ঐতিহ্যফিচারলোকসংস্কৃতি

সুন্দরবনের বনজীবীদের জীবন-জীবিকার কষ্টগাঁথা!

সুন্দরবন যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপার লীলাভূমি। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন হলো সুন্দরবন। বাংলাদেশের গর্ব সুন্দরবন। এই অপরূপ বনভূমি বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দুই জেলা উত্তর চব্বিশ পরগনা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জুড়ে বিস্তৃত। বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড বনভূমি। কারণ এটি সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড়ো ম্যানগ্রোভ বন। জাতীয় অর্থনীতিতেও সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এটিকে দেশের বনজ সম্পদের একক বৃহত্তম উৎস বলা হয়। মধু, মোম, গোলপাতা, মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া ও জ্বালানি কাঠ সুন্দরবন থেকে সবচেয়ে বেশি সংগ্রহ হয়। কিন্তু এসব যারা সংগ্রহ করেন তাদের খোঁজ কেউ রাখে না। মানুষের জন্য বিপদসঙ্কুল সুন্দরবন। সুন্দরবনে থাকতে থাকতে মানুষজন বিভিন্ন ধরনের বিপদের সম্মুখীন হয়। আবার তারা বিপদ থেকে মুক্তির বিভিন্ন উপায়ও আবিষ্কার করে ফেলে এই বিপদের সাথে লড়াই করতে করতই। এই বিপদসঙ্কুল সুন্দরবনে জীবিকার তাগিদে নানা পেশার লোক বসবাস করেন। তাদের কেউ মধু সংগ্রহ করে, কেউ মাছ সংগ্রহ করে, কেউ গোলপাতা সংগ্রহ করে। বৈচিত্র্যেঘেরা এই সুন্দরবনে নানা পেশার লোকজনই মূলত বনজীবী। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে বংশপরম্পরায় সুন্দরবনের বনজীবীরা এসব পেশাকে বেছে নিয়েছে। কিন্তু এসব বনজীবীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গহীন বন থেকে বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহ করে আনে। তাদের সঠিক চিকিৎসা নেই, বিশুদ্ধ পানির অভাব, প্রাণীর আক্রমণের ভয় থাকে। অভাব আর কষ্টে মোড়ানো এক কষ্টগাঁথা সুন্দরবনের এই বনজীবীদের জীবন।

সুন্দরবনের বিভিন্ন পেশাজীবী / বনজীবী সম্প্রদায়:

সুন্দরবনের বনজীবীদের বাস জল আর জঙ্গলে। তাদের বাঁচতে হয় বাঘ, কুমীর, কামট আর হিংস্র প্রাণীদের সঙ্গে লড়াই করে। এর ওপর আছে ঝড় ঝঞ্ঝা, বান, বন্যার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়। আছে ভয়ংকর ডাকাত, জলদস্যুদের আক্রমণ। কোথাও যেনো তাদের নিস্তার নেই। এ যেন- ‘জলে কুমির ডাঙায় বাঘ’। তবে সত্যিই কিন্তু তাই। সুন্দরবনের বনজীবীদের এইসব বিপদ মাথায় রেখেই প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়। অসহায় মানুষগুলো কখনো লড়াই করছে দারিদ্রের সঙ্গে কখনো আবার জলা-জঙ্গলে। টিকে থাকতে পারা হলো তাদের মূল স্বার্থকতা। সুন্দরবনে বিভিন্ন পেশাজীবী সম্প্রদায় আজও টিকে আছে৷ তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

বাওয়ালি বা বাউলে:

সুন্দরবনে যারা কাঠুরিয়া ও গোলপাতা সংগ্রহ করে তাদের বলা হয় বাওয়ালি বা বাউলে। সুন্দরবনের প্রধান গাছপালার মধ্যে অন্যতম সুন্দরী গাছ। সুন্দরবনের গহীন থেকে এরা সুন্দরী, গেওয়া, গড়ান, পশুর, বাইন, হেঁতাল, গোলপাতা, খামু, লতা সুন্দরী, কেওড়া, ধুন্দুল, আমুর, ছৈলা, ওড়া, কাঁকরা, সিংরা, ঝানা, খলশি ইত্যাদি গাছের কাঠ সংগ্রহ করে। এছাড়া বাওয়ালিরা গোলপাতা সংগ্রহ করে থাকে।

সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাওয়ালিরা সুন্দরবনে অবস্থান করেন এজন্য বনবিভাগ থেকে পাস নিতে হয় তাদের৷ তবে এর মধ্যে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর সুন্দরবনে কাঠ কাটার সময় এবং নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি গোলপাতা কাটার সময়।

সুন্দরবনের বনজীবীদের জীবন-জীবিকার কষ্টগাঁথা!
গোলপাতা সংগ্রহ

সুন্দরবনের ভারতের অংশে বর্তমানে এই কাঠ কাটা ও গোলপাতা সংগ্রহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া একজন গুনিন বা ওঝা থাকেন সুন্দরবনের বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত দলের সঙ্গে। তাকেও বাউলে বলা হয়ে থাকে।

মৌলেরা মধু সংগ্রহের সময় বাউলিদের নিয়ে যান। তাদের সম্পর্কে ধারণা করা হয় যে তারা বাঘ সামলাতে পারেন। বিভিন্ন মন্ত্রবলের প্রয়োগে তারা বাঘকে কাছে আসতে দেয় না। আর আসলেও তারা বাঘকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। মুসলমান বাউলিদের আবার বিভিন্ন নিয়ম পালন করতে হয়। যেমন: শুক্রবার যেহেতু জুম্মাবার সেজন্য এই দিন তারা জঙ্গলে যেতে পারবে না, কাঁকড়া কিংবা শূকরের মাংস তারা খেতে পারবে না, সুদের কোনো কারবার করতে পারবে না ইত্যাদি। এই অঞ্চলে বাউলিদের জীবনই সবচেয়ে কঠিন এবং অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

স্থানীয় জেলে:

স্থানীয় জেলেরা সুন্দরবনে সব সময়ই মাছ শিকার করে থাকে। তবে সুন্দরবনে শীতের সময়ে সবচেয়ে বেশি জেলে আসেন মাছ ধরতে ও সংগ্রহ করতে৷ বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে এসব স্থানীয় জেলেরা সুন্দরবনের ভেতরের নদী ও খালে মাছ শিকার করে থাকেন।

ভোঁদড় জেলে:

অনেকেই ভোঁদড় জেলেদের বিষয়ে জানেন না। একসময় তারা থাকলেও আজ সুন্দরবন থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে বহুকালের ঐতিহ্য ভোঁদড় জেলে সম্প্রদায়৷ নড়াইলের চিত্রা নদী তীরের একদল মৎস্যজীবী এরা। ছোটো ছোটো নৌকায় চেপে সুন্দরবনের ভেতরে গিয়ে উদ্ববিড়াল বা ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরেন তারা। নদীতে জাল পেতে পোষা ভোঁদড়দের তারা ছেড়ে দেন নদীতে। ভোঁদড় জেলে পানির মধ্য থেকে মাছ তাড়িয়ে আনলে জাল তুলে ফেলেন। বংশ পরম্পরায় সুন্দরবন থেকে এই পদ্ধতিতে মাছ সংগ্রহ করেন তারা।

কাঁকড়া শিকারি:

সুন্দরবনের পেশাজীবীদের মধ্যে এক শ্রেণির বনজীবী আছেন, যারা শুধুমাত্র কাঁকড়া শিকার করতেই সুন্দরবনে যান। ছোট ছোটো নৌকায় করে এসব মানুষ সুন্দরবনের খালে, নদীতে কাঁকড়া শিকার করে থাকেন। তারা জঙ্গলের গহীনে চলে যান সপ্তাহের চাল, ডাল, বাজার সহ এবং এক সপ্তাহ ধরে কাঁকড়া সংগ্রহ করে ফিরে আসেন। কাঁকড়া শিকারিরা যেহেতু দিন-রাত ধরে নির্দিষ্ট সময়ে কাঁকড়া শিকার করেন সেহেতু তারা। আবার অনেকেই সুন্দরবনসংলগ্ন নদ-নদীতে সারা বছর  কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। কাঁকড়া সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেকেই বাস্তব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন। কেউ কুমিরের হাতে কেউবা বাঘের মুখে পড়েছেন। কেউ প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন কেউ আর ফিরে আসতে পারেননি, কেউবা আবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে বেঁচে ফিরেছেন কিন্তু তাদের আর জীবিকা নির্বাহ করার মতো শক্তি বা সামর্থ্য নেই। এভাবেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাঁকড়া শিকারিরা বনের ভেতরে যান কাঁকড়া সংগ্রহ করতে।

রেণু শিকারি:

সুন্দরবনের নদী-খালে রেণু শিকারিরা মূলত মাছের পোনা সংগ্রহ করে থাকেন। তারপর কৃষকদের নিকট বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন তারা৷ সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোর অনেক নারী ও শিশু এ পেশায় নিযুক্ত। স্থানীয় নারী ও শিশুরা জীবিকার প্রয়োজনে এ পেশাকে বেছে নিয়েছে। সাধারণত পুরুষরা অন্য কাজ করে আর নারীরা তাদের ঘর-সংসার সামলে মাছের রেণু সংগ্রহ করে থাকে।

সুন্দরবনের বনজীবীদের জীবন-জীবিকার কষ্টগাঁথা!
মাছের পোনা সংগ্রহ

মৌয়াল বা মৌলে:

সুন্দরবন বৈচিত্র্যে ভরা। এ বনের গাছে গাছে হরেক পদের ফুল গ্রীষ্মের শুরুতেই ফুটতে শুরু করে। খলিশা, সুন্দরী, বাইন, পশুর, গেওয়া, কেওড়া, হেতাল, কাঁকড়া, গর্জন, ধুন্দল আরও কতশত চেনা অচেনা গাছে ফুল ফোটে সুন্দরবনের বনে। আর সেসব ফুলের ঘ্রাণ ছড়িয়ে দেয় বনের আকাশে বাতাসে। ফুলের এই ঘ্রাণে মাতোয়ারা হয় মৌমাছির দল। ফুলের প্রতি আকৃষ্ট হয় তারা। এসব ফুল থেকেই মধু সংগ্রহ করে মৌমাছির ঝাঁক চাক বাঁধে গাছে গাছে।

সাধারণত সুন্দরবনে যারা মধু সংগ্রহ করে তাদের মৌয়াল বা মৌলে বলে। মধু সংগ্রহের আগের দিন বনে যাত্রার উদ্দেশ্যে সবাই প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করেন। পহেলা এপ্রিল যাত্রা শুরুর আগে মৌয়ালদের বনের রাজস্ব আদায়সহ কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে হয়। এরপর বনের উদ্দেশ্যে নৌকা ছুটাতে হয়।

বনে যাত্রার আগে সবাই পরিবার পরিজন থেকে বিদায় নেন। আবার কারও কোনো ঋণ বা বাকি থাকলে সেটা পরিবারের সদস্যদের জানিয়ে দেবার নিয়ম রয়েছে। কারণ এ যাত্রায় সবার মধ্যেই না ফেরার একটা শঙ্কা কাজ করে। তবুও তারা পেশার তাগিদে সবাই ছুটে যান বনের গহীনে।

সুন্দরবনের বনজীবীদের জীবন-জীবিকার কষ্টগাঁথা!
মৌয়ালের মধু সংগ্রহ

মৌয়ালরা মধু সংগ্রহ শেষে নিরাপদে ফিরে আসার জন্য যাত্রা শুরুর আগে একটি প্রার্থনা সভার আয়োজন করে। এরপর প্রত্যেক মৌয়ালের হাতে বেঁধে দেয়া হয় লাল কাপড় কারণ তাদের বিশ্বাস এ কাপড় বিপদ-আপদ, বিশেষ করে বনের রাজার বাঘের হাত থেকে রক্ষা করবে।

তিন মাসের জন্য মৌয়ালদের বনে মধু সংগ্রহের অনুমতি দিয়ে থাকে বন বিভাগ। একেকবারে ১৫ দিনের জন্য অনুমতি পান।

সাধারণত একেকটি দলে ৭ থেকে ১৩জন মৌয়াল থাকেন। একজনকে নৌকা পাহারায় রেখে সবাই বনের ভেতরে ঢুকে পড়েন। মৌমাছির হুল ফুটানো থেকে বাঁচাতে তারা গামছা দিয়ে চোখ-মুখ বেঁধে নেন। এসময় মৌয়ালদের চোখ থাকে গাছের ডালে ডালে। সবার হাতে থাকে দা ও ধামা।

তারা সুন্দরবনের গভীরে মধু সংগ্রহ করেন৷ সংগ্রহ শেষে মধু নিয়ে নৌকায় ফিরে আসেন তারা। মাটির বড়ো মটকিতে চাকসহ মধু সংগ্রহ করে রাখা হয়। এই পেশাটিই সবথেকে ঝুঁকিপূর্ণ একটি পেশা। যেটিতে জীবনহানির সম্ভাবনা রয়েছে ১০০ শতাংশ।

ছন কাটা:

সুন্দরবনের ভেতরে বিভিন্ন স্থানে অনেক তৃণভূমি রয়েছে। সেসব তৃণভূমিতে জন্ম নেয় প্রচুর ছন গাছ। সাধারণত ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে এসব ছন কাটার জন্য একদল বনজীবী সুন্দরবনে যান। এসব বনজীবী মূলত ছন কেটেই জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। এসব ছন গাছ বিভিন্ন এলাকায় ঘরের ছাউনি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও পানের বরজে ব্যবহৃত হয় এসব ছন।

সুন্দরবনের বনজীবীদের ধর্মীয় বিশ্বাস:

সুন্দরবনের বনজীবীদের আচার আচরণ, রীতিনীতি, জীবনযাত্রার ধারণ, তাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাস সবকিছুকে ঘিরেই তাদের রয়েছে বেঁচে থাকার তাগিদ।

সুন্দরবনে মূলত হিন্দু এবং মুসলমান এই দুই ধর্মের মানুষ বসবাস করে। মুসলমানদের মধ্যে রয়েছে শেখ, সাইয়িদ, পাঠান ইত্যাদি। আবার হিন্দুদের মধ্যে  নাপিত, কৈবর্ত, চণ্ডাল, জালিয়া, ধোবা, যোগী ইত্যাদি শ্রেণীর মানুষদের। জীবিকার জন্য তাদেরকে বনের ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সাথে লড়াই করেও বেঁচে থাকতে হয় তাদের।

এজন্য তারা তাদের বিপদ ও সমস্যা সমাধানের উপায় হিসেবে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং দেবতাদের উপর নির্ভর করে থাকে। যেমন- কুমিরদের নিয়ে সুন্দরবনের গ্রামবাসীদের আতঙ্কের শেষ নেই। সেজন্য পরিবারের মেয়েরা কুমির ব্রত পালন করে থাকে। যাতে তারা কুমির দেবতাকে সন্তুষ্ট করতে পারে। আবার হিন্দু দেবতাদের মধ্যে সুন্দরবনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত দক্ষিণ রায় এবং বনদূর্গা।

সুন্দরবনের মানুষেরা দক্ষিণ রায়কে বাঘের দেবতা মনে করে থাকেন। সুন্দরবনের বসবাসরত বনজীবী মানুষেরা তার পূজা করে থাকে। দক্ষিণ রায় মূলত লৌকিক দেবতা। আবার হিন্দুরা বনদূর্গারও পূজা করেন। তিনি লৌকিক দেবী। গহীন বনে বনদূর্গার মন্দির আছে৷ বনজীবীরা গহীন বনে প্রবেশের আগে বনদূর্গাকে স্মরণ করে। তবে যিনি বনদূর্গা তিনিই মূলত বনবিবি। মুসলিমরা বনবিবিকে বিশ্বাস করেন, সে জঙ্গলের সবাইকে রক্ষা করে থাকেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, বনবিবি বা বনদূর্গাকে হিন্দু এবং মুসলমান উভয় ধর্মীয় সম্প্রদায়ের লোকজনই বিশ্বাস করে এবং তাঁর শক্তিকে ঐশ্বরিক শক্তি হিসেবে মনে করা হয়ে থাকে। কিন্তু দুই ধর্মের মানুষরা ভিন্নভাবে বনবিবি ও বনদূর্গার জন্য ধর্মীয় আচারপূর্ণ অনুষ্ঠান পালন করে থাকেন।

সুন্দরবনের বনজীবীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা:

সুন্দরবনের বনজীবীরা লড়াই করে বেঁচে আছে। তাদের জীবন সংগ্রাম যেনো কষ্টে মোড়ানো এক জীবনগাঁথা। প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দূর্যোগ আর বন্যপ্রাণীর সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে হয় এখানে। লড়ায়ে যে জিতে যায় সেই সুন্দরবনে রাজত্ব করে। প্রতিটি দিন তাদের কাটে সংকট আর শঙ্কায়। জীবন ধারণের তাগিদ মানুষকে যে কতটা বিপদে ফেলতে পারে তার উদাহরণ সুন্দরবন।

অসহায় আর দরিদ্র বনজীবীরা জীবিকার সন্ধানে প্রতিনিয়ত যে জীবন ঝুঁকি নিচ্ছে এই ঝুঁকিই তাদের নিত্য সঙ্গী। তারা জানে না গহীন বনে গেলে তাদের আর ফেরা হবে কিনা। তবুও তারা জীবন বাঁচিয়ে রাখতে চালায় জীবিকার সন্ধান।

যুগ যুগ ধরে বনে মাছ-কাঁকড়া, চিংড়ির পোনা ধরে, মধু আহরণ করে, গোলপাতা কাটাসহ বিভিন্ন কাজ জীবিকা নির্বাহ করছে বনজীবীরা। কিন্তু অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে বনে যাওয়া সত্ত্বেও বনজীবীদের এখন সারা বছর সংসার চালিয়ে নেওয়ার মতো অবস্থা হচ্ছে না। কারণ বনের মাছ কমে গেছে, আগের মতো আর মধু পাওয়া যাচ্ছে না, গোলপাতা-গরান কাটা এখন প্রায় বন্ধ, আবার বনের কাঠ কাটায় চলে নিষেধাজ্ঞা। এসব কারণেই বনজীবীরা বনে যেতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

সুন্দরবনে এখন মাত্র চার-পাঁচ মাস কাজ করতে পারেন বনজীবীরা। এতে তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। সুন্দরবনের শিশুরা ছোটোবেলা থেকে বনের বিভিন্ন কাজে পারদর্শী হয়ে ওঠে। লেখাপড়া শেখার জন্য বিদ্যালয়ে যাওয়ার চেয়ে বনে যাওয়াটা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাপ-দাদার এই পেশা আঁকড়ে ধরাটাই যেন তাদের নিয়তি।

সুন্দরবনের বনজীবীদের সুপেয় পানির কোনো ব্যবস্থা নেই। নারীরা নৌকা নিয়ে কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করে আনে। তাদের খাদ্য জোগাড়ের চিন্তা মাথায় ঘোরে প্রতিনিয়ত। আবার বাঘ, কুমির বা বন্যপ্রাণীর আক্রমণের শিকার হলে দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থাও নেই এখানে। অসহায় মানুষগুলো যেন সবদিক থেকেই বঞ্চিত। সুন্দরবনের পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সমান তালে কঠোর পরিশ্রম করে বেঁচে থাকার জন্য। তারা সাধ্যমতো পরিবারকে সহায়তা করে থাকে। এরা পরিশ্রমী হয়ে থাকে। জীবনই তাদের টিকে থাকার মন্ত্র শিখিয়েছে জীবনের তাগিদে।

আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সুন্দরবনের সম্পদ আহরণে বেশ প্রভাব পড়েছে। আগে একবার বনে গেলে যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যেত, এখন সারা বছরেও তা মেলে না। তাছাড়া অন্যান্য সম্পদও কমে গেছে।

আরও পড়ুন:  কুষ্টিয়ার বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী তিলের খাজা

পরিশেষে বলা যায়, সুন্দরবনের বনজীবীদের হিংস্র বন্য প্রাণীকে মোকাবিলা করেই বছরের বড়ো একটা সময় জঙ্গলে কাটিয়ে দিতে হয় ৷ প্রতিবছর এসব বনজীবীদের অনেকেই আর প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পারে না। নিজেদের খাবারের সন্ধানে গিয়ে বাঘের খাবার হয়ে থাকেন তারা। প্রতিনিয়ত অনিশ্চিত জীবনের এই মানুষগুলোর সংগ্রামের শেষ কোথায় কে জানে। তাই সরকারের উচিত তাদের দিকে সুনজর দেওয়া যাতে তারা স্বচ্ছ্বলভাবে বাঁচতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button