ইতিহাসঐতিহ্যফিচারলোকসংস্কৃতি

হাটবাজার: লোকায়ত বাংলার অর্থনীতির প্রাণ!

গ্রাম-বাংলার জনমানুষের জীবন-জীবিকার সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত হাটবাজার। ভোর হতে না হতেই বাংলার হাটগুলোতে শুরু হয় মানুষের আনাগোনা। যে এলাকার হাট সেদিন সেই এলাকা ছাড়াও পাশের অনেক গ্রাম থেকে মানুষ আসে হাটবাজারে। কেউ আসে পণ্য বিক্রির উদ্দেশ্যে কেউ আবার নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করতে। ভোর থেকেই মানুষ আসে হাটে। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে জমায়েত। আর শুরু হয় নিলাম; হাঁকডাক হাতবদল আর গুঞ্জন। সেই গুঞ্জন আর ভিড়ের মাঝেই এক বিস্ময়কর মুখরতা। সে মুখরতায় বাড়ে শ্রমজীবী মানুষের কর্মচাঞ্চল্য। কর্মজীবী মানুষদের সারাদিন চলে বেচাকেনার মাধ্যেমে। দাম-দর করে চলে বেচাকেনা। বিকাল বা সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে কেনা বেচার ধুম। এটিই তো মূলত হাটবাজারের চিরায়ত রূপ। শহুরে মার্কেট বা শপিং মলের মত সাজসজ্জা নেই এখানে, নেই বড়ো কোনো অট্টালিকা; বড়ো বড়ো ভবন। তবে প্রাণস্পন্দনের অভাব নেই। আবহমান বাংলার অকৃত্রিম সৌন্দর্য যেন হাতছানি দেয় হাটের পণ্য বেচাকেনার সরু অলিগলি ভেদ করে। হাটবাজার লোকায়ত বাংলার অর্থনীতির প্রাণ। গ্রামের মানুষদের চাহিদাসই সব পণ্যই পাওয়া যায় হাটবাজারে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে হাক-ডাক আর বেচাকেনার ধুম। লোকায়ত বাংলার এক অপরূপ দৃশ্য। শুধু তাই নয়, হাটবাজার মানেই লোকায়ত মানুষের মেলবন্ধনের জায়গা। সেই সাথে গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি এই হাটবাজার।

হাটবাজার:

গ্রামীণ লোকায়ত জীবনযাত্রায় হাট খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বাংলাদেশের সব গ্রামে হাট না থাকলেও কিন্তু বেশির ভাগ বড় গ্রামে হাট বিদ্যমান। একে বাদ দিয়ে গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা, গ্রামের মানুষের অর্থনৈতিক কার্যক্রম চিন্তা করাও অসম্ভব। আর যেসব জায়গায় প্রতিদিন দোকান বসে এবং নিয়মিত বেচাকেনার জন্য লোকসমাগম হয়, সেসব জায়গাকে বলে বাজার। কিন্তু যেখানে সপ্তাহে নির্দিষ্ট দু-একদিন কেনাবেচা হয় সেসব জায়গাকে বলে হাট। তবে হাটেই জিনিসপত্র বেশি আসে এবং ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম বেশি ঘটে।

অর্থাৎ, গ্রামের যে নির্দিষ্ট স্থানে ক্রেতা ও বিক্রেতা নির্দিষ্ট দিনে ও নির্দিষ্ট সময়ে মিলিত হয় তাকে গ্রামীণ হাটবাজার বলে।

হাটের দিন ছাড়া এ স্থান শূণ্য পরে থাকে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর চাহিদার সঙ্গে হাট সঙ্গতিপূর্ণ নয়। হাটে সপ্তাহে ১-২ দিন পণ্য ক্রয়-বিক্রয় সংঘটিত হয়। বেশির ভাগ হাটে অস্থায়ী বিধায় সেখানে ছাউনি দেখা যাই। আর হাটে দ্রুত পচনশীল দ্রব্যসামগ্রী বিনিময় এর সুবিধা দিতে পারে না। হাটের ক্রেতারা খুব দূর থেকে আসেনা, তারা আশপাশের গ্রাম থেকে আসে। বরং হাটের বিক্রেতারা দূরবর্তী স্থান থেকে আসে।

কয়েকটি গ্রাম মিলে হয় একটি হাট। সাধারণত যে স্থানের সঙ্গে শহর বা অন্যান্য স্থানের যোগাযোগ আছে, মাল সরবরাহ, যাতায়াত, পরিবহন ও যোগাযোগের সুবিধা আছে সেখানে হাট বসে।

আরও পড়ুন# এপিজে আবদুল কালাম : ভারতের মিসাইল ম্যান!

হাটবাজার এর বৈশিষ্ট্য:

  • হাটের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো হাটে বিভিন্ন ধরনের পণ্যের সমাবেশ ঘটে।
  • কম দামে পণ্য কেনা যায়।
  • হাটে প্রচুর লোক সমাগম ঘটে। কেউবা মাইক বাজিয়ে পণ্য বিক্রি করে, কেউ হাক-ডাকিয়ে, কেউ ফেরি করে৷ ক্রেতা-বিক্রেতার দর কষাকষিতে মুখর হয়ে ওঠে হাটবাজার।
  • সপ্তাহের নির্দিষ্ট ১-২ দিন হাট বসে।
  • সময় যত যায় ততই হাটে ভিড় বাড়ে। ভোর থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যায় হাট ভেঙে যায়৷ মাঝের সময়টাতে লোকমুখর ও জমজমাট হয়ে ওঠে হাট।
  • আশেপাশের গ্রামের লোকজন হাটে আসে সদাই কিনতে ও বিক্রি করতে।
  • হাট থেকে ক্রেতারা ব্যাগ ভর্তি বাজার করে নিয়ে যায় আর বিক্রেতারা পকেট ভর্তি টাকা নিয়ে যায়।

হাটবাজার এর প্রয়োজনীয়তা:

গ্রামীণ জীবনে হাটবাজার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামের বাজারে প্রয়োজনীয় জিনিস স্বল্প পরিমাণে পাওয়া যায়। তবে সব জিনিস পাওয়া যায় না। সব ধরণের পণ্যের পসরা বসে হাটের দিন। ভালো জিনিস পেতে গ্রামের মানুষকে হাটের দিনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। সব ধরণের পণ্যসামগ্রীর সমাবেশ ঘটে। আর এসব পণ্যসামগ্রী কিছুটা কম দামে ক্রেতারা কিনতে পারে। এতে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েরই লাভ হয়। বিক্রেতারা বেশি বেশি পণ্য বিক্রি করতে পারে আর অগণিত জনসাধারণ কিছুটা কম দামে প্রয়ােজনীয় দ্রব্যাদি কিনতে পারে। গ্রামীণ হাটগুলো কৃষি নির্ভর বিধায় গ্রামবাসীরা তাদের উৎপাদিত পণ্য হাটে বিক্রির সুযোগ পায়। আর সেই বিক্রিত পণ্যের অর্থ দিয়ে তারা তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে পারে। হাট থেকে পাইকাররা পণ্য কিনে শহরে আবার তা বিক্রি করে। হাটবাজার গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তাই বলা যায়, গ্রামীণ জনজীবনে হাটের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

হাটবাজার এর ঐতিহ্য:

এখনো হাটের ইতিহাস ও ঐতিহ্য স্থানীয় লোকমুখে টিকে আছে। বিশেষ করে গ্রামীণ উন্নয়ন বা আঞ্চলিক উন্নয়নের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগসূত্র রয়েছে গ্রামীণ হাটের। আবার এখনো পর্যন্ত অনেক অঞ্চলেই শত শত বছরের পুরনো সেই হাটকে ঘিরে মানুষের জীবন-জীবিকা আবর্তিত হতে থাকে। যদিও সময়ের বিবর্তনে অনেক হাট বা গঞ্জ হারিয়েছে তার জৌলুস ও নিজস্ব ঐতিহ্য। কিন্তু এখনো এমন বহু পুরনো হাট আছে, যা ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী বহন করে চলছে। পণ্যের হাতবদল ছাপিয়ে স্থানীয় আচার, ঐতিহ্য, সংকট আর সভ্যতারও নানা ছাপ দেখা মেলে সেখানে। হাট বাজার দেশীয় সংস্কৃতির সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। হাটের উৎপত্তির কারণেই ঘুরেছে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা। গ্রামের বিভিন্ন হাটবাজারে আজও মেলে পুতুলনাচ, সাপ খেলা, বানর খেলা। বেদেনীরা আসে দাঁতের ব্যথা, বাতের ব্যথা কমাতে। দাঁতের পোকা ফেলতে। আসে নাগরদোলা। যা বাংলার লোকসংস্কৃতিকে আজও টিকিয়ে রেখেছে৷ একটি হাট প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে লালন করে চলছে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাট:

সময়ের সঙ্গে হাটের গুরুত্ব যেমন বেড়েছে। ঠিক তেমনি পরিবহন ব্যবস্থা, যোগাযোগ ও অবকাঠামো সংকটের কারণে অনেক হাট আবার হারিয়েছে তার কদর। তবে দেশে এখনো বহু হাট আছে যেসব বিশেষায়িত পণ্যকে উপস্থাপন করে অর্থাৎ নির্দিষ্ট পণ্যের হাট। যেমন- টাঙ্গাইল ও শাহজাদপুরে কাপড়ের হাট; যশোরের ফুলের হাট, পিরোজপুরের নৌকার হাট, বরিশালের ভাসমান বাজার ইত্যাদি। কালে কালে বেশির ভাগ হাটেরই গোড়াপত্তন হয়েছে মূলত নদ-নদীকে কেন্দ্র করে। যেমন এক সময় বণিকরা দূর-দূরান্ত থেকে এসে জাহাজ রাখতো বুড়িগঙ্গার সোয়ারী ঘাটে। তখন কেবল নগরে নয় গ্রাম থেকে গ্রামে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌকা। পণ্যের সওদা শেষে নৌকা করেই ঘরে ফিরত সবাই। এখনো দেশের অধিকাংশ হাট বসে নদীর কিনার ঘেঁষে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের এসব হাট এখন টিকে আছে আবার হারিয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলের হাটের বর্ণনা নিচে দেওয়া হলো:

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট আমের হাট:

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট আমের হাট একটি ঐতিহ্যবাহী হাট। এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান অর্থনৈতিক ফসল হয়ে উঠেছে আম। আম ব্যবসাকে কেন্দ্র করে কানসাট হাটের আশপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য আড়ত। জমে উঠেছে আমের ব্যবসা। আর এখানে হাজারো মানুষের কাজের সুযোগও তৈরি হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কানসাট হাট আরো জমজমাট হয়ে উঠছে। কানসাট আম আড়ত সমিতির হিসেবে শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের বাজার দেড় থেকে ২ হাজার কোটি টাকা। মৌসুম চলাকালীন প্রতিদিন সেখানে আমের বাণিজ্য হয় অন্তত ২০ কোটি টাকার। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই হাট মূলত আম কেন্দ্রিক বিধায় এখানে পাইকারী দামে আম ক্রয়-বিক্রি হয়।

টাঙ্গাইলের করোটিয়ায় হাট:

নির্দিষ্ট একটি পণ্যকে নিয়ে অনেক জেলায় বিখ্যাত হাট গড়ে উঠেছে। তেমনই এক হাট এখনো সগৌরবে টিকে আছে। সেটি হলো টাঙ্গাইলের করোটিয়ায় হাট। সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার সারা দেশ থেকে আসা পাইকার ব্যাপারীরা রাতভর জমায়েত হয়ে থাকেন এ হাট ধরতে। হাট চলে পরদিন বুধবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত। হাটবারে এখানে লেনদেন হয় ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা পর্যন্ত। আর এ হাট থেকেই রাজস্ব আদায় হয় কোটি টাকা। স্থানীয় তাঁতিরা ভাঙাচোরা ঘরে বুনন করেন ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ি।

আরও পড়ুন# দোয়েল চত্বর: ঐতিহ্যের শৌখিন রাজ্য!

অনেকটা নিভৃতেই টাঙ্গাইল শাড়ির সমৃদ্ধ ইতিহাস বুনে চলছেন স্থানীয় তাঁতিরা । তাঁতের ওপর ভর করে তারা জীবনের স্বপ্ন বুনে যান। যদিও তাদের ভাগ্যের উন্নয়ন হয় না খুব একটা। এখানকার কারিগরদের দক্ষতা ও নৈপুণ্য অসামান্য। প্রাচীনকাল থেকেই বংশপরম্পরায় তাঁতিরা তৈরি করে চলছেন এসব কাপড়। ঐতিহ্যবাহী মসলিনের যাত্রা শুরু হয় এসব তাঁতির হাত ধরেই। সময়ের সঙ্গে মসলিন কাপড় হারিয়ে গেলেও উত্তরাধিকারের হাত ধরে এখনো টিকে আছে টাঙ্গাইল শাড়ি। এ জেলার ঐতিহ্যের ধারক-বাহক তাঁত শিল্প। এখানকার কৃষ্টি আর সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও লোকজনের কণ্ঠে যদিও এখন হতাশার সুর। যন্ত্রের আধিপত্য আর কালের বিবর্তনে অনেকটাই হারিয়েছে এখানকার তাঁতের জৌলুস। তবুও টিকে আছে এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শাড়ির হাট।

বরিশালের ভাসমান হাট:

দক্ষিণের জেলা বরিশালের স্বরূপকাঠির ভাসমান হাটের রূপ-সৌন্দর্য এখন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের মুখে মুখে ঘুরে ফেরে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের অপূর্ব সৌন্দর্য এখনো অনেকটাই টিকে আছে দক্ষিণের এ জেলায়। ধান, নদী, খাল, বলা হয় এই তিনে বরিশাল। শিল্পনির্ভরতা না থাকায় সেখানকার জনগোষ্ঠীর বড় অংশই কৃষিকাজে জড়িত। জালের মতো ছড়ানো-ছিটানো নদী আর খালের প্রাধান্য থাকায় এ অঞ্চলে চলাচলের প্রধান বাহন ছোট ছোট নৌকা। নদীবিধৌত এ অঞ্চলের মানুষের নিবিড় সখ্যও তাই জলের সঙ্গে। দৈনন্দিন কৃষিপণ্য, ফলমূল নিয়ে চাষীরা তা বিক্রি করেন ভাসমান বাজারে। স্বরূপকাঠির নামডাক আর বিশেষ পরিচিতি পেয়ারার জন্য। ভাসমান বাজারের দিকে যেতেই চোখে পড়বে বাগান থেকে চাষীরা পেয়ারা পারছেন, নেয়া হচ্ছে ডিঙ্গি নৌকায়। পেয়ারার মৌসুমে যা নিত্যদিনের ছবি।

ছোটো ছোটো ডিঙি নৌকায় ডাঁটাশাক, কাঁকরোল, ডাব, কলাসহ নিজেদের উৎপাদিত ফলমূল ও শাকসবজি নিয়ে ছুটে আসেন কৃষকরা। নৌকায় ভাসতে ভাসতে চলে পণ্যের প্রদর্শনী, যা বিক্রি হয় পাইকারি দরে। দুপারে থাকা পাইকাররা দরদাম করে তা কিনে ট্রলার বোঝাই করে পাঠিয়ে দেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। স্বরূপকাঠির নামের সঙ্গে মিল আছে পেয়ারার জাতের। খেতেও ভীষণ সুস্বাদু। যদিও তা বিক্রি হয় অনেকটা জলের দামে। কেননা এখনো গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় বাধা পর্যাপ্ত হিমাগার ও কৃষিপণ্যের বিপণন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা। এছাড়া কৃষিপণ্যের আধুনিক প্রক্রিয়াজাতের সুযোগ না থাকায় পেয়ারা থেকে স্থানীয় পর্যায়ে রপ্তানির সম্ভাবনা থেকেও বঞ্চিত থাকেন চাষীরা।

যশোরের পুলের হাট:

এই হাট যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার খাজুরায় এক বিশাল আকৃতির বটগাছের নিচে বসে। যশোর-মাগুরা মহাসড়কের পাশে বসা এই হাট নাম ‘পুলের হাট’ নামে পরিচিত। সপ্তাহের দুই দিন অর্থাৎ শনি ও মঙ্গলবার বসে এ হাট। ১২ মাসই জমজমাট থাকে পুলের হাট। ভোর সাড়ে ৫টা থেকে আশ-পাশের গ্রামের কৃষকরা তাদের পরিশ্রমের ফসল টাটকা সবজি ভ্যানগাড়ি বা মাথায় করে নিয়ে আসেন। আলু,বরবটি, বেগুন, বিভিন্ন জাতের কপি, কচুরলতি, লাউ, কুমড়া, টমেটো, কাঁচামরিচ, শাক, শসাসহ টাটকা নানা সবজি সাজিয়ে বসে থাকেন বিক্রেতারা। পাইকারি এ হাটে বড় কাঁটা বা দাঁড়িপাল্লায় পণ্যের ওজন মাপা হয়। সবজির এই হাটে কেউ চিৎকার করে সবজির দর তুলছেন, কেউ আবার পরখ করে দেখছেন সবজি। ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়ে হাটের দিন সরগরম হয়ে ওঠে।

নওগাঁর কাঁটাবাড়ি হাট:

নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার কাঁটাবাড়ি হাটের এ ঐতিহ্য অনেকদিনের। একসময় নওগাঁ শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের প্রত্যন্ত এ হাটে হাজারো লোকের ভিড় নেই। নেই কোনো চাকচিক্য। বিশাল বটগাছতলায় বসা একেবারে অকৃত্রিম পরিবেশের এ হাট যেন গ্রামীণ জনজীবনের প্রতিচ্ছবি। যেখানে দোকান বলতে ছোট ছোট টিনের চালা, বেশির ভাগই মাটিতেই পণ্যের পসরা নিয়ে বসেন বিক্রেতা। সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার ও সোমবার বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসা গ্রামীণ এ হাটে স্থানীয় লোকেরা আসেন দৈনন্দিন নিত্যপণ্যের কেনাকাটা সারতে। শাকসবজির পটল, ঝিঙে, বেগুনসহ বিভিন্ন সবজি বিক্রি হয় এ হাটে।

পাহাড়ি অঞ্চলের হাট:

পাহাড়ি জনপদের হাটগুলো জল আর সমতলের হাটের ঐতিহ্যের সঙ্গে আরো ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
দেশের সবচেয়ে কম জনবসতিসম্পন্ন পাহাড়ি জেলায় চাকমা, মারমা, ম্রোসহ বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর বসবাস একসঙ্গে। যাদের সংস্কৃতি, ভাষা হয়তো আলাদা তবে জীবনযাপনের ক্ষেত্রে তাদের গল্পটা যেন মিশে আছে এক সুতোয়।

এখানকার প্রধান কৃষি ফসল শাকসবজি, আদা, হলুদ, জুমের ফসল ও বনজ সম্পদ। এছাড়াও বন এবং ঝরনা থেকে অনেকেই সংগ্রহ করেন বিভিন্ন শাকসবজি। তবে কৃষিজাত পণ্যের সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় তাদের বেচাবিক্রিটাও সারতে হয় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই। যা মূলত হাটবারগুলোতেই হয়ে থাকে। তাই সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে পাহাড়ি রাস্তার ঢাল বেয়ে কেউ গাড়িতে কেউবা মাথায় করে মৌসুমি ফল ও কৃষিপণ্য নিয়ে ছুটে যান হাটে।

হাটবারে নানা ধর্মের, নানা বর্ণের মানুষের এ আয়োজন অনেকটা যেন উৎসবের আমেজ। হাটবাজারে জুম, বনাঞ্চল, ঝর্ণা থেকে সংগ্রহ করা এমন শতাধিক সবজি বিক্রি হয়। জুমের এসব টাটকা শাকসবজি কিনতে অনেক বাঙালিরও পছন্দ। কেবল বিচিত্র শাকসবজি নয়, বন্য প্রাণীর মাংস, হরেক রকম শুঁটকি, কচ্ছপ, কাঁকড়া এমন অনেক কিছুরই সরবরাহ ঘটে পাহাড়ি হাটবাজারে।

পরিশেষে বলা যায়, গ্রামীণ জনজীবনে হাটবার মানেই পণ্য বিক্রির পাশাপাশি খানিকটা উৎসব, মিলনমেলা বা আড্ডার সুযোগ। দৈনন্দিন সদাই-পাতি শেষে সন্ধ্যার দিকে সরগরম থাকে মোয়া-মুড়কি, গরম গরম তেলে ভাজা জিলাপি বা পেঁয়াজির দোকানগুলোও। আবার হাট করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত নামে। বাড়ির ছোট বাচ্চাদের অপেক্ষা থাকে হাট করে ঘরে ফিরলে। তাদের কাছে হাট মানেই মিলবে জিলাপি, সন্দেশ, বাতাসা কিংবা মোয়া-মুড়কি। তাই গ্রামীণ জনজীবনে হাট এক মেলবন্ধনের নাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button