ঐতিহ্যফিচার

১ কেজি জাফরানের দাম ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা কেন?

জাফরান এক প্রকারের মশলা বলা চলে। তবে জাফরানের ব্যবহার অনেক। জাফরান এর মূল্য, কেন এত বেশী? এর পিছনে রহস্য কী? বিস্তারিত প্রতিবেদনে..

অনুলিপি ডেস্কঃ জাফরান ফুল থেকে সংগৃহীত এক প্রকারের মশলা যা সাধারণভাবে “জাফরান ক্রোকাস” নামে পরিচিত। জাফরন ফুলের প্রাণবন্ত গাঢ় লাল রঙের এবং শৈলীর গর্ভমুণ্ড, যাকে জাফরন আঁশ বলা হয়। সংগ্রহ এবং শুকানোর মাধ্যমে জাফরন মশলা তৈরি করা হয় যা প্রধানত খাবারের স্বাদ এবং রঙের জন্য ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে ওজন এর দিকে দিয়ে জাফরন হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল মসলা।

জাফরানের পরিচিতিঃ জাফরান হল একধরনের মশলা যা জাফরান ফুলের শুষ্ক গর্ভমুন্ড থেকে পাওয়া যায়। আনুমানিক ৩৫০০ বছর ধরে মানুষ জাফরান চাষ ও ব্যবহার করে আসছে, যা ঔষধ, রং, সুগন্ধি ও মশলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গোহায় থাকার জন্য আদিম মানুষ রঙ হিসেবে প্রথমবার ব্যবহার করেছিল বন্য এক ফুল। ফন্ট ইউওরস ইমপ্ল্যান্ট সাইন্স ফেয়ার এক গবেষণায় গবেষকরা বলেন, প্রাচীন চিত্রকর্মগুলোর যে ফুল ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলো ওই অঞ্চলে জন্মানো জাফরানের জিনগত বৈশিষ্ট্যের সাথে মিল রয়েছে। শিল্পকর্ম থেকে আশা করি জাফরানের এখন পৃথিবীতে রাজকীয় মানের মশলাদের মাঝে অন্যতম। তখনকার সম্ভ্রান্ত পরিবারে জাফরানের ব্যবহার ব্যাপক প্রচলন ছিল।

জাফরানের আদিবাসঃ ইতালি স্পেন বিশ্বের সর্ববৃহৎ উৎপাদনকারী দেশ হলেও ইরান একাই বিশ্বজুড়ে এর 90% যোগান দেয়। ইরানের সবচেয়ে বেশি জাফরান উৎপাদন এর কারণ হচ্ছে সেখানে অল্প বেতনে অধিক সংখ্যক কর্মী পাওয়া যায়।

জাফরানের উৎপত্তিঃ ধারণা করা হয় যে,১২ শতকের প্রাচীন ফার্সি শব্দ সাফরান থেকে এটির উৎপত্তি হতে পারে, যা লাতিন শব্দ (safranum) থেকে উৎপত্তি হয়েছে যা আবার আরবি শব্দ জাফরান থেকে এসেছে যা আবার ফার্সি শব্দ জার্পারান থেকে এসেছে যার অর্থ “সুবর্ণ পাপড়ি দিয়ে ফুল”। লেলিজাতের ফুলের কেশর থেকে জাফরান তৈরি হয়।

জাফরানের চাষঃ এক কেজি সমপরিমাণ জাফরান পেতে দরকার হয় অন্তত দেড় লাখ ফুল। এর প্রতিটি ফুল খুব সাবধানে গাছ থেকে তুলে তার ভেতরের কেশর বের করে রোদে শুকাতে দেওয়া হয়। ইরান কিংবা কাশ্মীরে হেক্টর প্রতি জাফরানের ফলন হয় দুই থেকে আড়াই কেজি। এক গ্রাম জাফরান পেতে প্রায় 150 টির মত ফুলের কেশর লাগে। ফুল সংগ্রহ করা হয় ভোর বেলায়। নাহয় সূর্যের অতিরিক্ত তাপে ফুল নষ্ট হয়ে যায়। এই ফুল বছরে মাত্র একবারই চাষ করা হয়। আর গাছে ফুল এসে গেলে ফুল থেকে জাফরান সরানোর জন্য কাজ শুরু করে শ্রমিকরা। এ ছাড়া এক পাউন্ড জাফরান সংগ্রহ করতে শ্রমিকদের সময় লাগে প্রায় 40 ঘণ্টা। এদিকে কায়িক শ্রমের মাধ্যমে জাফরান তোলার কাজ শেষ করতে হয়। মেশিন দিয়ে কাজের কোনো সুযোগ নেই এতে।

জাফরানের বাজারমূল্যঃ মূলত উচ্চ পরিকল্পনা ও সময়সাপেক্ষ হওয়ার কারণে জাফরান মূল্য বেশি। ফাল্গুনের প্রতিকেজি জাফরানের মূল্য 4 থেকে 5 লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

আরো পড়ুন: মঙ্গলপুর: জন-মানবশূন্য এক গ্রামের গল্পকথা!

জাফরানের ব্যবহারঃ জাফরানে রয়েছে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি, অ্যান্টি-ফাঙ্গাল, ম্যাংগানিজ, যা ব্লাডসুগার নিয়ন্ত্রণে রাখে। এর মধ্যে উপস্থিত রয়েছে ভিটামিন সি, যা শরীরকে ইনফেকশন বা সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করে। জাফরানের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান বাতের ব্যথা, জয়েন্টে ব্যথা, মাংসপেশির ব্যথা দূর করতে সাহায্য করে। মিশরের রানী ক্লিওপেট্রার গোসলের পানিতে সুগন্ধ ছাড়াতে জাফরান ব্যবহার করতেন। আলেকজান্ডার দি গ্রেট যুদ্ধের সময় শরীরের ক্ষত স্থান জাফরান মিশ্রিত পানি ব্যবহার করতে হয় এবং এর যাও পান করতেন। এছাড়া ত্রয়োদশ শতকে মহামারী প্লেট থেকে মুক্তি পেতে জাফরান ব্যবহার করা হতো।

জাফরানের উপাদানঃ জাফরানের স্বাদ এবং খড়ের মতো সুবাসের উৎপত্তি হয় রাসায়নিক জৈব যৌগ পিক্রক্রোছিন এবং সাফ্রানল থেকে। আবার জাফরনে ক্যারোটিনয়েড রঙ্গক এবং ক্রসিন রয়েছে, যা খাবার এবং কাপড়ে সোনালি-হলুদ রঙ এর সৃষ্টি করে। শুকনো জাফরানের শতকরা 65 ভাগ শর্করা, ৬ ভাগ ফ্যাট, 11 ভাগ প্রোটিন, ১১ ভাগ ক্যালসিয়াম ও বাকিটুকু ভিটামিন ও মিনারেল।

জাফরানের শতকরা 65 ভাগ শর্করা, ৬ ভাগ ফ্যাট, 11 ভাগ প্রোটিন, ১১ ভাগ ক্যালসিয়াম ও বাকিটুকু ভিটামিন ও মিনারেল
জাফরানের শতকরা 65 ভাগ শর্করা, ৬ ভাগ ফ্যাট, 11 ভাগ প্রোটিন, ১১ ভাগ ক্যালসিয়াম ও বাকিটুকু ভিটামিন ও মিনারেল। ছবি: ইন্টারনেট

জাফরানের উপকারীতাঃ কফ, কাশী, ঠান্ডাা, পাকস্থলীর সমস্যা, অনিদ্রা, গর্ভাশয় রক্তপাত ও হৃদরোগসহ নানা সমস্যা সমাধানের জাফরান বেশ ভালো কাজ করে। দুধের সঙ্গে জাফরান মিশিয়ে খেলে হজম শক্তি বাড়ে ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। রাতে ঘুমানোর আগে জাফরান দুধ খেলে খুব ভালো ঘুম হয়। ত্বক উজ্জল করতে জাফরানের তেল উপকারিতা অনেক। এমনকি এর পানি রয়েছে অদ্ভুত সব বৈশিষ্ট্য। জাফরানের যে প্রাকৃতিক যৌগ আছে তা দৃষ্টি শক্তি অবক্ষয় এবং রেটিনার যেকোনো সমস্যা প্রতিরোধে সহায়তা করে। এছাড়া আরব বিশ্বের সঙ্গে কফির সাথে জাফরান মিশিয়ে খাওয়ার প্রচলন রয়েছে।

ইসলামে জাফরানের গুরুত্বঃ ইবনে কুদামা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা তার ভগ্নি নামক কিতাবে লিখেছেন, চার মাযহাব মতে রান্না করে জাফরান খাওয়া বৈধ। হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর যুগে জাফরানের বেশী ব্যবহার পোশাকের ক্ষেত্রে হতো। তবে ইসলামে পুরুষের জন্য জাফরান রঙ্গের পোশাক নিষিদ্ধ! এছাড়া আনাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা বলেন নবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম পুরুষদের জাফরানি রং এর কাপড় পড়তে নিষেধ করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button