ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী : পদ্মা সেতু তৈরির অন্যতম প্রধান মহারথী!

 অনুলিপির পোস্ট সবার আগে পড়তে গুগল নিউজে ফলো করুন 👈

একবিংশ শতাব্দীতে যে ক’টি মেগা স্ট্রাকচার পৃথিবীর বুকে নির্মিত হয়েছে তার মধ্যে পদ্মা সেতু অন্যতম। স্বাধীনতার পর যমুনার বুকে তৈরি হওয়া বঙ্গবন্ধু সেতু তৈরির পর থেকেই পদ্মার বুকে সেতু তৈরির স্বপ্ন দেখতে থাকে দক্ষিণবঙ্গ সহ সারাদেশের মানুষ। যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে শুরু হয় মূল সেতুর নির্মাণ কাজ। এর আগে নদী শাসন, জমি অধিগ্রহণ ও প্রাথমিক সমীক্ষার কাজগুলো সম্পন্ন করা হয়। স্বপ্নের পদ্মাসেতু নির্মাণে দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগে বিশ্বব্যাংকের ঋণ প্রদানের ঘোষণা প্রত্যাহার হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে প্রকল্পের প্রধান হন ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী । তিনি আমৃত্যু পদ্মা সেতু প্রকল্পের দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেছেন। শুধু তাই নয়, এ পর্যন্ত বাংলাদেশে যতগুলো বড়ো বড়ো ভৌত অবকাঠামো গড়ে উঠেছে তার প্রতিটি ক্ষেত্রেই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিলেন ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। ১৯৯৮ সালে খুলে দেওয়া বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমুখী সেতুর নির্মাণ প্রকল্পেও তিনি ছিলেন বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রধান।

পদ্মা সেতু
পদ্মা সেতু

ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী : পদ্মা সেতু তৈরির অন্যতম প্রধান মহারথী

জন্ম ও পরিচয়:

অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ই নভেম্বর তৎকালীন সিলেট জেলায়। তার পিতার নাম আবিদ রেজা চৌধুরী, মায়ের নাম হায়াতুন নেছা চৌধুরী। তার পিতাও ছিলেন একজন প্রকৌশলী। তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে জামিলুর রেজা চৌধুরী ছিলেন তৃতীয়। পিতার চাকরির সুবাদে তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী
ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী

আরও পড়ুন# প্রয়াণ দিবসে ড. এপিজে আবদুল কালাম!

শিক্ষাজীবন:

তিন বছর বয়সে তিনি সিলেট ছেড়ে তার পরিবারের সঙ্গে আসামের জোড়াহাট চলে যান। পরবর্তীতে আবার সিলেটে চলে আসেন। তারপর তার পিতার সাথে চলে যান ময়মনসিংহে। সেখানেই কেটেছে তার শৈশব ও কৈশোরের কিছু অংশ। তিনি ময়মনসিংহ জিলা স্কুলেও পড়াশোনা করেন। ১৯৫৭ সালে তিনি সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অংশ নেন এবং প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর ১৯৫৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।

উচ্চমাধ্যমিক পাশের পর তিনি আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৬৩ সালে প্রথম বিভাগে বিএসসি পাস করেন তিনি।

১৯৬৪ সালে তিনি ব্রিটিশ সরকারের বার্মশেল বৃত্তি নিয়ে পড়তে যান ইংল্যান্ডে। এই বৃত্তি সারাদেশে তিনি একাই লাভ করেন। তিনি সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাডভান্সড স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উপর তার এম এস সি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এ সময় কংক্রিট বিমে ফাটলের বিষয়ে তিনি থিসিস করেছেন। ১৯৬৮ সালে তিনি কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ও কম্পিউটার এইডেড ডিজাইন অব হাইরাইজ বিল্ডিং বিষয়ের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

কর্মজীবন:

শিক্ষা বিস্তারে অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী ছিলেন অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব। বিএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর পরই তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ক্লাস নেওয়া শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৩ সালে তিনি প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন পুরকৌশল (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগে। শিক্ষকতা জীবনে পরবর্তীতে তিনি দুই দুইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। হয়েছিলেন জাতীয় অধ্যাপকও।

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

১৯৬৮ পিএইচডি করার পর ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী বুয়েটের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৩ সালে তিনি সহযোগী অধ্যাপক এবং ১৯৭৩ সালে তিনি অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান। ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি বুয়েটের ডিন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এরমধ্যে তিনি বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বও পালন করেছেন।

তিনি যেহেতু কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের উপর পিএইচডি করেছিলেন, তাই তিনি সহজেই বুঝতে পেরেছিলেন ভবিষ্যতের পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করবে কম্পিউটার। কম্পিউটার শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরে তিনি বুয়েটে একটি কম্পিউটার সেন্টার নির্মাণ করেন যা পরবর্তীতে ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন এন্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি, বুয়েট (আইআইসিটি) হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। তিনি বুয়েট কম্পিউটার সেন্টারের পরিচালক ছিলেন দীর্ঘ ১০ বছর। এ সময় তিনি বিভিন্ন বিভাগসমূহে কম্পিউটারের কোর্স তৈরি ও প্রণয়ন করেন। ১৯৭৯ সালে ব্যাংককে ইউনেসক্যাপ-এ কয়েক মাস পরামর্শক হিসেবে ছিলেন। ১৯৭৪-১৯৭৫ সালে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে তিনি যুক্তরাজ্যের সারে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং এসোসিয়েট প্রফেসর ছিলেন।১৯৯৭ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিআইটির গভর্নিং বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০০১ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন৷

আরও পড়ুন# হুমায়ূন আহমেদ : বাংলা সাহিত্যের রাজপুত্র

বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদের চেয়ারম্যান ছিলেন ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত। তিনি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন যুক্তরাজ্যের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের ফেলো। যুক্তরাজ্যের একজন চার্টার্ড ইঞ্জিনিয়ার, বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটির ফেলো। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সভাপতি ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটি এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ২০০৩ সাল থেকে তিনি বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনের সফটওয়্যার রফতানি এবং আইটি সার্ভিস রপ্তানী-সংক্রান্ত টাস্ক ফোর্সের চেয়ারম্যান ছিলেন ১৯৯৭ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত। তিনি প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি টাস্কফোর্সের একজন সদস্য।২০১২ সালের নভেম্বর মাসে তিনি বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হন এবং ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়াপারসন মনোনীত হয়ে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০১২ সালের ২রা মে থেকে আমৃত্যু ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

জামিলুর রেজা চৌধুরী ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন।

জামিলুর রেজা চৌধুরী শিক্ষামূলক কর্মজীবনের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভৌত অবকাঠামোর বেশ কয়েকটি প্রকল্পে অবদান রাখেন। তিনি দেশের প্রথম দীর্ঘ সেতু বঙ্গবন্ধু সেতু তৈরির প্রকল্পেরর প্রধান পরামর্শক ছিলেন। উপকূলীয় অঞ্চলের ঘুর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করেন তিনি। জাতীয় বিল্ডিং কোড ১৯৯৩ তৈরির স্টিয়ারিং কমিটিতে তিনি ছিলেন। দেশের দীর্ঘতম পদ্মা বহুমুখী সেতুর আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ মণ্ডলীর প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি প্রথম ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে সহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের পরামর্শক ছিলেন।

আরও পড়ুন# শিনজো আবের বর্ণাঢ্য জীবন: উত্থান, বিতর্ক ও মৃত্যু

পুরষ্কার ও সম্মাননা:

  • একুশে পদক (২০১৭)
  • জাতীয় অধ্যাপক ঘোষণা (২০১৮)
  • শেলটেক পুরষ্কার (২০১০)
  • বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট স্বর্ণপদক (১৯৯৮)
  • ড. রশিদ স্বর্ণপদক (১৯৯৭)
  • লায়ন্স ইন্টারন্যাশনাল (ডিস্ট্রিক-৩১৫) স্বর্ণপদক
  • রোটারি সিড অ্যাওয়ার্ড (২০০০)
  • অর্ডার অফ দ্য রাইজিং সান (গোল্ড রে ও নেক রিবন) পদক – জাপান সরকারের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক পদক (২০১৮)
  • জাইকা স্বীকৃতি পুরস্কার

ব্যক্তিগত জীবন:

ব্যক্তিগত জীবনে এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক ছিলেন ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। তাঁর স্ত্রীর নাম সেলিনা নওরোজ চৌধুরী।

মৃত্যু:

২০২০ সালের ২৮ শে এপ্রিল তাকে ঢাকার নিজ বাসভবনে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। পরবর্তীতে স্কয়ার হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী ছিলেন বৈষম্যবিহীন বাংলাদেশের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনি স্বপ্ন দেখতেন বৈষম্যবিহীন বাংলাদেশের। মুষ্টিমেয় মানুষের বাইরে গিয়ে সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর উন্নতিকে তিনি বরাবরই প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি সততার ব্যাপারে সবসময় অটল ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সততা না থাকলে কোন কাজে সফল হওয়া সম্ভব নয়। সমগ্র বাংলাদেশ ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর কাছে সবসময় চির কৃতজ্ঞ থাকবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button

Adblock Detected

Dear Viewer, Please Turn Off Your Ad Blocker To Continue Visiting Our Site & Enjoy Our Contents.