করে যেতে হতো না, বিকেল বেলা গেলে নদীর ঢেউয়ের আরও বেশি ছোঁয়া পেতাম। তবে বেঁচে থাকলে আবার যাব ইনশাআল্লাহ। চর আলেকজান্ডার। (মিনি কক্সবাজার)

লেখক: জামাল হোসেন

লেখার সময়: রাত ১.১৪

তারিখ: ১০-০২-২০২১

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Dear Viewer, Please Turn Off Your Ad Blocker To Continue Visiting Our Site & Enjoy Our Contents.