বিশ্বাস করা ভালো, অন্ধ বিশ্বাস করা পাপ!

মানুষের মুখে বলতে শুনেছি, পৃথিবীটা নাকি বিশ্বাসের ওপর টিকে আছে। কথা টা সত্যি। বিশ্বাস না থাকলে পৃথিবীতে টিকে থাকা টা কঠিন হয়ে যেত। তবে আজ আপনাদেরকে একটি অন্ধ বিশ্বাসের গল্প শুনাব! যেটি শোনার পর আপনারা মানতে বাধ্য হবেন যে- বিশ্বাস করা ভালো, অন্ধ বিশ্বাস করা পাপ! চলেন শুরু করা যাক!

বিশ্বাস করা ভালো, অন্ধ বিশ্বাস করা পাপ!

খুব ছোট্ট বেলা মেয়েটার মা মারা গেছে। ছোট্ট বলতে ৭ বছর বয়সে রুপার মা মারা যায়। তারপর থেকে মেয়েটার কথা চিন্তা করে তার বাবা ফকরুল দ্বিতীয় বার আর বিয়ে করেনি।

এই ভাবেই চলতে ছিল বাবা আর মেয়ের সুখী জীবন। রুপা সম্ভবত তখন মাত্র এস.এস.সি পাস করে কলেজে ভর্তি হয়েছে। বেশি মেধাবী না হলেও ছাত্রী হিসেবে মোটামুটি ভালোই ছিল। কলেজে কিছুদিন ক্লাস করার পর সোহাগের সাথে পরিচয় হয় তার।সোহাগ আর রুপা একই কলেজের স্টুডেন্ট তবে সোহাগ ছিলে রুপার এক ব্যাচ সিনিয়র অথাৎ রুপা ফার্স্ট ইয়ারে আর সোহাগ সেকেন্ড ইয়ারে।

রুপা মেয়েটা ছিল নিতান্তই সহজসরল। এই কয়লার পৃথিবী সম্পর্কে তার এত বেশি ধারণাই ছিল না। নিজে যেমনটি সহজ এমন সহজ করেই নিজের চিন্তাধারাগুলো সাজাতো নির্মল নিষ্পাপ মনে বাইরের জগৎ সম্পর্কে। সোহাগ ছিল মোটামুটি মেধাবী শিক্ষার্থী। তার ইচ্ছে হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করবে।

এই ভাবে একসাথে চলতে চলতে একে অপরের প্রেমে পড়ে যায়। তবে সেটা প্রকাশ করে না রুপা। একটা কথা আছে না যে, “মেয়েদের বুক ফাটে তো মুখ ফাটে না” ঠিক সেই রকমই আরকি।

রুপার কিছু না বলা দেখে, সোহাগই একদিন রুপা প্রপোজ করে। রুপা তো অবাক নিজের প্রছন্দের মানুষের থেকে প্রেম নিবেদন পেলে যেমন টা অবাক হবার কথা ঠিক তেমনটাই।

আরও পড়ুন: বই এবং বই পড়া!

ভালোই চলছিল তাদের প্রেম। রুপা প্রাইভেট পড়তো সকাল ভোরে আর সোহাগ পড়তো সকাল ৮/৯ টার দিকে। শীতের সকালে কুয়াশা ভেজা ভোরে সোহাগ নিজের সাইকেলে করে রুপাকে প্রাইভেটে দিয়ে আসতো। সারা দিন কলেজ সুযোগ পেলেই দুজন এক সাথে সময় কাটাতে আবার সারা রাত জেগে জেগে ফোনে কথা বলত। পরদিন দুজনেই ক্লাসে এসে ঝিমাত।

সে দিন খুব বেশি কুয়াশা পড়েছিল। যেদিন সোহাগ জীবনে প্রথম কোনো নারীকে প্রেম রূপে স্পর্শ করেছিল। রুপার ক্ষেত্র ঠিক তেমনি ছিল। কোনো পুরুষের প্রথম স্পর্শ। এ ভাবে মধুর সম্পর্ক চলতেছিল তাদের। রুপা মনে মনে চিন্তা করতো যে সোহাগ কোনোদিনই তাকে ছেড়ে যাবে না। বিশ্বাস ছিল নাকি অন্ধ বিশ্বাস জানা নেই।

দেখতে দেখতে সোহাগে এইচএসসি পরীক্ষা চলে আসে। রুপা এক ক্লাস ছোটো হলেও পরীক্ষার সময় সোহাগকে অনেক সাহায্য করেছে।

এইভাবে পরীক্ষা শেষ হবার পরে সোহাগ ঢাকা যাবে অ্যাডমিশন টেষ্ট এর জন্য কোচিং সেন্টারে ভর্তি হতে। কিন্তু সোহাগের পরিবার ছিল মধ্যবিত্ত পরিবার। টাকার ব্যবস্থা করতে না পেরে একদিন রুপার কাছে এসে সোহাগ কান্না করতে করতে বলে যে সে আর পড়াশোনা করবে না। পরিবার ও চায় না যে সোহাগ পড়াশোনা করুক কারণ তখন তার পরিবারের অবস্থা ছিল করুণ। সোহাগের চোখে পানি দেখে রাতে ঘুমাতে পারেনি রুপা।

সে শুধু সোহাগকে ভালোবাসত না বরং অন্ধ বিশ্বাসও করত। যার জন্য নিজে মৃত মায়ের রেখে যাওয়া গয়না, বাবার অজান্তে রাতে চুরি করে পরের দিন সোহাগকে দেয়। সোহাগ প্রথমে গয়নাগুলো নিতে চায়নি। তারপর রুপা সোহাগ কে বলে যে, দেখো বিয়ের পর তো এগুলো আমারই হবে। আর যা আমার তাই তো তোমার। তুমি না হয় বিয়ের পর আমাকে এরচেয়ে অনেক বেশি গয়না কিনে দিয়ো। এই কথা শুনে সোহাগ রুপাকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিলো। আর বলল- রুপা তুমি আমাকে এতটা ভালোবাসা? সারা জীবন এতটা ভালোবাসবে তো আমায়? রুপা বলল- আমি সারাজীবন তোমাকেই ভালোবাসব তুমি আমাকে কখনো ছেড়ে যেয়ো না। সোহাগ বলল- ধুর পাগলি এই বলে শক্ত করে আবারও বুকে জড়িয়ে ধরল।

আরও পড়ুন: একটি রঙহীন জীবনের গল্প!

তার কিছুদিন পরে সোহাগ ঢাকা চলে গেল। সোহাগ লেখাপড়ায় অনেক ব্যস্ত হওয়ায় রুপার সাথে আর আগের মতো কথা হয় না। তবে প্রতিদিনই যোগাযোগ হয়। হঠাৎ সোহাগ চলে যাওয়ায় রুপার আগের মতো লেখাপড়ায় মন বসে না। তাও সে সবসময় সোহাগকে ফোন করে না। এই চিন্তা করে যে ওর লেখাপড়ায় সমস্যা হবে।

সোহাগ ঢাবিতে পরীক্ষা দিলো কিছুদিন পরে রেজাল্ট আউট হলো যে সোহাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে। এই খবর শুনে রুপা যে কি মহাখুশি। এই ভেবে যে আমার সোহাগ ঢাবিতে চান্স পেয়েছে এখন আর কোনো সমস্যা নেই বাবাকে বললে বাবাও মেনে নেবে আমার সোহাগকে। সোহাগকে নিয়ে তার অন্ধ বিশ্বাস ছিল অটল। তবে এই খুশির স্থায়িত্ব বেশি দিন বেঁচে থাকতে পারেনি।

ঢাবি তে চান্স পাওয়ার কিছুদিন পার না হতেই সোহাগ রুপার সাথে ঠিকমতো যোগাযোগ করে না। ফোন দিলে ফোন রিসিভ করে না। এস এম এস করলেও ঠিক মতো রিপ্লাই দেয় না। এদিকে মেয়েটা সারাদিন কী যে ছটফটানি করে। তবে কাউকে বুঝতে দেয় না। কেউ একজন বলেছিল যে, “প্রিয় মানুষের অবহেলা মৃত্যু থেকেও নাকি ভয়ংকর” সেটা বোধহয় আজ সে বুঝছে।

অনেক চেষ্টা করার পর সোহাগ তাকে একদিন ফোন দেয়। রুপা যে কি মহাখুশি এই চিন্তা করে যে আমার সোহাগ আমাকে ফোন করেছে। যে সোহাগ রুপার সাথে ঠিকমতো এক রাত কথা না বলতে পারলে পাগলের মতো করতো সে সোহাগ! সে দিন অনেক কথা বলার পর সোহাগের শেষ কথা ছিল যে, “তোমার সাথে আমার আর রিলেশন রাখা সম্ভব না, সামনে আমার পুরো ক্যারিয়ার পরে আছে, ফ্যামেলিকে দেখতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি” অথাৎ কাউকে ছেড়ে দিতে হলে যা যা বলে আরকি সবই বলেছে।

রুপা বলল- তাহলে কি আমার এই তিন বছরের সকল প্রেম মিথ্যা ছিল? তুমি কি সব অতীত ভুলে গেলে সোহাগ? সোহাগ বলল- Past is past সব ভুলে যাও। রুপা বলল- আমি যে নিজর মৃত মায়ের গয়না বিক্রি করে তোমাকে ঢাকা পাঠালাম সেটা কি ভুুলে গেলে সোহাগ?

সোহাগের উত্তরটা ছিল হৃদয় বিদারক। উত্তর ছিল এই যে, “সেদিন তোমার কাছে গয়না ছিল তা বিক্রি করে আমাকে হেল্প করেছো, সে দিন তুমি হেল্প করেছো তাই অন্য কারও কাছে যাইনি। অন্য কারও কাছে গেলে সে এই হেল্পটুকু এমনিতেই করত; সো এটা বলার মতো কিছু না সিম্পল একটা বিষয়!”

আরও পড়ুন: পথ শিশু আব্দুল গণির সাথে একদিন!

সোহাগের কাছে এইরকম উত্তর শুনে রুপা আর একটি কথাও বলেনি। এরপর থেকে রুপা সোহাগকে আর কোনো দিন ফোন করে বিরক্ত করেনি। আসল কথা হলো, সোহাগ ঢাবির কলা অনুষদের জুথী নামে একটি মেয়ের প্রেমে পড়ে রুপাকে অবহেলা করেছে।

এর কিছুদিন পরে সোহাগ বাড়িতে আসে। এসে শুনতে পায় যে রুপা নাকি কিছু দিন আগে আত্মহত্যা করে মারা গেছে! আত্মহত্যা করার আগে একটি চিরকুটে “সরি বাবা” লিখে রেখে মারা যায়। এবং তার রুমের দেয়ালে বড়ো করে লিখে দিয়ে যায় যে- “বিশ্বাস করা ভালো, অন্ধ বিশ্বাস করা পাপ!”

তার এই মৃত্যু তার বাবা মেনে নিতে পারেননি। এর কিছু দিন পর অর্থাৎ রুপার মৃত্যুর কিছু দিন পর তার বাবা স্ট্রোক করেন, এতে তার ডান হাত এবং ডান পা প্যারালাইজড হয়ে যায়। এরপরে কী হয়েছিল আর জানা যায়নি।

তবে এতটুকু শোনা গেছে যে, সোহাগ যে মেয়েটির জন্য রুপাকে ছেড়ে দিয়েছিলে সে মেয়েটি সাথে তার ৪ বছর প্রেম করার পর; বিসিএস ক্যাডার অন্য এক ছেলেকে বিয়ে করেছে।

এটা ই বোধহয়- “Revenge of nature”.

গল্প: বিশ্বাস করা ভালো, অন্ধ বিশ্বাস করা পাপ!
লেখা: ফকির মুহাম্মদ শুভ ইসলাম

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button

Adblock Detected

Dear Viewer, Please Turn Off Your Ad Blocker To Continue Visiting Our Site & Enjoy Our Contents.