ক্রিকেটখেলাধুলা

ভারতীয়রা কেন মুশফিককে সমীহ করেন – একটি মুশফিকনামা!

ক্রিকেট গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা। সব সম্ভবের গোলকধাঁধার খেলাও বলা হয় ক্রিকেটকে। অভিষেক টেস্টে আবুল হোসেন রাজুরও টেস্ট সেঞ্চুরি আছে তেমনি জেসন গিলেস্পি বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন। মোহাম্মদ রফিকের মতো পুরোদস্তুর বাঁহাতি স্পিনার ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে টেস্ট সেঞ্চুরি করে সবাইকে চমকে দিয়েছেন। শুধু বাংলাদেশ বলেই নয়, বরং ক্রিকেট আর অকল্পনীয় ঘটনা প্রবাহ যেন একে অপরের সঙ্গে মিশে আছে। তবুও এই খেলাকে কেন্দ্র করে চলে কথার ফুলঝুরি আর ছোটো করার নোংরা প্রতিযোগিতা। আর সেটা যদি হয় বাংলাদেশ আর ভারতের তবে যেন মিডিয়া থেকে শুরু করে তথাকথিত সুশীল ক্রিকেটার ও নোংরাভাবে উপহাস করতে পিছপা হন না।

অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ শেষের দিকের একটি উদীয়মান দল। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর এই দলটাকে নিয়ে টিপ্পনী কাটতেই পছন্দ হয় ক্রিকেটের মোরলদের। কিন্তু বাংলাদেশ নামেই যেভাবে বুক চিতিয়ে লড়াই করার ইতিহাস আছে, সময়ে সেভাবেই জবাব পেয়েছে সবাই।

বাংলাদেশের বিপক্ষে মাঠে নামবে ভারত কিন্তু তাদের ছোটো করে কোনো বিদ্বেষ ছড়াবে না এটা যেন ভারতের স্বভাব বিরুদ্ধ। আর মুশকফিককে আঙ্গুল তুলে বুঝিয়ে দিতে চাইবে বাংলাদেশ কত ছোটো দল এটা যেন নিয়মের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু যাকে নিয়ে সবসময়ই তারা হাসি ঠাট্টায় মেতে থাকে সেই তিনিই কতেকবার ডুবিয়েছেন তাদের। আর একজন টাইগার হিসেবে তারই রয়েছে গৌরবের জবাব।

মুশফিক এখন পর্যন্ত ভারতের বিপক্ষে খেলা ৪ টেস্টের দুইবার সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন, রান করেছেন ৩৩৭, সর্বোচ্চ ১২৭। আর গড়ও ঈর্ষণীয়, সবার চেয়ে বেশি ৫৬.১৬! এই গড় টেস্টে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের যেকোনো ব্যাটসম্যানের সবচেয়ে সেরা ব্যাটিং গড়ই শুধু নয়, মুশফিকেরও টেস্টে যেকোনো নির্দিষ্ট দলের বিপক্ষে সেরা গড়।

এমনিতে এ ছোটো খাটো গড়নের মিডল অর্ডারের টেস্ট গড় ৩৪.৭৩। ভারত ছাড়া দ্বিতীয় সেরা গড় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৪৫.৯২। আর প্রতিষ্ঠিত শক্তিগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৪২.৬১। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গেও প্রায় ৪০ গড় (৩৯.৫০)। কিন্তু ইংল্যান্ড (২৬.৩৫), দক্ষিণ আফ্রিকা (২৩.৬৪), নিউজিল্যান্ড (৩৫.৪১), পাকিস্তান (২৩.৭৫) আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের (৩১.৩৩) বিপক্ষে আহামরি নয়। তার মানে টেস্টে ভারতের বিপক্ষে মুশফিকই এক নম্বর উইলোবাজ বাংলাদেশের।

টেস্টে নিউজিল্যান্ডের মত দলের বিপক্ষে ডাবল সেঞ্চুরি থাকলেও ভারতের বিপক্ষে এখনও কোনো সেঞ্চুরি সাকিবের। তামিম সবচেয়ে বেশি ১১ টেস্ট সেঞ্চুুরির মালিক হলেও ভারতের বিপক্ষে একটির বেশি শতরান করতে পারেননি। সেখানে মুশফিকুর রহীমের আছে একজোড়া শতক। যেটি প্রমাণ করে মুশফিক কী করে জবাব দেন।

যার প্রথমটি দেশের মাটিতে ২০১০ সালের জানুয়ারিতে। চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ১৪২ মিনিটে ১১৭ বলে ১৭ বাউন্ডারি ও ১ ছক্কায় ১০১ করেছিলেন মুশফিক। আর দ্বিতীয়টি ভারতের মাটিতে, ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে হায়দ্রাবাদে ৩৮১ মিনিটে ২৬২ বলে ১৬ চার ও দুই ছক্কায় করেছিলেন ১২৭ রান।

অর্থাৎ ভারতের বিপক্ষে তার খেলা চার টেস্টের দুইটি সেঞ্চুরি দিয়ে সাজানো, অন্য দুটিতে তিন অংকে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। অবশ্য ঐ দুই টেস্টে একবার আবার ব্যাটিং পাননি। মানে মোট ৭ ইনিংসে দুবার ১০০+ রানের ইনিংস।

ব্যাটিং টেকনিককে মানদণ্ড ধরলে মুশফিক অনন্য। ধৈর্য্য, মনোযোগ আর মনোসংযোগেও অদ্বিতীয়। ইনিংস সাজানোর স্টাইলটা একদম সনাতন হলেও শতভাগ গাণিতিক ও ব্যাকরণ মেনে। শুরুতে উইকেটের গতিপ্রকৃতি বুঝে উঠতে খানিক সময় নেয়ার পাশাপাশি কন্ডিশনের সাথে থিতু হওয়া। ভালো বলকে সমীহ দেখানো আর সময়ের প্রবহাতায় ধীরে ধীরে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে উইকেটের সামনে, দুই পাশে ও পিছনে সব ধরনের শট খেলার পর্যাপ্ত ক্ষমতা আছে তার।

পরিসংখ্যান কিংবা রেকর্ড যাই মানদন্ড ধরা হোক, ভারতের বিপক্ষে এক লড়াকু যোদ্ধা মিস্টার ডিপেন্ডেবল। কথার খই না ফুটিয়ে বরং বারবার ব্যাটিং এর সৌন্দর্যে জবাব দিয়েছেন বারংবার। বারবার ছোট করে দেখানো মানুষটাই তাদের ভয়ের কারণ হয়ে দাড়িয়েছেন বহুবার। একপ্রান্তে আসা যাওয়ার পালক্রম চললেও অন্যপ্রান্ত দাড়িয়ে প্রতিরোধের প্রাচীর ঘেরে তুলোধুনা করার রেকর্ড আছে ছোটো দেখানো মানুষটির। তাসের ঘরের মতো ভঙ্গুর আর উৎসুক শকুনী চাহনি কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বুক চিতিয়ে লড়াই করার নাম মুশফিকুর রহিম।

বাংলাদেশ জাতীয় দলের তিন ফর্মেটের সাবেক অধিনায়ক এবং দেশসেরা ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম দাড়িয়েছেন নতুন এক মাইফলকে। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে একে একে পার করেছেন ১৫ টি সফল বছর। সেই শুরু থেকেই ক্রিকেট পাড়ার সবচে পরিশ্রমী ক্রিকেটার টা ই আজ দেশসেরা খেলোয়াড়। পৃথিবীর সেরা দশজন জনপ্রিয় খেলোয়াড়ের একজন।  ছোটখাটো গড়নের এই সদা হাস্যোজ্জ্বল খেলোয়াড়টি স্ট্যাম্পের পেছনে বকবক করার জন্য পরিচিত হয়ে আছেন ক্রিকেটাঙ্গনে, শুধু কি তাই ? একজন পরিশ্রমী, বিনয়ী আর প্রবল প্রজ্ঞার অধিকারী এই মানুষটি।

মুশফিক

বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে তিনিই প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি তথা সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী হিসেবে কৃতিত্ব অর্জন করেন এবং ঘুচিয়ে দেন আকাঙ্খিত আবদার।২০০৫ সালের ২৬ মে লর্ডসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল যার, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সেই মুশফিকুর রহিমের দেড় দশক পূর্ন হলো আজ।

তিন ফরমেটের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৩৭৪ ম্যাচে ১৪ সেঞ্চুরি ৬৪ হাফ সেঞ্চুরি, ৩৩.৫২ গড়ে করেছেন ১১৮৬৯ রান। ডিসমিসালের সংখ্যা ৩৯৭টি। টেস্টে ৭ সেঞ্চুরির ৩টি তার ডাবল।  দেশের হয়ে প্রথম ডাবলটি এসেছে তার ব্যাট থেকে। টেস্টে সর্বোচ্চ ২১৯ স্কোরও তার। ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিল না বলার মতো। লর্ডসে টেস্ট অভিষেকে ১৯ এবং ৩ রানে মুশফিকুরের থেমে যাওয়ার শংকাই ছিল প্রবল। প্রথম তিন টেস্ট খেলেছেন ২৭ মাস ৭ দিনে। তৃতীয় টেস্টে কলোম্বোতে শ্রীলংকার বিপক্ষে লড়াকু ৮০ রানে পেয়েছেন অক্সিজেন। সেই থেকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের অভিষেক সিরিজেই বাংলাদেশের জয় ৫-০তে।

কিংবদন্তি উইকেট কিপার অল রাউন্ডারদের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ঢুকে পড়েছেন মুশফিক। সামনে অপেক্ষা করছে ২টি মাইলস্টোন। আর তিনটি ডিসমিসাল হলে পূর্ন হবে তার ৪০০ ডিসমিসাল। ১৩১ রান করলে দ্বিতীয় বাংলাদেশী হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পূর্ন হবে ১২ হাজার রান।   ব্যাটিং কিংবা উইকেটকিপিং সবদিক থেকেই মুশফিক নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। তার ব্যাটিং দৃঢ়তা আর সুনিপুণ ব্যাটিং শৈলী তাকে করেছে এদেশের ব্যাটিংয়ের শ্রেষ্ট সম্পদ।

যেখানে বিধ্বংসী সব ডেলিভারিতে ছন্নছাড়া অনেক কৌশলী ব্যাটসম্যান, সেখানে বুক চিতিয়ে লড়াই করা যোদ্ধার নাম মুশফিকুর রহিম। স্রোতের উল্টোদিকে হাল ধরা নাবিক ই মিস্টার ডিপেন্ডেবল। ক্রিকেটের বুকে বাংলা টাইগারদের অবদান খুব বেশিদিন স্থায়ী নয়। তবে যদি অর্জনের খাতার দিকে নজর দেওয়া হয় কেবল তার অবদানই সমহিমায় ভাস্বর। বাংলাদেশকে ছোটো করতে পছন্দ করা মোড়লদের এখন আমরা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে পারি আমাদের একজন মুশফিক আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button