ধর্মশিল্প ও সাহিত্য

সরলতা | আবুল হাসনাত বাঁধন

সরলতা | আবুল হাসনাত বাঁধন

ছেলেটার বয়স তখন সবে মাত্র পাঁচ বছর। কিন্টারগার্ডেন স্কুলে নার্সারীতে পড়ত। বাবা প্রবাসী। ছেলেটা নানু বাড়িতে থাকত মায়ের সাথে। এক বার বাবা বিদেশ থেকে দেশে আসলেন। প্রথম সাময়িক পরীক্ষা শেষ হলে, নানু বাড়ি থেকে বাবা-মা সহ গ্রামে বেড়াতে গেল তারা। নিজের বাড়িতে মানুষ ক্ষণিকের অতিথি হয়েও বেড়াতে যায়। কী অদ্ভুত জীবন মানুষের! তাই না?

ছেলেটির কিছু পাগলাটে বৈশিষ্ট্য ছিল। যেমন-

  • সব কিছু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে অর্থাৎ যুক্তি যুক্ত কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করত, ভাবত।
  • আম্মুকে না বলে কোথাও যেত না। এমনকি টয়লেটে যেতেও আম্মুকে বলে যেত।
  • আকাশ আর গাছের দিকে আনমনে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে নিজের সাথে কথা বলত।
  • নিজে নিজে কাল্পনিক চরিত্র তৈরি করে তাদের সাথেই খেলত একা একা।
  • তার প্রিয় বন্ধু ছিল পুকুর পাড়ের গাছেরা আর তার মেজো নানাদের পোষা ছাগল “মিন্টু”।

বরাবরের মতোই ছেলেটা পড়াশোনায় খুব মেধাবী ছিল। প্রতি ক্লাসে রোল ১ থাকত! কিন্তু সাদা-সিধে হওয়ায় ক্লাসের অন্য সবার অত্যাচার নীরবে চোখ বুজে সহ্য করতে হতো তাকে।

আরও পড়ুন: বই এবং বই পড়া!

গ্রামে ছেলেটির দাদা-দাদি কেউ ছিল না। দাদি মারা গেছেন তার জন্মের প্রায় ২০ বছর আগেই। আর দাদা মারা গিয়েছিলেন সে বছরই।

তো, শুক্রবারে জুমার নামাজ পড়ার পর বাবার সাথে সে যাচ্ছিল দাদা-দাদির কবর জিয়ারত করতে। সে সময় বাবার সাথে কথা বলছিল,

– আচ্ছা, আব্বু দাদু (দাদি) আর দাদাভাই (দাদা) মরে গেছে কেন?
– আল্লাহর কাছে চলে গেছেন।
– কেন চলে গেছেন?
– কারণ, উনারা বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।
– কেন বৃদ্ধ হয়েছিলেন?
– কারণ আমরা ছেলে-মেয়েরা বড়ো হয়ে গেছিলাম।
– ছেলে-মেয়েরা বড়ো হলে কী হয়?
– মা-বাবার চুল পেকে যায়, তারা বৃদ্ধ হয়ে যান।

এরপর আর কথা বলার সুযোগ পায়নি বাবার সাথে। বাবা খেয়াল করলেন মোনাজাতের সময় ছেলেটা বিড়বিড় করে কী যেন বলছে। কবরস্থান থেকে ফেরার পথে বাবা জিজ্ঞেস করলেন,

– মোনাজাতে কী বলেছো, আব্বু?
– বলছি, আল্লাহ আমাকে আর বড়ো করিয়ো না প্লিজ! আমি যেন এইটুকুই থাকি।
– ওমা! কেন? কেন?
– কারণ আমি বড়ো হয়ে গেলে, তোমার আর আম্মুর চুল পেকে যাবে। তোমরাও বৃদ্ধ হয়ে যাবে দাদু আর দাদাভাইয়ের মতো! এরপর আমাকে ফেলে আল্লাহর কাছে চলে যাবা। এইটা আমি হতে দেবো না।

বাবা নির্বাক হয়ে গেলেন! হাসবেন নাকি কাঁদবেন বুঝতে পারলেন না। শেষমেষ ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন।

অণুগল্প: সরলতা

লেখা: আবুল হাসনাত বাঁধন

তারিখ: ০২/১২/২০১৫
স্থান: পাথরঘাটা, চট্টগ্রাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button