শিল্প ও সাহিত্য

সৌদামিনী মালো ও আত্মচরিত বই রিভিউ

সৌদামিনী মালো বই রিভিউ

“সৌদামিনী মালো” শওকত ওসমানের “নির্বাচিত গল্প” (১৯৮৪) থেকে সংকলিত হয়েছে।

প্রাত্যহিক জীবনে অর্থ-সম্পদের প্রতি  লোভ-লালসা কিভাবে মানুষকে অন্যায়, দুষ্কর্ম আর অমানবিকতার পথে ধাবিত করে, হীন উদ্দেশ্য আর স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মকে ব্যবহার করতেও পিছপা হয় না তারই এক সুস্পষ্ট রূপ তুলে ধরা হয়েছে “সৌদামিনী মালো” গল্পে।

সাধারণ মানুষের ধর্মবোধ আর অনুভূতিকে পুঁজি করে মানবতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করার অন্যতম রূপচিত্রই এই গল্পের মূল কাহিনি।

গল্পের মূল চরিত্র সৌদামিনী ছিলেন বর্ণভিত্তিক হিন্দু সমাজের একজন নিঃসন্তান বিধবা। তার স্বামী জগদীশ মালো ছিলেন পেশায় একজন আরদালি। স্বভাবে বেজায় তুখোড় লোক ছিলেন  বলেই ছলে-বলে, কৌশলে প্রভুর মন জুগিয়ে চলতে পারতেন।

যেকোনো অফিসারকে খুশি করার পন্থা তার জানা ছিল। তাইতো মোটা বখশিসে তার পকেট সবসময় ভারী থাকত। পনেরো-বিশ বছরের চাকরি জীবনে তাই উপরি ইনকাম দিয়ে তার ভালোই জমি-জমা হয়েছিল।

একটু অভাব-অনটনমুক্ত দিন যাপনের আশায়ই এতকিছু করলেও তার দুঃখ ছিল একটাই, সন্তান ছিল না। সন্তানের আশায় দ্বিতীয় বিয়ে করার মনস্থির করার একসময়ে হঠাৎই তিনি মারা যান।

পরবর্তীতে উত্তরাধিকারসূত্রে স্বামীর মৃত্যুর পর সকল  ধানি জমি, বসতবাড়ি, পুকুর, ফলের বাগানসহ কয়েক একর সম্পত্তির মালিক হন তার স্ত্রী সৌদামিনী মালো।

আর এই সম্পত্তির উপরই কুনজর পড়ে তার জ্ঞাতি দেবর মনোরঞ্জনের। নানান কৌশলে যার একমাত্র লক্ষ্যই থাকে এই সম্পত্তি নিজের হস্তগত করা। কিন্তু সৌদামিনীর সাহস আর লোকপ্রীতির কারণে তিনি বারবারই ব্যর্থ হয়।

নিঃসন্তান সৌদামিনীর মাতৃহৃদয়ের বাসনা একসময় প্রবলভাবে ধরা দিতে থাকে, মনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা পরিতৃপ্ত করতে তাই তিনি দূরদেশ থেকে একটি শিশুকে এনে সন্তানের মতো লালন -পালন করতে থাকেন। বহুদিন পরে সন্তান পেয়ে যেন মরুভূমিতে পানি পেয়ে  খরা কাটিয়ে উঠার মতো উপক্রম হলো। কিন্তু তা সহ্য হয়নি মনোরঞ্জনের।

নমশূদ্রর ঘরে ব্রাহ্মণ সন্তান পালিত হচ্ছে এই মিথ্যা বক্তব্য প্রচার করে বর্ণবিভক্ত হিন্দু সমাজে সৌদামিনীকে তিনি সমাজচ্যুত করার উদ্যোগ নেয়। ঠুনকো ধর্মানুভূতির ধোয়া তুলে, বর্ণবাদকে পুঁজি করে; শুধুমাত্র নিজ উদ্দেশ্যে সফল হবার জন্য তিনি মায়ের কাছ থেকে সন্তানকে আলাদা করার মতো পাপ করতেও দ্বিধা করেন না।

ভয়ানক শাস্ত্রবিরুদ্ধ পাপ করছে সৌদামিনী, একথা গোপন রইল না সমাজপতিদের কাছে।ব্রাহ্মণের জাত মেরেছে এক শূদ্রাণী। রাম, রাম।মনোরঞ্জন এক ঢিলে পাখিকে কাত করে ছাড়ল।ব্যক্তিগত শত্রুতা এবার রূপ নিলো সমাজগত।

গ্রামের সকলে তার বিরুদ্ধে আঙুল তুলল,ছি ছি করতে লাগল। পরিস্থিতি খারাপ হলে সৌদামিনীকে গ্রাম্য সমাজের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। সমাজপতিদের চাপে পড়ে শেষ পর্যন্ত সৌদামিনীর পালিত পুত্র, হরিদাশ যে মুসলমানের ঔরসজাত; এ সত্য সকলের সামনে প্রকাশ করতে এবং নিজ ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণে বাধ্য হয়।

কিন্তু সৌদামিনীর করুণ পরিণতি হয় তখনই যখন ছেলে হরিদাশ তার মুসলমান হবার সত্য জানতে পেরে পালিয়ে যায়।

ধর্মান্ধতার যূপকাষ্ঠে সৌদামিনীর মাতৃহৃদয় বলি হয়ে যায়, হাহাকার কর‍তে থাকে। যার প্রবল প্রভাবে তার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে। মানবতা আর মাতৃত্বের কাছে সমস্ত কিছু ফিকে হয়ে যায়। ধর্ম আর অর্থের পরাভব ঘটে।

তাইতো লেখক গল্পের শেষে লিখেছেন,

“আমাকে ছেড়ে পালিয়ে গেলে—হে যিশু, ও হরি, হে আল্লা, আমার যবন হরিদাশকে ফিরিয়ে দে—-ফিরিয়ে দে—-ফিরিয়ে দে—-

আত্মচরিত বই রিভিউ 

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আত্মজীবনীমূলক বর্ণনাধর্মী অসমাপ্ত এক রচনার নাম “আত্মচরিত”, যেখানে তিনি তাঁর শৈশব জীবন তুলে ধরেছেন।

তিনি ছিলেন দূরন্ত ও ডানপিটে স্বভাবের। রচনায় তিনি তাঁর পিতামহ, পিতা এবং জননীর উল্লেখ করেন, বর্ণনা করেন তাঁর পুরো শৈশব জীবনের স্মৃতি।

তাঁর পিতামহ রামজয় তর্কভূষণের মৃত্যুর পর, পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়; মাতা ভগবতী দেবীর অনুমতি নিয়ে অর্থ উপার্জনের  জন্য সেসময় কোলকাতা পাড়ি জমান। তখন বালক ঈশ্বরচন্দ্রও পিতার হাত ধরে কোলকাতা শহরে আসেন।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের  পিতা ঠাকুরদাস প্রথমত বনমালিপুরে, এরপর বীরসিংহে সংক্ষিপ্তাকারে  ব্যাকরণ পড়েছিলেন সত্যি; তবে তিনি কোলকাতায় তার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সংস্কৃতপাঠে নিযুক্ত হতে পারেন নি।

কেন না, সংস্কৃতপাঠে  নিযুক্ত হলে তার অর্থ উপার্জন সম্ভব হতো না। তবে অনেক বিবেচনার পরে নির্ধারিত হয় যে, শীঘ্র উপার্জনক্ষম  হতে চাইলে যতটুকু পড়াশোনা দরকার ততটুকু পড়াশোনা তিনি করবেন।

কেন না, তৎকালীন সময়ে ইংরেজি জানলে সওদাগর সাহেববাবুদের বাড়িতে অনায়াসে কাজ পাওয়া যেত। তাইতো পিতা ঠাকুরদাস সেসময় সংস্কৃতপাঠ বাদ দিয়ে ইংরেজি পড়াকেই জরুরী মনে করেছিলেন।

তবে তখনকার সময়ে ইংরেজি পড়া তেমন সহজ ছিল না। ইংরেজি বিদ্যালয় ছিল সেসময় আলাদা।

কোলকাতায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পিতা ঠাকুরদাস  এক ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রিত ছিলেন।যার বাড়িতেই দুই বেলার আহার আর ইংরেজি পড়া চলতে থাকে।

তবে ভাগ্যের ফেরে আশ্রয়দাতার আর্থিক টানাপোড়েন শুরু হলে উভয়পক্ষেরই জীবনযাপন করা কষ্টকর হয়ে উঠছিল।

প্রায়ই ক্ষুধার জ্বালা ভুলে থাকার জন্য পিতা ঠাকুরদাস পথে পথে ভ্রমণ করতেন। একদিন এক মধ্যবয়স্কা নারী তিনি ক্ষুধার্ত বুঝতে পেরে পেটপুরে খাবার খাইয়েছিলেন। ক্ষুধার্ত সময়ে সেই নারী এত সাহায্য করেছিল, যার কথা পিতার মুখ থেকে শুনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের  সেই নারীর প্রতি বেশ ভক্তি জন্মেছিল।

পিতা ঠাকুরদাসের ভাগ্যের চাকা কিছুটা পরিবর্তন হতে শুরু হয়েছিল। আশ্রয়দাতার সাহায্য নিয়ে তিনি মাসিক দুই টাকা বেতনের চাকরি পেয়েছিলেন। এমন দুঃসময়ে কাজ পেয়েছিলেন বলে তার আনন্দের সীমা ছিল না।

নিজে ক্ষুধার কষ্টে থাকলেও বেতনের দুটো টাকাই তিনি  জননী ভগবতী দেবীর কাছে পাঠাতেন।

কোলকাতা যাবার পথে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রাস্তার পাশে “বাটনাবাটা শিলের মতো” প্রস্তর বা  মাইলস্টোন দেখে বালক ঈশ্বরচন্দ্র খুবই কৌতূহলী হয়ে ওঠেন।

পিতার সহায়তায় পাথরের গায়ে খোদাইকৃত ইংরেজি অংকগুলো দ্রুত শিখে নেন। এত ছোট বয়সে ঈশ্বরচন্দ্রের এই অভাবিত মেধাশক্তির পরিচয়ে তাঁর পিতা ও সফরের বাকি সাথীরা বিস্মিত হন।

ঈশ্বরচন্দ্রকে যাতে ইংরেজি স্কুলে ভর্তি করানো হয় তাও বলেন। কারণ, ইংরেজি জানা থাকলে বড় বড় সাহেব বাবুদের দোকানে কিংবা বাড়িতে চাকরি পাওয়া সেসময় সহজ হতো। যদিও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ঠাকুরমশাই এসবে কর্ণপাত করেন নি।

“আত্নচরিত” রচনায় ঈশ্বরচন্দ্র তাঁর ছেলেবেলার স্মৃতি রোমন্থন করেছেন। বিষয় অনুসারে গদ্যের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ তাঁর সহজাত শক্তিমত্তা প্রকাশ করে। কৌতুকবোধ, নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও মমতা এবং পাঠকে বোধগম্য করার প্রয়োজনে ব্যবহৃত যতিচিহ্ন তাঁর রচনার বিশিষ্ট প্রান্ত।

বই রিভিউ লিখেছেন- জান্নাতুল ফেরদৌস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button