ফিচারবিখ্যাত ব্যক্তিবৃত্তিসাক্ষাৎকার

ড. জামাল নজরুল ইসলাম: বাংলার আইনস্টাইন!

বাংলাদেশের যে ক’জন বিজ্ঞানী দেশের আঙিনা ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী নিজের জ্ঞান ও প্রজ্ঞাবলে আলো ছড়িয়েছিলেন তাদের মধ্যে ড. জামাল নজরুল ইসলাম অন্যতম। তিনি ছিলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের রুমমেট ও সহকর্মী। কেমব্রিজের লাখ টাকা বেতনের চাকরি ছেড়ে দেশমাত্রিকার টানে বাংলাদেশে চলে আসেন এবং মাত্র ২৮০০ টাকা বেতনে চাকরি নেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। চলুন আজ জেনে নেওয়া যাক এই মহান বিজ্ঞানীর বৈচিত্রময় জীবনের গল্প!

ড. জামাল নজরুল ইসলাম

জন্ম ও পরিচয়:

ড. জামাল নজরুল ইসলাম ১৯৩৯ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ঝিনাইদহের মুন্সেফ (সহকারী জজ) ছিলেন। ঝিনাইদহে জন্মগ্রহণ করলেও তার পৈত্রিক নিবাস ছিলো চট্টগ্রাম। তার বাবার নাম সিরাজুল ইদলাম ও মায়ের নাম ছিল রাহাত আরা বেগম। পিতার চাকরির সূত্রে তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে বিভিন্ন জায়গায়।

জামাল নজরুল ইসলাম
জামাল নজরুল ইসলাম

শিক্ষাজীবন:

ড. জামাল নজরুল ইসলাম ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। তার বয়স যখন মাত্র ১ বছর তখনই তার বাবা কলকাতায় বদলি হন। জামাল নজরুল প্রথমে ভর্তি হন কলকাতার মডেল স্কুলে। এই স্কুল থেকে পরবর্তীতে শিশু বিদ্যাপীঠে ভর্তি হন। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত এই বিদ্যাপীঠেই পড়েন। পরবর্তীতে আবার মডেল স্কুলে ভর্তি হন। এরপর তিনি চট্টগ্রামে চলে আসেন। এখানে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য ভর্তি পরীক্ষা দেন। চট্টগ্রামের কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি পরীক্ষায় তিনি এত ভালো করেছিলেন যে, শিক্ষকৃবন্দ তাকে ডাবল প্রমোশন দিয়ে এক শ্রেণি উপরে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। নবম শ্রেণি পর্যন্ত এই স্কুলে পড়াশোনা করেন।

এখানে পড়ার সময়ই গণিতের প্রতি তার অন্যরকম ভালোবাসার সৃষ্টি হয়। অনেক অতিরিক্ত জ্যামিতি সমাধান করতে থাকেন। নবম শ্রেণিতে উঠার পর পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। সেখানে গিয়ে ভর্তি হন লরেন্স কলেজে। এই কলেজ থেকেই তিনি সিনিয়র কেমব্রিজ ও হায়ার সিনিয়র কেমব্রিজ পাশ করেন। তিনি সময় নিজে অনেক অঙ্ক করতে পছন্দ করতেন। বিভিন্ন বই থেকে সমস্যা নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করতেন যা পরবর্তীতে তার অনেক কাজে আসে। হায়ার সিনিয়র কেমব্রিজে তিনি একাই কেবল গণিত পড়েছিলেন। এটা বেশ উচ্চ পর্যায়ের গণিত হওয়ায় সবাই নিতে চাইতো না।

লরেন্স কলেজের পাঠ শেষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়তে যান। এখান থেকে বিএসসি অনার্স করেন। এই কলেজের একজন শিক্ষককে তিনি নিজের প্রিয় শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার নাম “ফাদার সোরে”। গণিতের জটিল বিষয়গুলো খুব সহজে বুঝিয়ে দিতেন বলেই জামাল নজরুল ইসলাম তার ভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। সোরে তার কাছে গণিতের বিভিন্ন বিষয় জানতে চাইতেন, জামাল নজরুল ইসলাম আগ্রহভরে তা আলোচনা করতেন। সোরের সাথে  তার এই সম্পর্কের কারণ বলতে গিয়ে জামাল নজরুল ইসলাম বলেন, “গণিতকে এমনিতেই অনেকে ভয় পেতাম। কিন্তু এটির প্রতিই ছিল আমার অসীম আগ্রহ। এ কারণেই বোধহয় তিনি আমাকে পছন্দ করতেন।”

আরও পড়ুন# বলপয়েন্ট কলম যেভাবে এলো!

ফাদার সোরে তাকে ডাকতেন জীবন্ত কম্পিউটার বলে। অন্যান্য বিজ্ঞানী যেখানে কম্পিউটার ও ক্যালকুলেটর নিয়ে কাজ করতেন সেখানে ড. জামাল নজরুল ইসলাম এগুলি ছাড়াই বেশ বড় বড় হিসাব মুহূর্তে করে দিতেন। তিনি বলতেন, কম্পিউটার আমার কাছে অপ্রয়োজনীয়। তবে তিনি কম্পিউটারের সাধারণ প্রয়োজনীয়তা কখনো অস্বীকার করেননি।

বিএসসি শেষে ১৯৫৭ সালে তিনি কেমব্রিজে পড়তে যান। কেমব্রিজের প্রায়োগিক গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান থেকে আবারও স্নাতক ডিগ্রি (১৯৫৯) অর্জন করেন। তারপর এখান থেকেই মাস্টার্স (১৯৬০) ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই প্রায়োগিক গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮২ সালে এসসিডি (ডক্টর অফ সায়েন্স) ডিগ্রি অর্জন করেন। ক্যাম্ব্রিজের ট্রিনিটি থেকে গণিতে ট্রাইপস পাস করতে লাগে তিন বছর। ড. জামাল তা দুই বছরে শেষ করে বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছিলেন।

কর্মজীবন:

১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ম্যারিল্যান্ডে ডক্টরাল-উত্তর ফেলো হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি কেমব্রিজের ইনস্টিটিউট অফ থিওরেটিক্যাল অ্যাস্ট্রোনমিতে (বর্তমানে ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোনমি) কাজ করেন ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। ১৯৭১ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে ভিজিটিং সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডনের কিংস কলেজে ফলিত গণিতের প্রভাষক ছিলেন। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ইউনিভার্সিটি কলেজ, কার্ডিফ (বর্তমানে কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়) এর সায়েন্স রিসার্চ কাউন্সিলে ফেলো ছিলেন। ১৯৭৮ সালে তিনি লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটিতে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন এবং পরে রিডার পদে উন্নীত হন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটনে অবস্থিত ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিতে ১৯৬৮, ১৯৭৩ ও ১৯৮৪ সালে ভিজিটিং সদস্য হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৪ সালে ইসলাম বাংলাদেশে ফিরে এসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। পদার্থবিদ্যা বিভাগে অধ্যাপক কোটা খালি না থাকায় তিনি গণিত বিভাগে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং গড়ে তোলেন উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণাগার আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান গাণিতিক ও ভৌতবিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র বা রিসার্স সেন্টার ফর ম্যাথম্যাটিক্যাল অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্স (আরসিএমপিএস)। যা পরবর্তীতে ড. জামাল নজরুল ইসলাম গণিত ও ভৌত বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে নামকরণ করা হয়। এ গবেষণা কেন্দ্রটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত।

জামাল নজরুল ইসলাম গণিত ও ভৌত বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র
জামাল নজরুল ইসলাম গণিত ও ভৌত বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র

২০০১ সালের মাঝামাঝি সময়ে পৃথিবী অচিরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে- এ রকম একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বিশ্বে! বাংলাদেশের মতো পশ্চাৎপদ দেশে এই আতঙ্ক মারাত্মক হয়ে দেখা দেয়। তিনি গণিতের হিসাব কষে দেখিয়ে দেন যে, আমাদের সৌরজগতের অধিকাংশ গ্রহ প্রাকৃতিক নিয়মে একই সরলরেখা বরাবর এলেও এর প্রভাবে এই গ্রহে অস্বাভাবিক কিছু ঘটার আশঙ্কা নেই।

গ্রন্থ ও প্রকাশনায় ড. জামাল নজরুল ইসলাম:

ড. জামাল নজরুল ইসলাম বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য ৬টি বই লিখেছেন। তবে বই, গবেষণা ও সম্পাদনার বিস্তারিত তালিকা আরো বিষদ। এদের মাঝে ৩টি বই বিশ্ববিখ্যাত। ক্যামব্রিজ ও হার্ভার্ড সহ বেশ কয়েকটি নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বই পাঠ্য হিসেবে পড়ানো হয়। তার লেখা বই ‘দ্য আল্টিমেট ফেইট অব দ্য ইউনিভার্স’ ফরাসি, জাপানী, পর্তুগিজ, ইতালিয়ান সহ বেশ কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ‘দ্য আল্টিমেট ফেইট অব দ্য ইউনিভার্স’ই তার প্রথম বই, যা ১৯৮৩ সালে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত এই বইটি তাকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি ও গ্রহণযোগ্যতা এনে দেয়। তার এই বইটির বিষয়বস্তু মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ তথা মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি। বিশ্ববিখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তার ‘ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’ বইটি লিখেছিলেন ১৯৮৮ সালে, জামাল নজরুল ইসলাম কর্তৃক ‘দ্য আল্টিমেট ফেইট অব দ্য ইউনিভার্স’ লেখার আরও পাঁচ বছর পর। দু’টি বইয়ের বিষয়বস্তুই ছিল এক এবং বিশ্বের অন্যান্য বিজ্ঞানীরা জামাল নজরুল ইসলামের লেখা বইটিকেই বেশি তথ্যবহুল ও চমকপ্রদ।

আরও পড়ুন#  গোরু-ছাগলের হাট : আমাদের ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে!

তার উল্লেখযোগ্য আরেকটি বই হচ্ছে Rotating Fields in General Relativity এবং আরেকটি An Introduction to Mathematical Cosmology। অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল কসমোলজি’ তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বই। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বইটির গ্রহণযোগ্যতা ও চাহিদা ব্যাপক। তিনি বাংলায়ও উল্লেখযোগ্য বই লিখেছেন ‘কৃষ্ণ বিবর’, ‘মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান চর্চা এবং অন্যান্য প্রবন্ধ’ এবং ‘শিল্প সাহিত্য ও সমাজ’। তার লেখা ‘ভাষা শহীদ গ্রন্থমালা’ নামে চমৎকার একটি সিরিজ প্রকাশ করেছিল বাংলা একাডেমি। ভাষা শহীদ গ্রন্থমালা সিরিজের অধীনে প্রকাশিত বইগুলোতে সংক্ষেপে কিন্তু পরিপূর্ণভাবে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হতো। ড. জামাল নজরুল ইসলামের কৃষ্ণ বিবরও এই সিরিজেরই একটি বই।

তার লেখা অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল ইকনোমিক্স ও কনফাইনমেন্ট অ্যান্ড শ্রোডিংগার ইকুয়েশন ফর গাউস থিওরিস তার আরো দুটি উল্লেখযোগ্য বই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেগুলো তার জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি।

বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণার জন্য লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটি এক অনন্য নাম। ড. জামাল নজরুল ইসলাম এই প্রসিডিংসয়ে ধারাবাহিকভাবে পরপর ছয়টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এখানে গবেষণাপত্র প্রকাশ করতে গেলে আবার রয়্যাল সোসাইটির কোনো ফেলো সদস্যের রিকমেন্ডেশন লাগে। জামাল নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে রিকমেন্ডেশন করেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংফ্রেড হয়েল। পরপর প্রকাশ করা ছয়টি গবেষণাপত্রের বিষয় ছিল ‘অন রোটেটিং চার্জড ডাস্ট ইন জেনারেল রিলেটিভিটি’। সাধারণ আপেক্ষিকতা ও চার্জিত বস্তু নিয়ে করা গবেষণার উপর ভিত্তি করেই লিখেন ‘রোটেটিং ফিল্ডস ইন জেনারেল রিলেটিভিটি’ নামের বইটি। ১৯৮৫ সালে এটি ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য প্রসিডিংসয়ে প্রকাশিত তার এই গুরুত্বপূর্ণ ও উঁচু মানের গবেষণার জন্য ১৯৮২ সালে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি তাকে অত্যন্ত সম্মানজনক ডিগ্রি ডক্টর অব সায়েন্স প্রদান করে।

দেশপ্রেমিক ড. জামাল নজরুল ইসলাম:

তার চিন্তার অনেকখানি জুড়ে ছিল দেশ ও সমাজের উন্নতি এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ। নিজের আয় থেকে কিছু অর্থ জমিয়ে দরিদ্র ছাত্রদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেন। ১৯৭১ সালে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখে বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ বন্ধের উদ্যোগ নিতে বলেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তার এই পরোক্ষ অবদান অবিস্মরণীয়। ১৯৮৪ সালে তিনি কেমব্রিজের সোয়া লাখ টাকা বেতনের অধ্যাপনার চাকরীটি ছেড়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র হাজার তিনেক টাকা (২৮০০ টাকা) বেতনে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। শুধু নিজে নয়, তার প্রিয় সবাইকেই তিনি পড়াশোনা শেষে দেশে ফেরার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বিদেশে পড়াশোনা করছে এমন সব শিক্ষার্থীকেই পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে আসতে উৎসাহিত করেন। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত লেখক ও শিক্ষক মুহম্মদ জাফর ইকবাল দেশে ফেরার আগে জামাল নজরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। ড. জামাল নজরুল তৎক্ষণাৎ তাকে দেশে ফেরার ব্যাপারে উৎসাহ দেন।

আরও পড়ুন# নকশি পাখা: সুতোয় গাঁথা স্বপ্ন যেন!

কিন্তু ড. জামাল নজরুল ইসলামের দেশে প্রত্যাবর্তন এতটা সহজ ছিল না। তাকেও নিজের দেশের মাটিতে অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ১৯৮১ সালের দিকে দেশে ফিরে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এ সময় তার বেতন ছিল ২৮০০ টাকা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট কিছুতেই রাজি হয়নি তাকে তিন হাজার টাকা বেতন দিতে। এই বেতনেই তিনি অধ্যাপনা করে যান। এখানে এক বছর অধ্যাপনা করার পর গবেষণার কাজে এবং পারিবারিক প্রয়োজনে আবার লন্ডনে ফিরে যাবার প্রয়োজন দেখা দেয় তার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গবেষণার জন্য বাইরে গেলে কর্তৃপক্ষ ছুটি প্রদান করে এবং ফিরে আসা পর্যন্ত চাকরি বলবৎ থাকে। এর জন্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে ছুটির আবেদন করেন, কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাকে ছুটি দিচ্ছিল না। উপায় না দেখে চাকরি ছেড়ে চলে যান তিনি। দুই বছরে সেখানে তার গবেষণা সম্পন্ন করেন। এরপর ১৯৮৪ সালে তিনি সেখানকার বাড়ি-ঘর বিক্রি করে স্থায়ীভাবে দেশে চলে আসেন। এরপর অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার বেতন বাড়িয়ে তিন হাজার টাকায় উন্নীত করে আর মাঝখানের সময়টিকে শিক্ষা ছুটি হিসেবে গ্রহণ করে।

অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম কখনো মোবাইল ফোন ব্যবহার করতেন না। তার দেশের টাকা ভিনদেশি টেলিফোন অপারেটর কোম্পানি বিদেশে নিয়ে যাবে এমনটা তিনি কখনোই মেনে নিতে পারেননি।

পুরস্কার ও সম্মাননা:

বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মাননা। বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি ১৯৮৫ সালে তাকে স্বর্ণপদকে ভূষিত করে। ১৯৯৪ সালে তিনি ন্যাশনাল সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি মেডেল পান। ১৯৯৮ সালে ইতালির আবদুস সালাম সেন্টার ফর থিওরিটিকাল ফিজিক্সে থার্ড ওয়ার্ল্ড একাডেমি অফ সায়েন্স অনুষ্ঠানে তাকে মেডাল লেকচার পদক দেয়া হয়। তিনি ২০০০ সালে কাজী মাহবুবুল্লাহ এন্ড জেবুন্নেছা পদক পান। ২০০০ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। পদার্থবিজ্ঞানে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ২০১১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর রাজ্জাক-শামসুন আজীবন সম্মাননা পদক লাভ করেন। ২০০১ সালে বাংলাদেশ সরকার ড. জামাল নজরুল ইসলামকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় খেতাব একুশে পদকে ভূষিত করে।

মৃত্যু:

২০১৩ সালের ১৬ই মার্চ রাতে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ৭৪ বছর বয়সে অধ্যাপক ড. জামাল নজরুল ইসলাম মৃ’ত্যুবরণ করেন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ হারায় এক সূর্যসন্তানকে।

শেষ কথা:

ড. জামাল নজরুল ইসলাম আজীবন দেশের কথা চিন্তা করেছেন। দেশের উন্নতিকল্পে তিনি ছেড়েছেন বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সুযোগ। ছেড়েছেন উচ্চতর গবেষণা ও অসংখ্য ভোগ বিলাসের সুযোগ। যে স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, ড. জামাল নজরুল ইসলামের কাছে আমি কিছুই না, সেই জামাল নজরুল ইসলামের নাম এখন আর ততটা উচ্চারিত হয় না। তাকে নিয়ে চর্চা হয় না। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ক’জনই তার কথা জানেন? চিরজীবন অবহেলিত হয়েও তিনি সমহিমায় উজ্জ্বল। তিনি আমাদের জন্যে বয়ে এনেছেন গৌরব। আমরাও বলতে পারি, আমাদের একজন জামাল নজরুল ইসলাম ছিলেন। আমাদেরও একজন নোবেল পাওয়ার মতো বিজ্ঞানী ছিল!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button