ইতিহাসঐতিহ্যফিচারলোকসংস্কৃতি

চাকমা বিবাহ বৈচিত্র্য!

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ১১টি আদিবাসীর মধ্যে চাকমারা মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিবাসী। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় তাদের বসবাস। চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। অতীতের মতো আজও চাকমা সম্প্রদায়ে রয়েছে বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানের রীতিনীতি। তারা যথাযথ নিয়ম মেনে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। চাকমাদের মধ্যে বিবাহ একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান। চাকমাদের বিবাহের বেশ বৈচিত্র্য রয়েছে। সমাজ ব্যবস্থার উন্নতির সাথে সাথে আদিবাসী সমাজেও এই ছোঁয়া লেগেছে তবে তারা তাদের পুরাতন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করেছেন প্রতিনিয়ত যা বর্তমানেও দেখা যায়। সামান্য পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগলেও আগের নিয়ম মেনেই বর-কনে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন।

চাকমা বিবাহ এর আনুষ্ঠানিকতা ও রীতিনীতি:

চাকমাদের মধ্যেও আত্মীয়দের সাথে বিবাহের প্রচলন রয়েছে। চাকমাদের বিবাহের রীতিনীতি ও আনুষ্ঠানিকতার বিষয়ে আলোচনা করা হলো:

আত্মীয়তা ও বিবাহযোগ্য সম্পর্ক:

চাকমারা আত্মীয়তার সম্পর্ককে দুই ভাগে ভাগ করেছেন-

১. গরবা কুটুম:

গরবা কুটুম হলেন একজন ছেলে বা মেয়ের কাছে তার চাচা-চাচী, মামা-মামী, ভাগ্নে-ভাগ্নী ইত্যাদি সম্পর্কের আত্মীয়রা। গরবা কুটুম জাতীয় সম্পর্কের আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ করা নিষেধ।

২. হেল্যা কুটুম:

চাকমাদের প্রথানুসারে হেল্যা কুটুমের সাথে বিয়ের সম্পর্ক হতে পারে। শ্যালক-শ্যালিকা, দাদা-দাদী, নানা-নানী সম্পর্কের আত্মীয়রা হলেন হেল্যা কুটুম।

উল্লেখ্য যে, চামকা সমাজে আপন চাচাতো ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ে হয় না। তবে পিসতুতো-মাসতুতো ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ের সম্পর্ক হয়ে থাকে। আবার চাকমাদের সমগোজাভুক্ত নারী-পুরুষের মধ্যেও বিবাহের সম্পর্ক হতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে একই গোজাভুক্ত একই গোষ্ঠীর মধ্যে বিয়ের সম্পর্ক হতে হলে কমপক্ষে পাঁচ পুরুষের সম্পর্কের ব্যবধান থাকতে হবে। তবে নিঃসম্পর্কীয় যেকোনো নারী-পুরুষের মধ্যে বিয়ের সম্পর্ক হতে পারে।

বিবাহের উপযুক্ত সময়:

চাকমা সম্প্রদায়ের মধ্যে সাধারণত মেয়ের বয়স ১৮ বছর ও ছেলের বয়স ২০ এর উর্ধ্বে গেলে মা-বাবা তাদের বিয়ের বিষয়ে চিন্তা করে থাকেন।

বিবাহের সময় চাকমারা সাধারণত পঞ্জিকা অনুসরণ করে শুভদিন দেখে বিবাহের তারিখ নির্ধারণ করেন। বাংলা বছরের ভাদ্র মাস ও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বর্ষামাস অর্থাৎ আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে প্রবারণা চলাকালীন তিনমাস সময়ে চাকমারা বিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন থেকে বিরত থাকে।

বর্ষা মৌসুম শেষ হবার পর থেকে ইংরেজি বছরের জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারী মাস পর্যন্ত চাকমারা বিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে।

পাত্র-পাত্রীর সন্ধান ও বিবাহের পাকা কথা দেওয়া:

ছেলে-মেয়ে বিয়ের উপযুক্ত হলে অভিভাবকরা পাত্র-পাত্রীর সন্ধান করে থাকেন। পছন্দসই পাত্রী পেলে নিকট আত্মীয়, বিশ্বস্ত লোকজন বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো হয়। মেয়েপক্ষ থেকে সম্মতি জানালে ছেলেপক্ষ শুভদিন দেখে মেয়ের বাড়িতে যান। সাথে করে তারা নারিকেল, মদ, পান-সুপারি, নানান পিঠা, মিষ্টি নিয়ে যান। বিবাহের এই প্রাথমিক পদক্ষেপকে ‘মদভাজ বা মদপিলাং তুলানা’ বলা হয়। পাত্রীর অভিভাবক তা গ্রহণ করলে অন্য কোথাও আর মেয়ে দেখানো যায় না। প্রাথমিক পর্যায়ে উভয়পক্ষ রাজি হলে পাত্রপক্ষ পুনরায় পাত্রীর বাড়িতে যায়। যাকে ‘দ্বি-পুর’ বলে।

‘তিনপুর’ এ বয়স্ক মহিলা নিয়ে যাওয়া হয় মেয়ের বাড়িতে। এ সময় পাত্রীপক্ষ গয়না, নগদ টাকা, চাল প্রভৃতি দাবি জানায়৷ সব ঠিকঠাক থাকলে এরপর বিয়ের পাকা কথা দেওয়া হয় ও দিন নির্ধারণ করা হয়৷

আশীর্বাদ:

পাকা কথা ও দাবি পূরণের প্রতিশ্রুতি দেবার পর শুভ দিন-ক্ষণ দেখে আশীর্বাদ করা হয়। পাত্র-পাত্রী গুরুজনদের পা স্পর্শ করে প্রণাম করে। পাত্রপক্ষ পাত্রীকে সোনার আংটি বা নগদ টাকা দিয়ে আশীর্বাদ করেন। পাত্রীপক্ষ পাত্রপক্ষের আগমনে গ্রামের মুরব্বি ও নিকট আত্মীয়দের ভুরিভোজ করিয়ে থাকেন। পাত্রপক্ষ থেকে পাত্রীকে আনার সময় বিজোড় সংখ্যক লোক বরযাত্রী আসে। বউসহ যাবার সময় জোড় সংখ্যায় ফিরে যায়।

বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা:

বিয়ের আগের দিন বরের বাড়িতে বাদ্য বাজানো হয়। এটিকে ‘হোলা মারণী’ বলে। বিয়ের দিন বরযাত্রী বরের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করে ও কনে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। মাঝ পথ থেকে কেউ বরযাত্রীতে অংশ নিতে পারে না।

কনে আনার দলে একজন পুরুষ শাবালা নিয়োগ করা হয়। মূলত তিনিই কনের অভিভাবকদের সাথে বিয়ের বিভিন্ন বিষয়ে যোগাযোগ রাখেন। তিনি কনের কাপড়-চোপড়, অলংকার কনে বাড়িতে দেখান। এসব দেখানোর পর বর-কনেকে মুরব্বিরা আশীর্বাদ করেন।

বরের জ্ঞাতি সম্পর্কীয় একজন যুবতী বা কিশোরকে ‘ফুরবুগোনী বা ফুলবারেং-বুগোনীর’ দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফুরবুগোনীকে বাঁশ বা বেতের তৈরি ফুলবারেং বহন করতে হয়। ফুলবারেং এ কনে সাজানোর জন্য পিনন, হাদি, হাঁসুলি, কানে রূপার কজফুল, তাজজোড়, বাঘু, চুলের কাঁটা, থেং হারু, হস্তীদন্তের বাঙোরি, টেঙাছড়া, হালছড়া, আংটি প্রভৃতি পাত্রপক্ষ কনেপক্ষকে দিয়ে থাকে। কনে আনার দলে একজন মধ্যবয়স্ক সধবা মহিলাকে বউ ধরণী হিসেবে নেওয়া হয়।

এছাড়া বরপক্ষ থেকে একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে বরপক্ষের হয়ে কথা বলেন। তার হাতেই কনেপক্ষ কনেকে হস্তান্তর করেন। কনের যাবতীয় দায়িত্ব, ভরণপোষণ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দায়-দায়িত্ব প্রভৃতি বিষয়ে তিনি নিশ্চয়তা প্রদান করেন।

চাকমা বিবাহ বৈচিত্র্য!
চাকমা কনে

এসব আনুষ্ঠানিকতার পর কনেকে বরপক্ষের কাপড়চোপড় অলংকার দিয়ে সাজানো হয়। জোড়া পিনন দিয়ে কনেকে সাজানো হয়।

এরপর কনেপক্ষের সকল দাবি পূরণ করা হয়। নগদ টাকা সহ সকল বিষয় পূরণ করা হয়। কেউ সব দাবি পূরণ করতে না পারলেও সামান্য অর্থ প্রদান করে।

চুঙুলাং পূজা ছাড়া বিবাহ পরিপূর্ণতা লাভ করে না বা বিবাহ সিদ্ধ হয় না। এটিকে সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হবার পূজাও বলা হয়। কয়েকজন মেয়ে একটি নতুন কুত্তিতে পানি ভরে আনে ঘাট থেকে। ওঝা ৫/৭ জোড়া বাঁশের বেত দিয়ে একটি চাবারা তৈরি করে নির্ধারিত কক্ষে কলাপাতার উপর বিছিয়ে দেয়। কলাপাতার উপর ৫ পোয়া চাল, ধান আলাদা করে রেখে উভয়ের মধ্যে পানি ভর্তি কুত্তিটি রাখা হয়। লোকখী দেবীর উদ্দেশ্যে মুরগী বলি দেওয়া হয়। পরমেশ্বরী দেবীর উদ্দেশ্যে দুটি মোরগ বলি দেওয়া হয়। সাথে মদ, জাগরা পুজাতে দেওয়া হয়।

বর কনেকে পুনরায় দেবতার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করতে হয়। মঙ্গল ঘটের আগপানি ‘আমি সুরতি’ বা বেল সুরতি দিয়ে নব দম্পতির মাথায় ছিটিয়ে আশীর্বাদ করা হয়। এই পানিকে চুঙুলাং পানিও বলে। পূজা শেষে চাল ও ধান মাপা হয়। যদি ওজন বৃদ্ধি পায় তবে নবদম্পতির দাম্পত্য জীবনে উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে।

চাকমা বিবাহ বৈচিত্র্য!
চাকমা বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা ও রীতিনীতি

চাকমা কনেকে দুপুর ১২ টার আগে বাড়ি থেকে নামানো হয়। তবে বরের বাড়ির দূরত্ব ও পঞ্জিকার শুভদিন অনুসারে কনে নামানো হয়। এসময় গান বাজনা করা হয়। সকলে বউ দেখতে আসে। যেদিন কনেকে বরের বাড়িতে আনা হয় সেদিন ভোরে নিকট আত্মীয় বা পাড়ার কয়েকজন যুবতী ২টি কলসি ভর্তি করে বাড়ির মূল দরজার দুপাশে বসিয়ে দেয়। এটাকে আগ পানি কিম তুলানা বা মঙ্গল ঘটও বলে। কলসির পাশে দুটি কলাগাছ পোঁতা হয় ও কলসির গলায় সাতটি সুতার নাল পেঁচিয়ে বাধা হয়। কনে না আসা পর্যন্ত কেউ ঐ দরজা পেরোতে পারে না।

চাকমাদের রীতিনীতি সমৃদ্ধ এ জাতীয় বিবাহ পদ্ধতি ছাড়াও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে। যেমন-

কনের বাড়িতে গিয়ে বিয়ে:

সাধারণত তিনটি কারণে বরকে কনের বাড়িতে গিয়ে বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে দেখা যায়-

  • বরপক্ষের আর্থিক অবস্থা খারাপ হলে।
  • বর ও কনে পক্ষের সম্মতিতে।
  • বরের অভিভাবকরা বিবাহে সম্মত না হলে।

ঘর জামাই:

যারা একেবার সম্বলহীন ও যাদের কেউ নেই তারা শ্বশুর বাড়ি গিয়ে শ্বশুরের খরচে বিবাহ করে। এক্ষেত্রে জদন বানাহ্, চুঙুলাং পূজা করতে হয়। ঘর জামাই হলে বর শ্বশুর বাড়িতে থেকে যায়।

প্রেম ঘটিত বা পলায়ন করে বিয়ে:

ছেলে-মেয়ের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক বা অভিভাবকদের অসম্মতিতে ছেলে-মেয়েরা পালিয়ে আত্মগোপন করে থাকে। এক্ষেত্রে সমাজের লোকজনের দায়িত্ব পলায়নকৃতদের খুঁজে বের করা। আত্মগোপন করা অবস্থায় অনেকে বৌদ্ধ ভিক্ষুর নিকট থেকে মঙ্গলসূত্র শ্রবণ করে আশীর্বাদ নিয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তারপর পাড়ার লোকদের জানায়। পাড়া থেকে সালিশের আয়োজন করা হয়। ঐ দিনই বিয়ের সামগ্রী সংগ্রহ করে কার্বারীর বাড়িতে বিয়ের কাজ সম্পাদন করা হয়। তবে ছেল মেয়েকে অর্থদণ্ড বা মোরগ জরিমানা করা হয়। মেয়েপক্ষ অসম্মত থাকলে তারা মেয়েকে ফিরিয়ে নিতে পারেন।

বিষুত ভাঙা বা বেড়ানো যানা:

বিয়ের পর বর-কনেকে বিষুত ভাঙা নামক অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে হয়। একে বেড়ানা যানা ও বলে। তিনদিনে এ অনুষ্ঠান সাধারণত ৩টি জায়গায় সম্পন্ন করতে হয়।

কনের পিতার বাড়িতে:

কনের বিয়ের পর তার সদ্য বিবাহিত বরকে নিয়ে প্রথম বারের মতো বাপের বাড়িতে আনুষ্ঠানিকভাবে যাওয়াকে বিষুত ভাঙা বলে। বরপক্ষ থেকে এ সময় বিনী পিঠা, সান্যা পিঠা, বড়া পিঠা, মদ, মিষ্টি, নারিকেল, পান-সুপারি ইত্যাদি নিয়ে যাওয়া হয়। কনের বাড়রিতে থাকাকালীন নিকট আত্মীয়দের বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে হয়৷ এসময় বর কনেকে নারিকেল, নানা রকম পিঠা, মদ, পান-সুপারি প্রভৃতি জিনিস দেওয়া হয়৷ ১দিন বা ৩দিন অর্থাৎ বিজেড় সংখ্যক দিন থাকার পর বর তার বউকে নিয়ে পুনরায় নিজের বাড়িতে চলে আসে৷

বরের নিয়ে নিকট আত্মীয়দের বাড়িতে:

সাধারণত বর-কনের বাড়িতে গিয়ে ‘বিষুত ভাঙা’ কার্যাদি সম্পন্ন করা হয়। তবে কনের বাড়ি দূরে হলে বরের কোনো নিকট আত্মীয়ের বাড়িতে এ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়। এক্ষেত্রে তেমন একটা আনুষ্ঠানিকতা লক্ষ্য করা যায় না। বর-কনেও দিনের মধ্যে পুনরায় অভিভাবকের বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করে থাকে। এই বিষুত ভাঙা না করলে বর কনে অন্য কারও বাড়িতে পদার্পণ করতে পারে না। বরের নিকট আত্মীয়ের বাড়িতে এ অনুষ্ঠান করার অর্থ হলো অনেকটা নিয়ম রক্ষা করা৷

সবুজ গাছের নীচে:

বর ও কনের বাড়ি অতিশয় দূরে হলে নিয়ম রক্ষার তাগিদে বর কনেকে সবুজ গাছের নীচে গিয়ে সামান্য চা-নাস্তা ও পান-সুপারি খেয়ে বিষুত ভাঙা অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে হয়। এমনকি অভিভাবকদের অসম্মতিতে বিয়ে করলেও সবুজ গাছের নীচে বসে এ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়। অনেকক্ষেত্রে বর কনের বাড়িতে গিয়ে বিবাহ সম্পন্ন করার পর যদি উভয়ের সম্মতি থাকে সেক্ষেত্রে সবুজ গাছের নিচে গিয়ে বিষুত ভাঙা অনুষ্ঠান করতে হয়।

চাকমা বিবাহ-তে প্রচলিত লোক-বিশ্বাস:

চাকমারা প্রাচীন প্রথানুসারে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তাদের বিয়েতে রীতিনীতি মেনে বিবাহ সম্পাদন হয় বলে তাদের কিছু প্রচলিত লোকবিশ্বাসের বিষয়টিও উঠে আসে। যেমন-

বিয়ের সময় বরপক্ষের যাত্রাকালে যদি শিয়াল ডান দিক থেকে বাম দিকে আসে, যাত্রা পথে পানি বা দুধ ভর্তি কলসি দেখা যায় তবে তা শুভ বলে বিবেচিত হয়।

আবার চিল, শকুন, কাক বাম দিক থেকে ডান দিকে ডাকতে থাকলে অশুভ লক্ষণ বলে বিবেচিত হয়।
বিধবা মহিলারা বরপক্ষের দলের সদস্য হতে পারেন না।

পানি তোলার সময় একজন সধবা মহিলা কলা গাছের দু-টুকরা খোলের উপর রেখে পান-সুপারি দিয়ে ভাসিয়ে দেয়। বিশ্বাস করা হয় যে খোল দুটি যদি পাশাপাশি ভাসে তবে ভবিষ্যতে নবদম্পতি সুখে সংসার করবে। আর যদি আলাদা হয়ে যায় তবে তাদের মধ্যে দাম্পত্য কলহের সৃষ্টি হবে।

চাকমাদের বিশ্বাস বীজযুক্ত তুলা ও চাল দীর্ঘ জীবন ও স্বচ্ছলতার প্রতীক আর তুলার বীজ বংশবৃদ্ধির পরিচায়ক।

আধুনিক সময়ে চাকমা বিবাহ:

বর্তমান সময়ে চাকমা বিবাহেও এসেছে পরিবর্তন, লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। বর্তমান সময়ে চাকমা বিবাহ রীতিতে নানা ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। শতাব্দীকাল ধরে প্রচলিত রীতির বাইরে গিয়ে আধুনিককালে অনেকে বৌদ্ধ মন্দিরে গিয়ে কিংবা বাড়িতে বৌদ্ধ ভিক্ষু ফাং করে বিবাহ কার্য সম্পাদন করতে দেখা যাচ্ছে। তবে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে, অনেক চাকমা যুবক যুবতী সামাজিকভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হয়ে বর্তমানে রাষ্ট্রীয় বিবাহ আইন অনুসরণ করে কেবল মাত্র কোর্ট ম্যারিজ করে একটি মাত্র দলিল করে স্বামী স্ত্রীর মর্যাদা নিয়ে বসবাস করে থাকেন। যদিও চাকমা সামাজিক রীতি কখনো এ ধরণের দালিলিক বিবাহকে স্বীকার করেনা এবং সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখে না। চাকমারা মনে করেন তাদের সামাজিক আইন, রীতি ও প্রথা তাদেরই মেনে চলা উচিত। আধুনিকতার সংস্পর্শে এলেও চাকমা আদিবাসী গোষ্ঠী তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়।

 আরও পড়ুন: কুষ্টিয়ার বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী তিলের খাজা

পরিশেষে বলা যায়, চাকমা সম্প্রদায় একটি বৃহত্তর আদিবাসী সম্প্রদায়। সকল সম্প্রদয়ের মতো এ সম্প্রদায়েরও নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। তারা সেই সংস্কৃতির সাথে নিজেদের বেঁধে রাখতে চায়। বিবাহ তাদের সমাজ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠান বলে তারা বিবাহের বিষয়ে রীতিনীতি মেনে ও শুভক্ষণ বিচার করে বিবাহ কার্য সম্পাদন করে থাকে। চাকমা সম্প্রদায়ের বিবাহ বৈচিত্র্য বেশ চমকপ্রদ। বিবাহকে কেন্দ্র করে প্রাথমিক ধাপ থেকে শেষ পর্যন্ত চলে আনন্দ, উৎসব ধুম আর সেই সাথে রীতিনীতি মেনে চলে বিবাহের কাজ। কারণ নবদম্পতি যেন সুখে-শান্তিতে সারা জীবন কাটাতে পারে সেই কামনায় করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button