স্বাস্থ্য ও লাইফস্টাইল

জরায়ু ক্যান্সারের কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ ও প্রতিকার!

বিশ্বে প্রতি দুই মিনিটে একজন নারী জরায়ু ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন এবং সারা বিশ্বে প্রতি বছর ৫ লাখ ৭০ হাজার নারী জরায়ুমুখ বা জরায়ু ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার নারী এর ফলে মারা যান। এছাড়া প্রতি বছর বাংলাদেশেও প্রায় ৮ হাজার ২৬৮ জন নারী জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং ৪ হাজার ৯৭১ জন মৃত্যুবরণ করেন।

এমনই তথ্য দিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।এছাড়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছেন- জরায়ু ক্যান্সারে আক্রান্তদের মধ্যে যারা মারা যায়, তাদের ৯০ শতাংশই নিম্ন আয়ের দেশের রোগী এবং প্রাথমিক অবস্থায় এই জরায়ুর ক্যান্সারের চিকিৎসা না করানোও একটি কারণ। এই জন্য সামাজিক সচেতনা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর মে মাসের ৮ তারিখে ওয়াল্ড ওভারিয়ান ক্যান্সার ডে পালিত হয়

আমাদের বাংলাদেশেও যেহেতু সচেতনার অভাবে বহু রোগী জরায়ুমুখ বা বিভিন্ন জরায়ু ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, সেই জন্য আজকে আমাদের এই আর্টিকেল। আজকে আমরা জানব- জরায়ু বা জরায়ুমুখ ক্যান্সার কী? এর কারণ কী? এর লক্ষণসমূহ? এবং এর প্রতিরোধ ও প্রতিকার!

জরায়ুর কলা থেকে উদ্ভূত হওয়া যে কোনো ক্যান্সারকেই জরায়ু ক্যান্সার বলা হয়। বিভিন্ন ধরনের জরায়ু ক্যান্সার রয়েছে। তবে বিশ্বব্যাপী ও বাংলাদেশে অধিকাংশ নারীই জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। এই জরায়ুমুখ ক্যান্সার হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের আক্রমণে হয়ে থাকে।

সাধারণত হিউম্যান প্যাপিলোম ভাইরাসের (এইচপিডি) ১০০টিরও অধিক প্রজাতি রয়েছে। তবে, এর মধ্য দুই প্রজাতিই এই জরায়ুমুখ ক্যান্সার ঘটায়। তবে, এই ভাইরাস শরীরে ঢুকলেই ক্যান্সার হয় না। এই ভাইরাস শরীরের প্রবেশের পর প্রায় ১৫-২০ বছর সময় লাগে জরায়ুমুখ ক্যান্সার হতে।

এই ভাইরাস নারীদের শরীরে ছড়ায় হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস আছে এমন কোনো ব্যক্তির সাথে যৌন মিলন করলে। যৌনমিলনের সময় নারীদের শরীরে এই ভাইরাস পুরুষদের কাছ থেকে প্রবেশ করে। প্রবেশের পর নারীদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য তৎক্ষনাৎ এই ভাইরাস রোগ ছড়াতে পারে না।

রোগ ছড়ায় যখন নারীদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় তখন। কিন্তু, অন্যান্য জরায়ু ক্যান্সারের সঠিক কোনো কারণ জানা যায়নি এখনো। ধারণা করা হয় হরমোনাল সমস্যা ও দৈনন্দিন জীবনের বেশকিছু অবহেলা জরায়ু ক্যান্সার হওয়ার জন্য দায়ী। এছাড়াও অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি, বয়স বৃদ্ধিও দায়ী। সাধারণত ৩৫-৪৪ বছর বয়সি নারীরা সবচেয়ে বেশি জরায়ুমুখ বা সার্ভিক্যাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। এছাড়াও যারা ঝুঁকিতে থাকে —

*যদি কোনো নারীর ১৬ বছরের পূর্বেই যৌন সঙ্গমের অভিজ্ঞতা হয় কিংবা নারীর পিরিয়ড শুরু হওয়ার এক বছরের মাঝেই যৌন সম্পর্কে থাকেন।
*যৌনসঙ্গীর শরীরে যদি আগে হতেই হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসটি উপস্থিত থাকে।
*এক সঙ্গে একাধিক যৌনসঙ্গীর সাথে যৌন সম্পর্ক গড়লে এবং কনডম ব্যবহার না করলে।
*জন্মনিয়ন্ত্রণ রাখতে যদি দীর্ঘদিন ধরে খাবারের বড়ি সেবন করে থাকে।
*ধূমপান কিংবা মদ্যপানে আসক্ত থাকলে।
*যেসব নারীদের শরীরের বিভিন্ন রোগ থাকে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার যথেষ্ট ঘাটতি থাকে।
*যৌন সঙ্গমে ছড়ানো রোগগুলো থাকলে। যেমন—এইডস, গনেরিয়া, সিফিলিস, ইত্যাদি।

জরায়ু বা জরায়ুমুখ ক্যান্সারের লক্ষণ:
জরায়ুর ক্যান্সারকে বলা হয় নীরব ঘাতক। কারণ এর প্রাথমিক লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা দিলেও তা নারীরা বুঝতে পারেন না। আর, বুঝতে পারলেও মেয়েলী সমস্যা মনে করে গুরুত্ব দেন না।
*অনেক সময় প্রচণ্ড পেটে ব্যথা হওয়া এবং পেট ফুলে থাকা।
*অনেক নারীই যৌন মিলনের সময় ব্যথা পায়, তবে সেই ব্যথা যদি প্রচণ্ড হয়।
*হুট করে ওজন বেড়ে বা কমে যাওয়া।
* ঘন ঘন প্রসাব হওয়া কিংবা যৌনাঙ্গের চারদিকে চাপ অনুভব হওয়া।
*দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের সমস্যা, বদহজম ও কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়া।
*হালকা খাবার খেলেই পেট ভর্তি ভর্তি লাগা কিংবা পেটে অস্বস্তিকর অনুভব হওয়া, ইত্যাদি। এছাড়াও পেটের কোনো সমস্যা যদি অতিরিক্ত হয়, সেটা জরায়ু ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।
*কোনো কারণ ছাড়াই অতিরিক্ত বমি হওয়া অথবা বমি বমি ভাব হওয়া।
*হুট করে ক্ষুধা কমে যাওয়া এবং অতিরিক্ত ক্লান্ত লাগা।
*নারীদের পিরিয়ড শেষ হবার পর ও ব্লিডিং হওয়া।
*ক্যান্সার অনেকটা ছড়িয়ে গেলে কিডনি ফেইলিউর ঘটতে পারে।
*হাঁড়ে ব্যথা হওয়া, ইত্যাদি।

জরায়ু বা জরামুখ ক্যান্সারের প্রতিরোধ এবং প্রতিকার:
জরায়ুমুখ ক্যান্সারের লক্ষণগুলো প্রকাশ পেলেও অনেকে গুরুত্ব দেন না। মনে করেন এগুলো মাসিকের মেয়েলি সমস্যা। তখন অবহেলার কারণে দীর্ঘদিন ধরে ছড়াতে শুরু করে। আর জরায়ুমুখ ক্যান্সার শেষ পর্যায়ে যাওয়ার আগ অবধি কোনো প্রকার যৌনাঙ্গে ব্যথা দেখা দেয় না। যার দরুণ নারীরা আরও বেশি অবহেলা করেন। তবে অনেক সময় যৌনাঙ্গ থেকে দূর্গন্ধযুক্ত সাদা স্রাব বা যৌন মিলনের পর রক্তপাত হলেও নারীরা সামাজিক লজ্জায় তা প্রকাশ করেন না।

যদি প্রাথমিক অবস্থাতেই এই রোগের চিকিৎসা নেওয়া হয়, তবে এটি কখনোই ক্যান্সারের রূপ নেয় না। তাই সর্বপ্রথম এই রোগের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এরপরে, নারীদের প্রতি মাসেই শারীরিক টেস্ট করাতে হবে। বিশেষ করে ভায়া টেস্ট। আর ভায়া টেস্ট হলো একটি পরীক্ষা, যার মাধ্যমে ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা আছে কিনা তা টেস্ট করা হয়। তাই যৌন সম্পর্কে থাকা নারীরা নিয়মিত ভায়া টেস্ট করাতে পারেন।

এছাড়াও পিরিয়ড সার্কেল চলাকালীন অস্বাস্থ্যকর কাপড় ব্যবহার বন্ধ করে, স্বাস্থ্যকর প্যাড ব্যবহার করতে হবে এবং যৌনাঙ্গ সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। এইজন্য নারীরা চাইলে ইন্টিমেট ওয়াশ ব্যবহার করতে পারেন তবে সরাসরি সাবান বা অতিরিক্ত ক্ষার পদার্থ যৌনাঙ্গে ব্যবহার না করাই ভালো।

যারা খাবার বড়ি খান, তারা এই খাবার বড়ির পরিবর্তে অন্য জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি মেনে চলতে পারেন। বিশেষ করে কনডম। কনডম ব্যবহারে শুধু জন্মনিয়ন্ত্রণ নয়, বিভিন্ন রোগ হতেও মুক্ত থাকা যায়। এছাড়াও বাল্য বিবাহ রোধ করতে হবে। তারপর, প্রতিদিনের খাবার তালিকায় সুষম খাদ্য রাখতে হবে। জরায়ু বা জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আগে থেকেই আচারণগত প্রতিরোধ করলে অনেকাংশেই আক্রান্তের হার কমে৷

আরো পড়ুন: ৫ বছর বয়সে সন্তানের জন্ম! বিশ্বের কনিষ্ঠতম মা লিনা

আর কোনো লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের শরানাপন্ন হন।
ওপরে যেসব বিষয় বলা হয়েছে ওইগুলো মেনে চলার পরেও যদি আক্রান্ত হন তবে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। বাজারে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের টিকা পাওয়া যায় এবং এসব টিকা প্রতিরোধক হিসাবে কাজ করে। বিশেষ করে ‘গার্ডাসিল ও সারভারিক্স’ নামক ভ্যাক্সিন দুটো বেশ কার্যকর এবং ১০ বছর বয়সের পর থেকেই এই ভ্যাক্সিন নেওয়া যায়।

তবে, গর্ভাবস্থায় এই ভ্যাক্সিন নেওয়া যাবে না। আবার, ক্যান্সার হলেও এর কার্যকারিতা থাকে না। যদি ভায়া টেস্টে ক্যান্সারের পূর্ব অবস্থা বোঝা যায়, তখন প্রাথমিক অবস্থায় নিয়মিত স্ক্রীনিং করে জরায়ুমুখে সামান্য সেক দিয়ে অথবা LEEP এর মাধ্যমে সারানো হয়। আর রোগী বয়স্ক হলে সরাসরি সার্জারির মাধ্যমে জরায়ু ফেলে দেওয়া হয়।

কিন্তু পুরোপুরি ক্যান্সার হয়ে গেলে স্টেজিং করা হয়, এক্ষেত্রে রোগীকে অজ্ঞান করে স্টেজিং করা হয় এবং বায়োপসি নেওয়া হয়। স্টেজিংয়ের মাধ্যমে দেখা হয় ক্যান্সার কতটা ছড়িয়েছে এবং স্টেজ ১, ২ ভাগ করে পরবর্তীতে চিকিৎসা প্রদান করা হয়। অনেক সময় স্টেজের ওপর ভিত্তি করে রেডিয়ো থেরাপি অথবা কেমোথেরাপি দেওয়া হয়।

যেভাবে নিরাপদ যৌন মিলন, জরায়ুমুখ টিকা, VIA, PAP SMEAR এর মাধ্যমে জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধ করা যায়; তেমনি খুব দ্রুত রোগ নির্ণয় হলে সফল চিকিৎসার মাধ্যমে অনেকাংশেই এই রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করা যায়। তাই এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে প্যানিক না হয়ে খুব দ্রুত চিকিৎসা করান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন। এছাড়াও বাংলাদেশে ভায়া টেস্ট একদম ফ্রিতে করানো যায়, তাই কোনো চিন্তা না করে নিয়মিত ভায়া টেস্ট করান।

Back to top button

Opps, You are using ads blocker!

প্রিয় পাঠক, আপনি অ্যাড ব্লকার ব্যবহার করছেন, যার ফলে আমরা রেভেনিউ হারাচ্ছি, দয়া করে অ্যাড ব্লকারটি বন্ধ করুন।