আবুল মনসুর আহমেদ, জীবনী ও সাহিত্য ভাবনা

উপমহাদেশে আবুল মনসুর আহমেদ ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী তথা প্রবাদ পুরুষ। একটি বিশেষ পরিচয়ে তাকে পরিচয় করানো যায় না।

তিনি ছিলেন একাধারে রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, আইনজ্ঞ এবং বাংলা সাহিত্যের একজন সফল বিদ্রুপাত্মক রচয়িতা। তবে ব্যক্তিজীবনে তাকে বেশি প্রভাবিত করেছিল রাজনীতি। তাঁকে পুরোপুরি উপলব্ধি করা হয়ত কঠিন তবে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর রাষ্ট্রীয় ভাবনা তথা রাজনীতি আমাকে বেশ আকৃষ্ট করে।

আবুল মনসুর আহমেদ এর ধর্মনিরপেক্ষতা

তিনি ছিলেন একজন ধর্মনিরপেক্ষ ও শতভাগ গণতন্ত্র চর্চা করা মানুষ। বেশ অল্প বয়সেই তিনি রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। মাত্র নয় বছর বয়সে তিনি প্রজা আন্দোলনে যোগ দেন। সে হিসেবে বলা যায়, নিপীড়ন কিংবা শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মন তাঁর ছেলেবেলা থেকেই ছিল।

নিজ গন্ডির মানুষ হোক কিংবা সমাজের ধন্যাঢ্য শ্রেনীর, অধিকার আদায়ের দাবিতে তিনি বরাবরই এগিয়ে এসেছেন। নিপীড়নকে তিনি কখনো জাত, পাত, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র দিয়ে বিচার করেন নি। নিপীড়িতকে তিনি দেখেছেন নিপীড়িতের চোখেই।

রাজনৈতিক জীবন

আবুল মনসুর আহমেদ এর রাজনৈতিক গুরু ছিলেন বাংলার সর্বজন শ্রদ্ধেয় দুই নেতা শেরে বাংলা এ.কে.ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে তিনি বহু নেতাকেই অনুসরণ করতেন এবং তাঁদের দ্বারা প্রভাবিত হন।

১৮৯৮ সালে ময়মনসিংহের ধানীখোলায় এক রক্ষনশীল মুসলিম কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ
করেন তিনি৷ প্রাথমিক শিক্ষা নেন স্থানীয় মক্তবের মাওলানার কাছ থেকে। তাঁর কাছ থেকেই তিনি পান উদারতার শিক্ষা, পরবর্তীতে যা ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে তাকে আদর্শ মানুষ হতে সহায়তা করে।

এই মতাদর্শের জায়গা থেকেই তিনি পরবর্তীতে হিন্দু ও মুসলিম মেলবন্ধনে কাজ করেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বৃদ্ধি করে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার মানুষকে এক করার লক্ষ্যেও তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ছিল। তিনি জমিদারি প্রথা উচ্ছেদেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

জমিদারদের মুসলিমবিরোধী মনোভাবের প্রতিবাদ করেন তিনি। বাল্য বয়সেই তিনি জমিদার নায়েবের প্রজাদের প্রতি তুচ্ছ মনোভাবের সরাসরি প্রতিবাদ করেন। তরুণ বয়সেও তিনি নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন খেলাফত আন্দোলনে যোগদানের মাধ্যমে।

আরো পড়ুন: যে কুয়াশা সকাল এনেছিল | আবুল হাসনাত বাঁধন

যেখানেই অন্যায়,অসংগতি , শোষণ আর নিপীড়নের চিত্র ফুটে উঠত সেখানেই তিনি প্রতিবাদী চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ইংরেজদের শোষণের যাতাকল থেকে নিরীহ বাংলার মানুষকে উদ্ধারেও তিনি সদা সোচ্চার থাকতেন।ইংরেজদের গোলামখানায় পরীক্ষা দেবেন না বলে তিনি ছাত্রাবস্থায় প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

১৯৪৭ এর দেশভাগের অন্ততপক্ষে দুই যুগ আগে যখন রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি হয় তখন থেকেই নানান পন্থায় তিনি রাজনীতি নিয়ে ভাবতে থাকেন, ধীরে ধীরে বহুমুখী দিকে অগ্রসর হন। তবে যখন পুরো ভারতবর্ষ ধীরে ধীরে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তির চূড়ান্ত ধাপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল তাঁর সাথে আবুল মনসুর আহমেদের মধ্যেও রাষ্ট্রচিন্তা স্পষ্ট হয়ে ধরা দিচ্ছিল।

এ প্রসঙ্গে ১৯৪৪ সালের ৫ মে পূর্ব পাকিস্তান রেনেসা সম্মেলনীতে মূল সভাপতির অভিভাষণে জন্ম নিতে যাওয়া নতুন রাষ্ট্র নিয়ে তিনি তাঁর ভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটান। অনেকেই এটাকে ‘ত্রিজাতিতত্ত্ব” বলে অভিহিত করেন। তাঁর প্রতিবাদী মন আর মনন যেন কোনো বাঁধাই মানে না, তাইতো একের পর এক বিভিন্ন আন্দোলনে অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তিনি তিনি যুক্ত হয়ে পড়েন।

বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয়তা

তিনি বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন , পাকিস্তান আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলনসহ একুশ দফায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ পথকে সুগম করতে আবুল মনসুর আহমেদ এর বেশ অবদান রয়েছে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় ২১ দফা প্রণয়ন, ছয় দফার ব্যাখ্যা সংবলিত বই,লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে দুটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের প্রতি তার আকুন্ঠ সমর্থন ইত্যাদি প্রতিটি বিষয়ই তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রমাণ করে।

১৯৫৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয়দিন তিনি প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।তখন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছিল আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে। যা আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা নামে পরিচিত ছিল।

পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, পশ্চিম পাকিস্তানে কাঁচামালের চেয়ে বেশি বেশি শিল্প গড়ে উঠেছে।

অথচ পূর্ব পাকিস্তানের কাঁচামাল পড়ে থাকলেও কোন ধরনের শিল্প গড়ে উঠে না। পূর্ব পাকিস্তানের কাচামাল গুলো নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্প গড়ে তোলা হচ্ছিল।

২১ দফার ১৭ দফায় আবুল মনসুর কর্তৃক তাছাড়া ২১ দফা প্রথমে ৪২ দফা ছিল। সেখান থেকে পরিমার্জন করে ২৮ দফা এবং সবশেষে ২১ দফাতে এসে স্থির হয়। যা ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনী ইশতেহার হিসেবে ঘোষণা করে। ২১ দফার সাথে আবুল মনসুর আহমেদ ও রাষ্ট্রভাষা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আরো পড়ুন: কবির ছন্দে কবিতায় কবিতা

নির্যাতিত ও অসহায় মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে তিনি সবসময় কাজ করে গেছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা নীতিবিরোধী কোন কাজই কখনো তাকে করতে দেখা যায়নি। বরং আজীবন এসবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। ঘুষ, দূর্নীতি কিংবা ভোট চুরি এসবকে কখনো প্রশ্রয় দেননি। বরং সর্বদা থেকেছেন সৎ ও নিরপেক্ষ।

সবসময় জাতির প্রতি কর্তব্য ও দায়বদ্ধতা অনুভব করেছেন বলেই মানুষের তরেই কাজ করে গেছেন।রাজনীতিকে তিনি কখনো পেশা হিসেবে নেন নি,তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য।তাই তাকে বলা যায় প্রকৃত সমাজ সংস্কারক।

আবুল মনসুর আহমেদের সাহিত্য ভাবনা

তাঁর সাহিত্য কিংবা সাংবাদিকতার যে স্বতন্ত্র আবির্ভাব দেখা যায় তাতেও সফলভাবেই রাজনীতির ছাপ দেখা যায়। এমনকি তাঁর বিখ্যাত ফুড কনফারেন্স বইটির জনসেবা ইউনিভার্সিটি প্রবন্ধে তিনি রাজনীতিবিদদের রাজনীতির আড়ালে স্বার্থ হাসিলের গল্পই তুলে ধরেন।

রাজনীতি জীবনে তিনি যেমন সফল ছিলেন সাহিত্য জীবনেও তাই। সমাজের ঘটে যাওয়া চিত্র তাঁর ব্যঙ্গাত্মক লেখনীর মাধ্যমে প্রকাশ করে তিনি সাধারণ জনগণের মনে ভাবনার উদ্রেক সৃষ্টি করিয়েছিলেন।তিনি মূলত সমাজজীবনে যা কিছু দেখতেন, যাই পর্যবেক্ষন করতেন তাই তুলে ধরতেন।

সমাজের আড়ালে রয়ে যাওয়া কিংবা খারাপ রূপটাই তিনি তুলে ধরতেন। সমাজের এই অনিয়ম দেখে যখন তিনি ব্যথিত ঠিক সেই সময়ে ব্যাথাতুর মনে তিনি সাহিত্যে প্রবেশ করেন। তাই তাঁর লেখার প্রতি ভাঁজে ছিল ক্ষোভ, দু:খ আর আক্রোশ। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন এটাই এমন এক মাধ্যম যার মাধ্যমে সমাজের কুৎসিত দিক তুলে ধরা সম্ভব।

কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও অন্ধকারে নিমজ্জিত সমাজের মানুষকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে তিনি কলম হাতে তুলে নেন এবং তার প্রতি ন্যায় করেন।

আরো পড়ুন: চর আলেকজান্ডার ভ্রমণ!

দেশের যেকোন সংকটে আবুল মনসুর আহমেদ এগিয়ে এসেছেন সশরীরে কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক মতামত দেওয়ার জন্য। জনগণ ও দেশের সেবায় তাঁর পুরো জীবনই নিবেদন করেন তিনি। তাঁর এ মহান আত্নত্যাগের কথা আমরা স্মরণ রাখব।

জান্নাতুল ফেরদৌস, শিক্ষার্থী                হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button

Adblock Detected

Dear Viewer, Please Turn Off Your Ad Blocker To Continue Visiting Our Site & Enjoy Our Contents.