ধর্ম

বাচ্ছাদের পুতুল খেলা ইসলামে যায়েয কি?

আমরা অনেকেই জানি না বাচ্ছাদের পুতুল খেলা ইসলামে যায়েয কি? একজন মুসলিম হয়ে এটা আমাদের জানা দরকার তো চলুন জেনে নেই ...

অনুলিপি ডেস্কঃ বাচ্চাদের পুতুল খেলা নিয়ে আমরা অনেকে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে আছি। হারাম কি হারাম না, জায়েজ কি জায়েজ না! চলুন আজকে এই বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিব। আর্টিকেল টি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ুন। মার্কেটে পুতুল বিভিন্ন ধরনের রয়েছে। যা অভিনব মানুষের মতোই দেখতে দেখা যায়। এ সকল পুতুল ইসলামে হারাম। কেননা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বহু হাদিসে জীবন্ত কোনো কিছুর ছবি বানানো নিষেধ করা হয়েছে। ইমাম বুখারী (রহ.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যারা জীবন্ত কোনো কিছুর ছবি তৈরি করে, কেয়ামতের দিন তাদের জন্য রয়েছে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি। (বুখারি) সুতরাং খেলনা পুতুলে যদি মানুষের পরিপূর্ণ আকৃতি দেওয়া হয়, যেমন- মাথার সঙ্গে যদি চোখ, কান, মুখ ইত্যাদি থাকে, তবে এ ধরনের পুতুল সংরক্ষণ করা, এগুলো উপহার দেওয়া অথবা ছোট বাচ্চাদের জন্য এগুলো নিয়ে খেলা করা নাজায়েজ। আর যদি পুতুলের পরিপূর্ণ মাথা না থাকে; অর্থাৎ পুতুলের যদি চোখ, কান, নাক কিংবা মুখ দেওয়া না হয়, তবে ছোট বাচ্চাদের জন্য এ ধরনের পুতুল তৈরি করা এবং তাদেরকে খেলতে দেওয়া জায়েজ আছে। কাপড়ের পুতুলের চোখ-মুখ না থাকলে তথা প্রাণির অবস্থান পরিস্ফুটিত না হলে পুতুল ব্যবহার করার সুযোগ আছে। হজরত আয়শা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা কাপড়ের পুতুল দিয়ে খেলেছিলেন।

এসবের চোখ-কান তথা মুখের অবয়ব ছিল না। পক্ষান্তরে যে সকল বস্তুর প্রাণ আছে, এমন প্রাণীর চোখ,কান, মুখ থাকা অবস্থায় উক্ত প্রাণীর ছবি আঁকা, তা ব্যবহার করা, তা ঘরে রাখা এবং তা দিয়ে খেলাধুলা করা কোনটিই জায়েজ নয়। তাই বাচ্চাদের জন্য কোনো প্রাণীর পুরোপুরি অবয়ব আছে এমন প্রাণীর পুতুল দিয়ে খেলা জায়েজ হবে না। হজরত আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘ফেরেশতা ঐ ঘরে প্রবেশ করে না, যে ঘরে কুকুর থাকে এবং ঐ ঘরেও না, যে ঘরে ছবি থাকে।’ (বুখারি ৫৯৪৯) যদি পুতুলের পরিপূর্ণ মাথা না থাকে; অর্থাৎ পুতুলের যদি চোখ, কান, নাক কিংবা মুখ দেওয়া না হয়, তবে ছোট বাচ্চাদের জন্য এ ধরনের পুতুল তৈরি করা এবং তাদেরকে খেলতে দেওয়া জায়েজ আছে। গহরদ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস এবং আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুমসহ আরও অনেক সাহাবি থেকে বর্ণিত, যে ছবির মাথা নেই সেটি পূর্ণাঙ্গ ছবি নয়; তাই তা জায়েজ আছে।

অবয়বসহ ছবির ব্যবহার সম্পর্কে একাধিক হাদিসে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাহলো-
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ كَانَ لَنَا سِتْرٌ فِيهِ تِمْثَالُ طَائِرٍ وَكَانَ الدَّاخِلُ إِذَا دَخَلَ اسْتَقْبَلَهُ فَقَالَ لِى رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- حَوِّلِى هَذَا فَإِنِّى كُلَّمَا دَخَلْتُ فَرَأَيْتُهُ ذَكَرْتُ الدُّنْيَا
হযরত আয়শা রাঃ বর্ণনা করেন। আমাদের একটা পর্দা ছিল। এতে পাখির ছবি ছিল। যখন কেউ ভিতরে আসত তখন এ ছবি তার সামনে পড়ত। রাসূল সাঃ আমাকে বললেনঃ এটি উল্টিয়ে দাও, কেননা, যখনই আমি ভিতরে আসি, আর এটা দেখি, দুনিয়ার কথা মনে পড়ে। {সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৫৬৪৩}
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- مِنْ سَفَرٍ وَقَدْ سَتَّرْتُ عَلَى بَابِى دُرْنُوكًا فِيهِ الْخَيْلُ ذَوَاتُ
الأَجْنِحَةِ فَأَمَرَنِ
فَنَزَعْتُهُ

হযরত আয়শা রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাঃ সফর থেকে ফিরে আসলেন। আমি আমার দরজায় ডানাযুক্ত ঘোড়ার ছবি সম্বলিত একটি রেশমি পর্দা টানিয়ে রেখেছিলাম। রাসূল সাঃ আমাকে নির্দেশ দিলেন, এবং আমি তা সরিয়ে ফেললাম। {সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৫৬৪৫}
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ دَخَلَ عَلَىَّ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- وَأَنَا مُتَسَتِّرَةٌ بِقِرَامٍ فِيهِ صُورَةٌ فَتَلَوَّنَ وَجْهُهُ ثُمَّ تَنَاوَلَ السِّتْرَ فَهَتَكَهُ ثُمَّ قَالَ إِنَّ مِنْ أَشَدِّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الَّذِينَ يُشَبِّهُونَ بِخَلْقِ اللَّهِ
হযরত আয়শা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ একদিন আমার কাছে আসলেন। আমি তখন ছবিযুক্ত একটি পর্দা টানাতে ব্যস্ত ছিলাম। তা দেখে তাঁর চেহারার রঙ পরিবর্তন হয়ে গেল। অতঃপর পর্দাটা নিয়ে ছিঁড়ে ফেললেন এবং বললেনঃ কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি তাদের হবে যারা আল্লাহর সৃষ্টির সাদৃশ্য তৈরী করে। {সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৫৬৪৭}

আরো পড়ুন: ঠোঁটের কালচে ভাব দূর করার একদম সহজ উপায় তাও আবার ঘরে বসেই

আরেক হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে এসে বলল, আমি চিত্রকর। এবং চিত্র অংকন করি। এতএব এ সম্পর্কে আমাকে শরীয়তের বিধান বলে দিন। ইবনে আব্বাস রা. বলেন, আমার কাছে আস। সে ব্যক্তি তাঁর কাছে গেল। তিনি পুনরায় বললেন, আমার কাছে আস। সে ব্যক্তি তার এত কাছে গেল যে, ইবনে আব্বাস রা. তাঁর হাত ঐ ব্যক্তির মাথার উপর রাখলেন, এবং বললেন, আমি তোমাকে এ সম্পর্কে এমন একটি হাদিস শুনাচ্ছি, যা আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে শুনেছি। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, ‘সকল চিত্রকরই দোজখে যাবে। আর প্রত্যেক চিত্রের পরিবর্তে জীবিত এক ব্যক্তিকে বানানো হবে, যা দোজখে তাকে শাস্তি দেবে’। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যদি তোমাকে এরূপ করতেই হয়, তাহলে গাছ-পালা বা এমন বস্তুর ছবি তৈরি কর যা প্রাণী নয়।

(মুসলিম ৫৬৬২) মুহাদ্দিসরা বলেন, আয়েশা (রা.) যেই পুতুল দিয়ে খেলতেন, তার নির্দিষ্ট কোনো অঙ্গ ছিলো না যে যার দ্বারা স্পষ্ট করে বোঝা যেতো যে, এটা একটা মানবাকৃতি; বরং তিনি যে পুতুল দিয়ে খেলতেন তা ছিলো সাধারণ কাপড় এবং তুলো দ্বারা তৈরি। যেমনটি গ্রাম অঞ্চলের ছোট ছোট মেয়েরা তৈরি করে। প্রথমত, আয়েশা (রা.) যে ধরনের পুতুল দিয়ে খেলতেন, তা বর্তমানে তৈরি করা পুতুলের মতো ছিলো না। তার পুতুলগুলো ছিলো ছেঁড়া কাপড়ের তৈরি, যেগুলোতে বিশেষ কোনো আকৃতি ছিল না। দ্বিতীয়ত, কোনো কোনো মুহাদ্দিস বলেন, ছবি তৈরির ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আসার আগে আয়েশা (রা.) পুতুল দিয়ে খেলতেন। আর তাই ছবি তৈরির ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের হাদিস আসার কারণে পুতুল দিয়ে খেলা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। আবু দাউদ এবং অন্যান্য হাদিসের কিতাবে উল্লেখিত ‘আয়েশা (রা.) পুতুল দিয়ে খেলতেন’ মর্মে যে বর্ণনাটি পাওয়া যায়, তা বর্তমান সময়কার তৈরি করা পুতুল দিয়ে খেলার পক্ষে অনুমতি নির্দেশ করে না। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস এবং আবু হুরায়রাসহ আরো অনেক সাহাবী (রা.) থেকে বর্ণিত, যে ছবির মাথা নেই সেটি পূর্ণাঙ্গ ছবি নয়; তাই তা জায়েজ আছে।সুতরাং ‘আয়েশা রা. পুতুল দিয়ে খেলতেন’ এই বর্ণনাটি পুতুল দিয়ে খেলার পক্ষে অনুমতির দলিল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

Back to top button

Opps, You are using ads blocker!

প্রিয় পাঠক, আপনি অ্যাড ব্লকার ব্যবহার করছেন, যার ফলে আমরা রেভেনিউ হারাচ্ছি, দয়া করে অ্যাড ব্লকারটি বন্ধ করুন।