স্বাস্থ্য ও লাইফস্টাইল

গ্যাস্ট্রিক থেকে আলসার হওয়ার আগে কোন লক্ষণগুলো দেখলে সচেতন হবেন?

বর্তমানে আমাদের দেশে কমন একটি সমস্যা গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটির। প্রায় ৯০% মানুষ গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটির সমস্যায় ভুগে থাকেন। এর কারণ মূলত আমাদের দৈনন্দিন জীবনের খাদ্যাভ্যাস। আমরা আমাদের খাদ্যাভ্যাস এমন ভাবে গড়ে তুলেছি যে, আমসদের পেটে সব সময় তৈরি হতেই থাকে। আর এই অ্যাসিডিটির মাত্রা এত অধিক ও স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে যে কারও হার্ট এট্যাক হলেও তা গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটির সমস্যা মনে করে মারাত্মক ভুল করে ফেলি। তবে, এই অ্যাসিডিটির সমস্যায় দীর্ঘদিন ধরে চললে তা একসময় আলসারের রূপ নেয়। তো আজকে আমরা জানব— গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটি থেকে আলসার কেন হয়? গ্যাস্ট্রিক থেকে আলসার হওয়ার আগে কোন লক্ষণগুলো দেখলে সচেতন হবেন?

আলসার কী এবং কেন আলসার হয়?
আলসার শব্দের অর্থ ক্ষত। মূলত আলসারের সৃষ্টি হয় তখন, যখন পরিপাকতন্ত্রের অ্যাসিড ক্ষুদ্রান্ত ও পাকিস্থলির ভেতরের দেয়ালে ক্ষত করে। সাধারণত পরিপাকতন্ত্রের দেয়াল এক রকমের মিউকাস বা শ্লেষ্মা জাতীয় আবরণে আবৃত থাকে, আর এই মিউকাস বা শ্লেষ্মা লেয়ারই অ্যাসিড হতে পরিপাকতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখে। তো যখন অ্যাসিডের পরিমাণ অরিরিক্ত বেশি হয় তখন মিউকাস লেয়ারের পরিমাণ কমে যায়। আর তখনই আলসার হয়। কিন্তু এছাড়াও আলসার হওয়ার আরও বেশকিছু কারণ আছে। যেমন—

১| হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি নামক এক রকমের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটলে তা পরিপাকতন্ত্রের মিউকাস বা শ্লেষ্মা লেয়ারের পরিমাণ কমিয়ে দেয়, ফলে আলসারের সৃষ্টি হয়।
২| নিয়মিত যদি বিভিন্ন রকম ব্যথার ওষুধ বা এনএসএআইডি (NSAID) জাতীয় ওষুধ ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত অতিরিক্ত সেবন করা হয়; তবে তা মিউকাস লেয়ারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে আলসার সৃষ্টি করে। কিছু ব্যথা বা এনএসএআইডি জাতীয় ওষুধ হলো— অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন, ন্যাপ্রোক্সেন ইত্যাদি। দেখা যায় অনেকেই এই ধরনের ওষুধ একটু সামান্য সমস্যা দেখা দিলেই খেয়ে ফেলে। যা একদমই উচিত নয়।
৩| অনেকেই আছেন যারা স্টেরয়েড জাতীয় ঔষধ অনিয়মিত সেবন করে। এসব ওষুধ অনিয়মিত সেবনে পাকিস্থলীর মিউকাস লেয়ার কমে আলসারের সৃষ্টি করে।

৪| অনেকেই আছেন যারা অতিরিক্ত ধূমপান করেন৷ অতিরিক্ত ধূমপান করলেও আলসারের সমস্যা হয়।
৫| অনেকেই আছেন যারা মাদকাসক্ত। নিয়মিত মদ্যপান করলে তা আলসারের সমস্যার জন্য দায়ী। কেন না, অ্যালকোহল পাকস্থলীর মিউকাস লেয়ার ক্ষয় করে। এছাড়াও প্রচুর অ্যাসিড উৎপন্ন করে যা আলসারের জন্য দায়ী।
৬| মানসিক স্ট্রেস ও আলাসারের জন্য দায়ী। অতিরিক্ত স্ট্রেসে থাকলে তা গ্যাস্ট্রিকের পরিমাণ বৃদ্ধি করে, যা পরবর্তীতে আলসারের সৃষ্টি করে।
৭| আমরা অনেকেই আছি যারা অতিরিক্ত ঝাল, তেল ও মশকাযুক্ত খাবার খেতে অভ্যস্ত। এইসব খাবারও অ্যাসিডিটি বাড়িয়ে আলসারের সৃষ্টি করে।
কেবলমাত্র যে এসবই আলসার সৃষ্টি করে এমন নয়। এইসব কারণগুলো আলসার সৃষ্টি করার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয় এবং সেই সাথে এই সব কারণে সৃষ্ট হওয়া আলসার নিরাময় করাও বেশ কঠিন।
আলসারের কত প্রকার ও কী কী?

গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটির কারণে সাধারণত দুই ধরনের আলসার তৈরি হয়৷ যেগুলো হলো—
১) গ্যাস্ট্রিক আলসার—গ্যাস্ট্রিক আলসার পাকস্থলীর ভেতরের দিকে হয়।
২) ডিওডেনাল আলসার— ডিওডেনাল আলসার সাধারণত ক্ষুদ্রান্তের ওপরের অংশের ভেতরের দিকে হয়।
যেসব লক্ষণ দেখলে বুঝবেন আপনার আলসার হয়েছে:
• পেটের ওপর দিকে প্রচণ্ড ব্যথা বা জ্বালাপোড়া ভাব হলে।
* কিছু না খাওয়া শর্তেও পেট ভরা ভরা ভাব হওয়া কিংবা পেয়াত ফাঁপা।
• অতিরিক্ত ঢেঁকুর তোলা।
• কোনো তেল জাতীয় খাবার খেলে তা সহজে হজম না হওয়া!
• বুকের মধ্যে জ্বালাপোড়া করা অথবা চিন চিন ব্যথা অনুভব হওয়া।
• কোনো কারণ ছাড়া বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।
• পায়খানার রঙ দীর্ঘদিন ধরে কালচে হলে।
• বমির সাথে রক্ত বের হলে।
• খাবারে প্রতি অনিহী বা কিছু না খেয়েও ক্ষুধা না লাগলে।
• শ্বাসকষ্ট হলে।
• হঠাৎ করে ওজন কমতে শুরু করলে।

এই ধরনের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
আলসার যেভাবে শনাক্ত করা যায়
আলসার হয়েছে কিনা শনাক্ত করার জন্য ডাক্তাররা শারিরীক পরীক্ষার পাশাপাশি বেশ কিছু ক্লিনিক্যাল ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা করিয়ে থাকেন। যেমন:

• ব্রেথ টেস্ট— ব্রেথ টেস্টের মাধ্যমে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি ব্যাকটেরিয়া আছে কিনা তা পরীক্ষা করা হয়।
• এন্ডোস্কোপি—এই পরীক্ষাটি মোটামুটি একটু কষ্টসাধ্য বটে। এন্ডোস্কোপি পদ্ধতিতে রোগীকে কিছুটা অবচেতন করে নেওয়া হয়। এরপর, একটি ফাঁপা টিউবের মাথায় ক্যামেরা কাগিয়ে সেটা রোগীর মুখ ও গলার মধ্য দিয়ে পুরো পরিপাকতন্ত্র ভালো করে পর্যবেক্ষণ করা হয়৷ যদি আলসার পাওয়া যায়, তখন অবস্থা বা প্রয়োজন অনুসারে চিকিৎসা কিরা হয়। কখনো বায়োপসি করে আলসার থেকে টিস্যু নিয়েও পরবর্তী চিকিৎসা নির্নয় করা হয়।
• বেরিয়াম সোয়ালো (Barium swallow) এক্স রে: বেরিয়াম সোয়ালো এক্স রে করার সময় রোগীকে বেরিয়াম নামক একটি রাসায়নিক পদার্থ পানির সাথে মিশিয়ে খাওয়ানাও হয়। যখন সেই পানি পরিপাকতন্ত্রের ভেতর দিয়ে যায় তখন এক্সরে তে পরিষ্কারভাবে পরিপাকতন্ত্রের অবস্থা দেখা যায় এবং এর মাধ্যমে রোগ নির্নয় করা হয়।

গ্যাস্ট্রিক আলসারের চিকিৎসা পদ্ধতি: আলসারের চিকিৎসা কিরার ক্ষেত্রে ডাক্তাররা আগে এর কারণ নির্নয় করেন, এরপর কারণের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা করে থাকেন। আর আলসারের চিকিৎসা সাধারণত তিনটি ধাপে হয়ে থাকে।
১| যদি হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির কারণে আলসার হয়, তবে রোগীকে এই ব্যাকটেরিয়া নির্মূল করার জন্য কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ডোজ দেওয়া হয়।
২| রোগী যদি অনিয়মিতভাবে ব্যথার ওষুধ বা স্টেরয়েড ওষুধ খাওয়ার ফলে আলসার হয়, তাহলে প্রথমেই এসব ওষুধ সেবন কমিয়ে আনতে হবে অথবা পুরাপুরি বন্ধ করতে হবে। এরপরে, চিকিৎসক কিছু ওষুধ ও পরামর্শ দিয়ে থাকেন, যা মেনে চলতে হবে।
৩| তাছাড়াও বেশ কিছু ওষুধের দ্বারা অতিরিক্ত অ্যাসিড উৎপাদন কমিয়ে নেওয়া হয়, যাতে আলসার এর সমস্যা কমে। যেমন- পাকস্থলীর এসিডের কার্যক্ষমতা কমাতে অ্যান্টাসিড জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা হয় এবং কিছু ওষুধ দ্বারা মিউকাস লেয়ার ও সুরক্ষিত রাখা হয়।

আরো পড়ুন; গরমের ত্বকে ভাল রাখতে যে ৫ জাতের ফল খাবেন

আলসার হলে যেসব জটিলতা হতে পারে:
যদি সঠিক সময়ে সঠিক উপায়ে আলসারের চিকিৎসা না করানো হয়, তবে তা বেশ কিছু জটিলতার সৃষ্টি করে৷ যেমন—
১) আলসার পরিপাকতন্ত্রের মিউকাস লেয়ারের ক্ষয় করে। তো যদি সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নেওয়া হয়, তবে আলসার এর ফলে মিউকাস লেয়ার ক্ষয় হতে হতে পরিপাকতন্ত্র হতে রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে৷ এর ফলে রক্তশূন্যতা থেকে শুরু করে রক্ত বমি বা রক্ত পায়খানা হতে পারে।
২) যদি সঠিক সময়ে আলসারের চিকিৎসা না করানো হয়, তবে অনেক সময় আলসার এর মাত্রা অতিরিক্ত হয়ে পরিপাকতন্ত্রের দেয়াল ছিদ্র করে ফেলে, এতে করে প্রাণহানির ঝুঁকিও তৈরি হয়। যাকে মেডিক্যাল টার্মে বলে পারফোরেশন।
৩) গ্যাস্ট্রিক আলসার হলে তা পরিপাকতন্ত্রের স্বাভাবিক খাদ্য যাত্রায় বাধা তৈরি করে। এর ফলে সমসময় পেট ভরা বা ফাঁপা থাকে, অনেক সময় বমি হয় বা বমি বমি ভাব হয়। এছাড়াও হুট করে ওজন কমে যায়।
৪) হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ অনেক সময় গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

তাই, আলসার হবার পূর্ব লক্ষণ গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটি হলেই দ্রুত নিজের লাইফস্টাইল ও খাদ্যভ্যাস পরিবর্তন করুন। আর যদি অ্যাসিডিটির সমস্যা বেশি অনুভব হয় তবে প্রথম থেকেই ডাক্তারের পরামর্শ নিন। আলসার হওয়ার আগেই নিজে সর্তক হোন এবং নিজের পরিবারকে সচেতন করুন। আর আজকের এই আর্টিকেলটি ভালো লাগলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন এবং এই ধরণের আরও আর্টিকেল পেতে অনুলিপির সাথেই থাকুন।

Back to top button

Opps, You are using ads blocker!

প্রিয় পাঠক, আপনি অ্যাড ব্লকার ব্যবহার করছেন, যার ফলে আমরা রেভেনিউ হারাচ্ছি, দয়া করে অ্যাড ব্লকারটি বন্ধ করুন।