গর্ভাবস্থা নিয়ে ছয়টি কুসংস্কার!

 অনুলিপির পোস্ট সবার আগে পড়তে গুগল নিউজে ফলো করুন 👈

পৃথিবীতে কুসংস্কার বিহীন কোনো জাতিই নেই। আমরা নিজ নিজ সংস্কৃতি অনুসারে কম বেশি সবাই কিছু না কিছু কুসংস্কার বিশ্বাস করি। আর আমরা বাঙালিরা একটু বেশিই কুসংস্কার বিশ্বাস করি। তবে এসব প্রচলিত কুসংস্কার বা ধারণা প্রমাণিত নয়। গর্ভবস্থা একজন নারী বা মায়ের জন্য খুবই স্পর্শকাতর সময়। এই সময় একজন নারী বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যায়। এইজন্য এই সময়টাতে গর্ভবতী মা তার পরিবার ও আশে পাশের অনেকের কাছ হতেই নানা ধরনের পরামর্শ নিয়ে থাকে। তবে এই সব পরামর্শ একজন প্রসূতি মায়ের জন্য সবসময় সুখকর বা ভালো হয় না। অনেক সময় উল্টো ক্ষতির কারণ হয়। তাই, প্রসূতি এবং স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ না জেনে এমন কিছু পালন করা উচিত নয়। মা ও শিশুর সুস্থতার জন্য সঠিক প্রসবপূর্ব যত্ন নিন। যাই হোক, চলুন জেনে নিই— গর্ভাবস্থা নিয়ে ছয়টি কুসংস্কার।

গর্ভাবস্থা নিয়ে ছয়টি কুসংস্কার

১| নবজাতকের চেহারা নির্ভর করে গর্ভবতী মায়ের পছন্দের খাবারের ওপর—

প্রচলিত কুসংস্কারগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি কুসংস্কার হলো, গর্ভাবস্থায় মায়ের যে খাবার খেতে তীব্র ইচ্ছা হয়, সেই খাবারের সাথে শিশুর শারীরিক গঠনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। যেমন: গর্ভবস্থায় মা যদি চকলেট বা গাঢ় রঙের খাবার খায়, তবে শিশুর গায়ের রঙ কালো বর্ণের হবে। আবার, দুধ বা হালকা খাবার খেলে শিশুর ত্বকের রঙ হবে ফর্সা। কাতল মাছ খেলে মুখ বড়ো হবে, পুঁটি মাছ খেলে মুখ ছোটো হবে, ইত্যাদি নানা ধরনের কুসংস্কার রয়েছে। তবে আদতে, খাবার বা পানীয় কোনোটাই শিশুর গায়ের রঙ, আকার-আকৃতি বা শারিরীক গঠনে ভূমিকা রাখে না।

আরও পড়ুন# এমআরএনএ ভ্যাক্সিন কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?

সাধারণত শিশুর শারিরীক গঠন, শিশুর গায়ের রঙ নির্ভর করে তার বাবা-মা বা পূর্বপুরুষদের জিনের ওপর। তবে আপনার শিশুর চেহারা কেমন হবে, শিশু সুস্থ সবল কিনা, এসব জানতে সবচেয়ে উত্তম উপায় হলো 4D আল্ট্রাসাউন্ড। এছাড়াও আপনার শিশু সঠিক পুষ্টি পাচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য আপনার ডায়েট কীভাবে পরিচালনা করবেন সে বিষয়ে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নিতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়।

২| গলার মালা পরা বা তোয়ালে জড়ানো উচিত নয়—

গর্ভাবস্থায় প্রচলিত রয়েছে যে, প্রসূতি মায়ে গলায় বা ঘাড়ে জড়ানো কিছু পরা উচিত নয়। কারণ এমন কিছু পরলে গর্ভের শিশুটি জন্মের সময় তার গলায় নাভির কর্ড পেঁচানো হবে, যা খুবই ক্ষতিকর। তবে এই কুসংসারের কোনো ভিত্তিই নেই। বরং এই কুসংস্কার একজন গর্ভবতী মায়ের দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। তবে অনেক সময় গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ত্রৈমাসিকের সময় নাভির কর্ডটি শিশুর ঘাড়ে পেঁচিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এটি হওয়ার কারণ হলো গর্ভে শিশুর নিজের নড়াচড়া। এছাড়া এর বাহ্যিক অন্য কোনো কারণ নেই। তাই, ডেলিভারির আগে প্রসূতি মায়ের নিয়মিত চেকাপ করা জরুরি। এতে করে এমন সমস্যা হলেও তা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব।

৩| গর্ভবতী মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এড়ানো উচিত—

প্রচলিত আরেকটি কুসংস্কার হলো, গর্ভবতী মায় মৃত বা মৃত্যের চারপাশে থাকলে বা গেলে তিনি মৃত সন্তান জন্ম দেবে। এছাড়াও মৃত ব্যক্তির প্রতিহিংসাপরায়ণ আত্মা শিশুটিকে তার কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। আসলে এইসবের কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই।

যদিও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হয় তা হলো, সাধারণত আপন জনের মৃত্যু একজন মানুষের মানসিক অবস্থা দুর্বল করে দেয়। আর প্রচণ্ড মানুসিক চাপের সৃষ্টি করে। তাই যখন মানুসিক চাপ বেশি হয়, তখন মানুষের শরীর স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল নিঃসৃত করে সেটি মোকাবেলা করে। অন্যদিকে, গর্ভাবস্থায় শিশুর চারপাশের প্লাসেন্টাও এই হরমোন নিঃসরণ করতে পারে। আর এই হরমোন অল্প পরিমাণে অ্যামনিওটিক তরলে প্রবেশ করলে, ভ্রূণের বিপাককে পরিবর্তন করতে পারে। এইজন্য ডাক্তাররা বলেন, গর্ভবতী মা যেন কোনো মানসিক কষ্ট বা কোন চাপে না থাকেন এবং সব সময় হাসি-খুশি থাকেন।

আরও পড়ুন# যেসব খাবার হ্যাপি হরমোন বাড়ায়!

৪| সিজার এড়াতে চাইলে গর্ভবতী মা সেলাই বা দড়ির উপর দিয়ে পা ফেলবেন না—

এটি আরেকটি কুসংস্কার। যেখানে মনে করা হয় গর্ভবতী মা সেলাই বা দড়ির ওপর পা রাখলে তার সিজার বা অপারেশন দরকার পড়বে। আদতে ডেলিভারির সময় সিজার বা অপরেশন লাগবে কিনা তা এই দড়ির কুসংস্কারের উপর ভিত্তি করে হয় না। মূলত ডেলিভারির সময় প্রসূতি মায়ের বয়স, জেনেটিক্স, স্ট্রেস লেভেল, গর্ভকালীন পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে তার নরমাল ডেলিভারি হবে নাকি সিজার হবে। আর এই দুশ্চিন্তার জন্য ডাক্তারের প্রসবপূর্ব পরামর্শের নিতে হবে।

৫| গর্ভবস্থায় মা জমজ কলা খেলে জমজ সন্তান জন্ম দেবে—

এটি গর্ভাবস্থা সংক্রান্ত আরেকটি জনপ্রিয় কুসংস্কার। যেখানে মনে করা হয় ‘জমজ’ খাবার, যেমন একটি ডিমে দুইটা কুসুম অথবা জোড়া লাগানো কলা ইত্যাদি খেলে গর্ভবতী মায়ের জমজ সন্তান হবে। প্রকৃতপক্ষে এর কোনো ভিত্তি নেই। মূলত সন্তান যমজ হওয়ার সম্ভাবনা একমাত্র জেনেটিক্স, পারিবারিক ইতিহাস, উর্বরতা এবং আইভিএফ (ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) এর মতো চিকিৎসাগুলোর ওপর নির্ভরশীল। তবে কলা এবং ডিম গর্ভবতী মায়েদের জন্য পুষ্টির ভালো উৎস।

৬| গর্ভবতী মায়ের শরীরে দাগ / কালো স্থান থাকলে ছেলে হবে, আবার পা ফুলে গেলে মেয়ে হবে—

সমাজে এমন কুসংস্কার রয়েছে, যেখানে গর্ভবতী মায়ের নাক, ঘাড়, কুঁচকি, মুখ এবং বগলে কালো দাগ, পা ফুলে যাওয়ার ওপর শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণ করে। অনেকে তো ভাবে গর্ভবস্থায় মাকে যদি সতেজ এবং সুন্দর দেখায় তবে তার মেয়ে হবে। আসলে এই শিশুর লিঙ্গ মায়ের বাহ্যিক বা শারীরিক চেহারায় দেখা যায় না। শিশুর লিঙ্গ পরীক্ষা করার একমাত্র উপায় হলো আল্ট্রাসাউন্ড। এছাড়াও লিঙ্গ নির্ধারণ করে জেনেটিক ও বাবার শুক্রাণুর ওপর।

আরও পড়ুন# প্রতিদিন দুই কাপ চা পানে বাড়বে আয়ু!

প্রিয় পাঠক, এই ছিল— গর্ভাবস্থা নিয়ে ছয়টি কুসংস্কার সম্পর্কে বিস্তারিত। গর্ভবস্থায় একজন নারীর মানসিক ও শারীরিক অবস্থার তুমুল পরিবর্তন হয়৷ তাই মা এবং শিশুর স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো গল্প বা লোককাহিনীর ওপর নির্ভর করা একদমই উচিত নয়। সব সময় চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং মায়ের যত্ন নিন।

যাই হোক, আজকের মতো এখানেই। আর এই আর্টিকেলটি ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করবেন এবং এই ধরনের আরও আর্টিকেল পেতে অনুলিপির সাথেই থাকুন। ধন্যবাদ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button

Adblock Detected

Dear Viewer, Please Turn Off Your Ad Blocker To Continue Visiting Our Site & Enjoy Our Contents.