ইতিহাসঐতিহ্যফিচারভ্রমণলোকসংস্কৃতি

ষাটগম্বুজ মসজিদ: ঐতিহ্য ও ইতিহাসের বাহক!

বাংলাদেশে মসজিদের সংখ্যা অনেক। বাংলায় বিভিন্ন সুলতানের রাজত্বের ফলে তারা মসজিদ নির্মাণে আগ্রহী হয়। যার নিদর্শন বাংলায় আজও রয়েছে। তাদের নির্মিত মসজিদ অতি সুন্দর, আকর্ষণীয় ও নান্দনিক। তেমনি এক বিখ্যাত ও নান্দনিক মসজিদ হলো ষাটগম্বুজ মসজিদ। এই ষাট গম্বুজ মসজিদ ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর মধ্যে একটি এবং বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ পর্যটন আকর্ষণ। ষাটগম্বুজ মসজিদ ঐতিহ্য ও ইতিহাসের বাহক। এটি সুলতানি আমলের অন্যতম বৃহত্তম ঐতিহাসিক মসজিদ। ষাটগম্বুজ মসজিদ বাগেরহাট শহরে অবস্থিত। এই শহরটিকে মসজিদের শহর বললেও ভুল হয় না।

ষাটগম্বুজ মসজিদ এর অবস্থান

মসজিদের শহর বাগেরহাট মূলত একটি প্রাচীন শহর। বাংলাদেশের তৎকালীন সময়ে দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত বাগেরহাট জেলার অন্তর্ভুক্ত বাগেরহাট শহরের একটি অংশ ছিল এই শহরটি। শহরটি বাগেরহাট-খুলনা থেকে ১৫ মাইল দক্ষিণ পূর্ব দিকে এবং ঢাকা থেকে ২০০ মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত। মসজিদের শহর নামে খ্যাত বাগেরহাট অবস্থিত গঙ্গা এবং ব্রহ্মপূত্র নদীর মিলনস্থানে। উপকূল থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৬০ কিলোমিটার ও শহরটির ক্ষেত্রফল ৫০ বর্গকিলোমিটার। এটি ভৈরব নদীর মরিবান্দ শাখার তীরে পূর্ব-পশ্চিম বরাবর প্রায় ৬ কিমি. এবং উত্তর-দক্ষিণ বরাবর ২৫ কিমি. জুড়ে বিস্তৃত। যা একসময় সুন্দরবন নামক লোনাপানির বনের অংশ হয়ে গিয়েছিল।

খলিফতাবাদ ছিল এই শহরের অপর একটি নাম। এই শহরটি শাহী বাংলার পুদিনার শহর নামেও পরিচিত ছিল। তুর্কি সেনাপতি খান-ই-জাহান ১৫শ শতকে এই শহরটি গড়ে তোলেন। বিশ্বের হারিয়ে যাওয়া ১৫টি শহরের একটি তালিকা তৈরি করেছিল ফোর্বস। আর ৫০টির বেশি ইসলামিক স্থাপত্যের সমন্বয়ে তৈরি এই শহরটি এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এই শহরটি ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হয়। যা মূলত স্থাপত্য কর্মের একটি অসাধারণ নিদর্শন। যা মানব ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপও বর্ণনা করে। মূলত ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর মধ্যে ষাটগম্বুজ মসজিদ অন্যতম। তবে ষাটগম্বুজ মসজিদ ছাড়াও এই শহরের অন্যান্য আরও বেশ কিছু স্থাপনা রয়েছে। যা মূল শহরের অংশ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে খান জাহানের সমাধি, সিঙ্গাইর মসজিদ, নয় গম্বুজ মসজিদ ইত্যাদি। বলা যায়, প্রাচীন স্থাপত্য কলার সুন্দরতম নিদর্শন বাগেরহাট।

#আরও পড়ুন: বিভিন্ন দেশে ঐতিহ্যবাহী ঈদ পালনের ভিন্ন রীতিনীতি

ষাটগম্বুজ মসজিদ এর ইতিহাস

১৪শ খ্রিস্টাব্দের গোড়ার দিকের কথা, তখন সম্রাট ফিরোজ শাহ তুঘলকের শাসনামলে সুদূর দিল্লির জৌনপুর থেকে ইসলাম প্রচারের লক্ষ্যে বাংলা ও তৎকালীন খলিফাবাদের এসব অঞ্চলে আগমন করেন মহান সাধক। যার নাম হযরত খানজাহান (র:)। কথিত রয়েছে, তৎকালীন এ সময় ৬০ হাজার ভক্ত ও মুসলিম সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী তাঁর সাথে ছিল। তাঁর এই দীর্ঘপথ যাত্রায় তিনি প্রথমে আসেন রাজশাহীর সোনা মসজিদ এলাকায়। পরে ফরিদপুর, যশোরের বারোবাজার, খুলনার বাশুয়ারী, ফুলতলা হয়ে বাগেরহাট এসে তাবু স্থাপন করেন। এখানে এসে তিনি বন-জঙ্গল পরিস্কার করে ২০ বর্গমাইলের একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। যার নাম দেন খলিফাতাবাদ। মহান এই পির খলিফাতাবাদ রাজ্যের প্রজা সাধারণের সুবিধার জন্য প্রথমে জাঙ্গাল বা রাস্তা তৈরি করেন। বাগেরহাট শহরটি প্রতিষ্ঠা করেন সুলতানাতের প্রশাসক উলুঘ খান জাহান। প্রকৃত নাম উলুঘ খান জাহান হলেও তিনি খান-ই-জাহান নামে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে একজন সাধক, যোদ্ধা, পির, ফকির, ধর্মপ্রচারক ও সুশাসক। শুধু দক্ষিণবঙ্গ নয় বিশ্ব দরবারে অতি পরিচিত নাম খান-ই-জাহান। অর্ধ সহস্র বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই নাম এতটুকু ম্লান হয়নি। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম সমস্যা ছিল লবণাক্ততা। এর কবল থেকে প্রজাসাধারণের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেন। এজন্য খনন করেন একাধিক দীঘি-নালা। কথিত আছে এ অঞ্চলে তিনি ৩৬০টি দীঘি খনন করেন, এর সাথে নির্মাণ করেন ছোট-বড় ৩৬০টি মসজিদ ও সরাইখানা। তবে এ অঞ্চলে হযরত খানজাহান (র:) এর অমর ও চিরস্মরণীয় কীর্তির প্রধান নিদর্শন ষাটগম্বুজ মসজিদ। যা আজও স্ব-মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে এবং যা ইতিহাসের এক অনন্য নিদর্শন।

ষাট গম্বুজ মসজিদটির গায়ে কোনো শিলালিপি নেই। তাই মসজিদটি আসলে কে কখন নির্মাণ করেছিলেন সে সম্বন্ধে সঠিক কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী দেখে ধারনা করা হয় যে, এটি খান-ই-জাহানের নির্মিত। আরও ধারনা করা হয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে খান-উল-আযম উলুঘ খান ই জাহান অর্থাৎ খানজাহান আলী (র:) মসজিদটি নির্মাণ করেন। এ মসজিদের পশ্চিম পাশে রয়েছে ঐতিহাসিক ঘোড়া দিঘি। যা দৃষ্টিনন্দন এ মসজিদের সৌন্দর্যকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। উত্তর-পূর্ব কোনে রয়েছে কোদাল ধোয়া দিঘি ও উত্তরে ৩শ মিটার দূরে রয়েছে খানজাহানের বসত ভিটা বা ঢিবি এবং দক্ষিনে খুলনা-বাগেরহাট মহাসড়ক। এদিকে খানজাহানের মাজার দরগাহ থেকে মসজিদটির দুরত্ব প্রায় আড়াই কিলোমিটারের মতো। আকৃতির বিচারে বাংলাদেশের ভূখন্ডে অবস্থিত মধ্যযুগীয় মসজিদ গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও দৃষ্টিনন্দন মসজিদ হলো ষাটগম্বুজ মসজিদ। এটি হযরত খান জাহান (র:) এর সর্ববৃহৎ কীর্তি বা নিদর্শন।

ষাটগম্বুজ মসজিদের নামকরণের সঠিক ইতিহাস নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, সংস্কৃত শব্দ ‘সাত’ ও ফারসি শব্দ ‘ছাদ’ এর উপর গম্বুজ থাকায় এটি ‘ছাদগম্বুজ’ থেকে ষাটগম্বুজ এসেছে। আবার কারো মতে, মসজিদের অভ্যন্তরে ছয়টি সারিতে দশটি করে মোট ষাটটি পাথরের খাম্বার উপর মসজিদের ছাদ নির্মাণ করা হয়েছে বলে এর নাম হয়েছে ষাটগম্বুজ।

ষাটগম্বুজ মসজিদ এর নকশা ও বর্ণনা

বর্তমান বাগেরহাট শহর থেকে প্রাচীর বেষ্টিত মসজিদটি তিন মাইল পশ্চিমে ঘোড়া দিঘির পূর্ব পাড়ে অবস্থিত। প্রাচীর বেষ্টিত মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশের জন্য আদিতে দুটি প্রবেশপথ ছিল- একটি পূর্বদিকে এবং অন্যটি উত্তর দিকে। পূর্ব দিকের প্রবেশপথটি বর্তমানে পুনঃনির্মাণ করা হলেও উত্তর দিকেরটি বর্তমানে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পূর্ব দিকের প্রবেশপথটি, যা নিজেই একটি স্বতন্ত্র ভবনের দাবিদার, মসজিদের কেন্দ্রীয় খিলানপথ বরাবর স্থাপিত। খিলান সম্বলিত প্রবেশপথটি ৭.৯২ মিটার দীর্ঘ ও ২.৪৪ মিটার চওড়া। এটি ২.৪৪ মিটার পুরু এবং এর উপরিভাগ সুদৃশ্যভাবে বাঁকানো।

বিশাল আয়তাকার মসজিদের ভবনটি। বাইরের দিক থেকে এর পরিমাপ চার কোণে অবস্থিত দ্বিতল টাওয়ারসহ উত্তর-দক্ষিণে ৪৮.৭৭ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৩২.৯২ মিটার। খিলানপথ রয়েছে মসজিদ অভ্যন্তরে প্রবেশের জন্য রয়েছে। এছাড়া পূর্ব প্রাচীরে এগারোটি, উত্তর এবং দক্ষিণ প্রাচীরে সাতটি করে। তাছাড়া পশ্চিম প্রাচীরে একটি খিলানপথও রয়েছে। কেন্দ্রীয় নেভ-এর ঠিক উত্তর পার্শ্বস্থ ‘বে’ বরাবর পশ্চিম প্রাচীরের খিলানপথটি অবস্থিত। মসজিদ অভ্যন্তরের পরিমাপ ৪৩.৮৯ মিটার × ২৬.৮২ মিটার। মসজিদ অভ্যন্তর ছয় সারি স্তম্ভ সহকারে উত্তর-দক্ষিণে সাতটি আইল এবং পূর্ব-পশ্চিমে এগারোটি ‘বে’তে বিভক্ত।

চারকোণে ৪টি বিরাট মিনার রয়েছে মসজিদটির। এগুলো গোলাকার এবং কার্ণিসের কাছে এগুলোতে বলয়াকারের ব্যাস বয়েছে। কার্ণিসের অনেক উপরে উঠে গেছে মিনার গুলো। আর চূড়ায় রয়েছে অতি সুন্দর গম্বুজ। আজান দেয়ার ব্যবস্থা ছিল এর সামনের দুটি মিনার থেকে। যার একটির নাম ছিল রওশন কোঠা এবং অন্যটির নাম ছিল আন্ধার কোঠা। এই মসজিদের দেওয়াল গুলো বেশ পুরু। যার প্রতিটি দেওয়াল প্রায় সাড়ে আট ফুট পুরু।

পূর্ব দেওয়ালে অর্থাৎ মসজিদের সামনে ১১টি প্রবেশ পথ আছে। মসজিদের দরজাগুলো আকারে বেশ বড়। তবে এর মাঝের দরজাটি অন্যগুলোর চেয়ে অনেক বড়। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে আছে ৭টি দরজা রয়েছে অর্থাৎ সর্বমোট ১৮টি দরজা রয়েছে।

৬০টি স্তম্ভ রয়েছে মসজিদের ভিতরে। ৬ সারিতে এগুলো জ্যামিতিক মাপে উত্তর-দক্ষিণে বসানো হয়েছে এবং ১০টি করে স্তম্ভ আছে প্রত্যেক সারিতে। পাথর কেটে স্তম্ভগুলোকে মাপ মত তৈরি করা হয়েছে। এর সবগুলো স্তম্ভই পাথরের তৈরি। মাত্র ৫টি স্তম্ভের পাথর বাইরের দিকে ইট দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে মসজিদটি।

মসজিদের গম্বুজগুলো নির্মাণ করা হয়েছে ৬০টি স্তম্ভ ও চার পাশের দেওয়ালের উপর। মোট সংখ্যা ৭৭টি গম্বুজ রয়েছে ছাদের উপরে। আরও ৭টি গম্বুজ রয়েছে পূর্ব দেওয়ালের মাঝের দরজা ও পশ্চিম দেওয়ালের মাঝের মিহরাবের মধ্যবর্তী স্থানে ছাদের উপর। অনেকটা বাংলাদেশের চৌচালা ঘরের চালের মত এগুলো দেখতে আর বাকি ৭০টি গম্বুজ অর্ধগোলাকার। তবে ৭০টি গম্বুজ দেখতে খুব একটা বড় নয়। এছাড়া মসজিদের চারকোণায় চারটি মিনারের উপর আরও চারটি গম্বুজ আছে। তাতে গম্বুজের মোট সংখ্যা হয় ৮১টি। তবুও এর নাম ষাট গম্বুজ মসজিদ। ধারণা করা হয়, সম্ভবত মসজিদের ভিতরে ৬০টি স্তম্ভ থাকায় ষাটগম্বুজ নামকরণ করা হয়েছে।

মোট ১০টি মিহরাব রয়েছে মসজিদের ভিতরে পশ্চিম দেওয়ালে। তবে মাঝের মিহরাবটি অন্যান্য মিহরাবের চেয়ে আকারে অনেক বড়। এছাড়া পাথরের অতি সুন্দর কাজ করা হয়েছে যা আজও জ্বল জ্বল করছে। এ মিহরাবের দক্ষিণে পূর্ব দেওয়ালের দরজাগুলো বরাবর ৫টি মিহরাব আছে। মাঝের মেহরাবের উত্তর দিকে আছে মোট ৪টি মিহরাব। মাঝের মিহরাবের উত্তর পাশে যেখানে একটি মেহরাব না থেকে সেখানে আছে একটি ছোট দরজা। মূলত এ দরজা দিয়ে খান জাহান আলী তাঁর দরবারে প্রবেশ করতেন।

কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, দরবার হিসাবেও খান জাহান আলী মসজিদটিকে ব্যবহার করতেন। মাঝের মিহরাবের উত্তর দিকে যে একটি ছোট দরজা আছে সেটি দিয়ে তিনি দরবারে প্রবেশ করতেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন এ মসজিদটি ব্যবহৃত হতো মাদ্রাসা হিসাবেও। তবে মসজিদ ছাড়াও দরবার ও মাদ্রাসা হিসেবে এ মসজিদের ব্যবহার মোটেও অসম্ভব নয়। যেহেতু তিনি সাধক পুরুষ ছিলেন তাই এ মসজিদকে ঘিরে তাঁর যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো।

#আরও পড়ুন: মঙ্গলপুর: জন-মানবশূন্য এক গ্রামের গল্পকথা!

ষাটগম্বুজ মসজিদ এর অলঙ্করণ

পোড়ামাটির ফলক ও ইট সংযোগে মসজিদের অলঙ্করণ বেশিরভাগই সাধিত হয়েছে। তবে এতে রয়েছে হালকা খোদাইকৃত বিরল প্রস্তর অলঙ্করণও। যদিও কালপরিক্রমায় এই অলঙ্করণের বহু অংশই হারিয়ে গেছে, তথাপি খিলানপথ, মিহরাব, গম্বুজের নিচে খিলানগুলির সংযোগস্থল, চৌচালা ভল্টের অভ্যন্তরভাগ, কর্ণার টাওয়ারের উত্থিত বন্ধনী, মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশপথের কার্ণিস ও মসজিদের কার্ণিসে এসবের বেশ কিছু রয়েছে যা এখনও অক্ষত অবস্থায় বিদ্যমান। সমস্ত মসজিদ ভবনের কার্ণিস, অভিক্ষিপ্ত উত্থিত বন্ধনী এবং কর্ণার টাওয়ারের কার্ণিস নকশা করা রয়েছে। আয়তাকার কাঠামোর ভেতর ন্যস্ত খিলানপথের উপরের অংশ অলঙ্কৃত ইট দ্বারা সজ্জিত। খিলানপথের স্প্যান্ড্রেল ও অন্যান্য অংশ অভ্যন্তর ও বহিস্থ উভয় দিকেই বিভিন্ন নকশায় অলঙ্কৃত।

সামান্য অভিক্ষিপ্ত তিনটি অনুভূমিক বন্ধনী আছে যা খিলানপথের উপরে রয়েছে। এগুলির নিচেরটিতে রয়েছে ঝুলানো ফুল নকশা, মাঝেরটি লজেন্স ও ছোট গোলাপ নকশার মিশ্রিত নকশায় শোভিত। তাছাড়া সবার উপরেরটিতে রয়েছে চারপত্র ফুলের অলঙ্করণ। এই বন্ধনীগুলির মাঝে ফাঁকা স্থানটিতে রয়েছে সামান্য ভেতরের দিকে ঢোকানো সংকীর্ণ প্যানেল। উপরের প্যানেলটি শিকলের মাঝে পদ্মফুল সমৃদ্ধ লতাপাতা নকশায় কারুকার্য মণ্ডিত। অন্য পাশে রয়েছে ত্রি-খাঁজ খিলান কুলুঙ্গি নকশা। তালগাছ সদৃশ নকশা এগুলো। কেন্দ্রস্থলে ক্ষুদ্রাকার গোলাপসহ পরষ্পর সংযুক্ত বর্গাকার নকশা এবং ফুলসহ পত্রযুক্ত গাছ নকশায় অলঙ্কৃত। একটি চমৎকার ত্রিভুজাকার নকশা মধ্যে বিদ্যমান। বর্তমানে যদিও এর অলঙ্করণ প্রায় সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে বাকি খিলানপথগুলি কম-বেশি একই রকম। যা মূলত পোড়ামাটির নকশায় সজ্জিত ছিল। অভ্যন্তরভাগে খিলানের স্প্যান্ড্রেল ও খিলানপথের উপরের অংশ বেশিরভাগই মূলত পোড়ামাটির অলঙ্করণে সজ্জিত ছিল। অলঙ্করণের ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রবেশপথেই এই নকশা ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। এছাড়া এগুলো পোড়ামাটির প্যাঁচানো ফুলের নকশা দ্বারা পূর্ণ ছিল।

ছেদী নকশা দ্বারা গঠিত কেন্দ্রীয় নেভের উপর স্থাপিত সাতটি চৌচালা ভল্টের অভ্যন্তরভাগ ঢালু ছাদ দরগা ও অনুভূমিক সরু ইট নির্মিত বন্ধনী। যা পরষ্পর নিপুণ পোড়ামাটির অলঙ্করণে অলঙ্কৃত। যা বাংলার জনপ্রিয় চৌচালা কুড়েঘরের বাঁশের ছাদ-কাঠামোর মতই। ঢালু ছাদ-দরগা ও অনুভূমিক ইট-বন্ধনীগুলির ছেদবিন্দুতে রয়েছে পোড়ামাটি নির্মিত পদ্মফুলের নকশা ফ্রেমটিকে আরও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে তুলেছে। যা এক অপরূপ খোদাইকর্ম হিসেবে প্রতীয়মান। সমগ্র সুলতানি যুগ এই পদ্ধতিটি নির্মাণ প্রকৌশল ও অলঙ্করণের জন্য ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হয়।

ঘোড়া দিঘি

বাগেরহাট এলাকায় সাধু ওলুগ খান জাহান অনেক পুকুর খনন করেছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল ঘোড়া দিঘি। ষাটগম্বুজ মসজিদের পশ্চিম পাশে এই বিশাল জলাশয়টি অবস্থিত। খান জাহান এই অঞ্চলটি জয় করেছিলেন এবং এখানে ইসলাম প্রচার করেছিলেন। আর তখন এই অঞ্চলে পানীয় জলের তীব্র অভাব ছিল। তিনি এই সমস্যা সমাধানের জন্য মসজিদের নিকটে বিশাল এই পানির দিঘি খনন করেছিলেন। সেই থেকে এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য পানীয় জলের নিখরচায় উৎস হয়ে ওঠে ঘোড়া দিঘি। জনশ্রুতি মতে, খান জাহান আলী ঘোড়ায় চড়ে দিঘিটি মাপলেন। এভাবে নাম হয়ে গেল দিঘিটির। অন্যান্য সূত্র থেকে জানা যায় যে, তৎকালীন সময়ে এখানে ঘোড়ার প্রতিযোগিতা হত এবং অনেকগুলি ঘোড়া এই দিঘির তীরে বাঁধা ছিল। এই কারণে লোকেরা এটিকে ঘোড়া দিঘি বলে। এই দিঘিতে বর্তমান সময়ে কুমির রয়েছে এবং অনেকেই বিশ্বাস করেন এই দিঘিতে মানদ করলে মনের আশা পূর্ণ হয়। আর কারও মনের আশা পূর্ণ হলে এ দিঘিতে তারা মানদ পূরণ করে।

জাদুঘর

ষাট গম্বুজ মসজিদ ভেতরে একটি জাদুঘর অবস্থিত। জাদুঘরটি ষাটগম্বুজ মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত। ইউনেস্কোর তহবিলের সাহায্যে এটি ১৯৯৫ সালে খান জাহান আলীর স্মৃতি সংরক্ষণ এবং এই অঞ্চলের মুসলিম সংস্কৃতি ও স্থাপত্য সংরক্ষণের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। মূলত খান জাহান আলী (রহঃ) এর আমলের নিদর্শন সমূহ এই জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। জাদুঘরটি মোট ২৮টি গ্যালারী নিয়ে সজ্জিত। জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে খান জাহান আলী (রহঃ) এর পোষা কুুমির ধলা পাহার এর দেহাবশেষ। এছাড়াও জাদুঘরে রয়েছে বিভিন্ন স্থান থেকে প্রাপ্ত মাটির তৈরি খেলনা, পোড়া মাটির ফলক, কাঁচ ও বিভিন্ন ধাতুর তৈরি তৈজসপত্র, অস্ত্র, আরও অনেক নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী। ষাটগম্বুজ মসজিদের ঐতিহ্য ও ইতিহাস সংরক্ষণ করছে জাদুঘরটি।

সিঙ্গাইর মসজিদ

ষাট গম্বুজ মসজিদের একেবারে সামনে সিঙ্গাইর মসজিদটি অবস্থিত। আর বাগেরহাট শহর থেকে ৩ মাইল দূরত্বে এটি অবস্থিত। ১৫ শতক ও ১৬ শতকের মাঝামাঝি কোন এক সময়ে মসজিদটি খান জাহান আলী এবং তাঁর অনুসারীরা নির্মাণ করেন। এই মসজিদটি বর্গাকারে নির্মিত। সিঙ্গাইর মসজিদের আয়তন ১২.০৪×১২.০৪ মিটার এবং দেয়ালগুলোর পুরুত্ত গড়ে ২.১০মিটার। মসজিদটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট লাল ইটের তৈরি। প্রত্যেক কোণে বাইরের দিকে গোলাকারে বর্ধিত একটি করে সংলগ্ন বুরুজ রয়েছে মসজিদটিতে। পূর্ব দেয়ালে রয়েছে ৩টি খিলানযুক্ত দরজার। যা ছিল মসজিদের প্রধান ফটক। এছাড়াও ১টি করে খিলান দরজা উত্তর ও দক্ষিণের দেয়ালে রয়েছে। মসজিদের ভিতরে পশ্চিম দেয়ালের মাঝামাঝি অংশে একটি অলংকৃত মেহরাব আছে। অনুরূপ অলংকৃত পোড়া মাটির কারুকাজ চোখে পড়ে দরজাগুলোর দু’পাশে।

খান জাহান আলী (র:) মাজার

ষাটগম্বুজ মসজিদের কথা বলতে গেলে খান জাহান আলী (র:) এর নাম চলে আসে। আর তাঁর অনন্য অবদানের কথা এখনও এ অঞ্চলের মানুষ স্মরণ করে। এই মসজিদের কথা বলতে গেলে খান জাহান আলী (র:) এর মাজারের কথা উল্লেখ করতেই হয়। যা ষাটগম্বুজ মসজিদ থেকে কাছেই। ভ্যান অথবা রিক্সাতে ষাটগম্বুজ মসজিদ থেকে যাওয়া যায় এ মাজারে। এ মহান সাধক বাগেরহাটে অনেক মসজিদ নির্মাণ করলেও তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ষাটগম্বুজ মসজিদ। তিনি সাথে করে দুটি কুমির নিয়ে এসেছিলেন আর কুমির দুটির নাম ছিল কালা পাহার এবং ধলা পাহার। যার একটি জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। তাঁর মাজার এক গম্বুজ বিশিষ্ট। মাজারের সামনে একটি বিশাল দিঘি আছে তবে এখানে গোসল করা সম্পূর্ণ নিষেধ। কারণ সম্প্রতি এখানে মিঠাপানির কয়েকটি কুমির ছাড়া হয়েছে। হযরত খান জাহান আলী (র:) মাজার শরীফের শিলালিপি অনুযায়ী ৮৬৩ হিজরি ২৬শে জিলহাজ্ব ষাটগম্বুজ মসজিদের দরবার গৃহে এশার নামাজরত অবস্থায় ৯০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

#আরও পড়ুন: গোরু-ছাগলের হাট : আমাদের ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে!

ষাটগম্বুজ মসজিদ-কে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি

বাগেরহাট দেশের প্রাচীন জনপথগুলোর মধ্যে অন্যতম। ভৌগলিক অবস্থান, প্রকৃতি ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার কারণে বাগেরহাট শহর জনপ্রিয়তায় অনেক এগিয়ে। আর এ শহরকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন খান জাহান আলী (র:)। যার ঐতিহাসিক স্থাপনা ষাটগম্বুজ মসজিদ। ইসলামী স্থাপত্য-রীতির মসজিদগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করলে এই মসজিদটি অন্যতম। মসজিদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ইউনেস্কো ১৯৮৫ সালে বাগেরহাটকে ঐতিহাসিক মসজিদের শহর হিসেবে ঘোষণা করে। যা ৩২১তম বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করে। এর মধ্যে বাগেরহাটের ১৭টি স্থাপনাকে তালিকাভুক্ত করা হয়, যার ১০টিই মসজিদ।

এছাড়া খানজাহান আলী (রহ) এর সমাধি, পীর আলী তাহেরের সমাধি, জিন্দা পীরের সমাধি, সাবেক ডাঙ্গা প্রার্থনা কক্ষ, খানজাহান আলী (রহ) এর বসতভিটা, বড় আদিনা ডিবি, খানজাহানের তৈরি প্রাচীন রাস্তাকেও বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করা হয়।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায় যে, খান জাহান আলীর এক অমর কীর্তি বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ। যা মধ্যযুগীয় বাংলার স্থাপত্যের ইতিহাসকে শুধু সমৃদ্ধই করেনি করেছে গৌরবান্বিত। এ মসজিদ আজও ধর্মীয় দিক থেকে মহিমা ছড়াচ্ছে। মসজিদটির গায়ে কোন শিলালিপি না থাকায় এর সম্পর্কে অনেক তথ্য আমাদের অজানা রয়ে গেছে। তবে ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Back to top button

Opps, You are using ads blocker!

প্রিয় পাঠক, আপনি অ্যাড ব্লকার ব্যবহার করছেন, যার ফলে আমরা রেভেনিউ হারাচ্ছি, দয়া করে অ্যাড ব্লকারটি বন্ধ করুন।