অদ্ভুতুড়েইতিহাসফিচার

কিশোর রাজা তুতেনখামেন: এক অভিশপ্ত মমির গল্প-গাথা!

আপনার যখন আট বছর বয়স, তখন কেমন ছিল আপনার জীবন? শৈশব ছেড়ে সদ্য কৈশোরে পা দেওয়ার সময় যখন শুরু, তখন নিশ্চয়ই মা-বাবার কাছে হাজার রকমের বায়না ধরতেন? খেলনার জন্যে গাল ফুলিয়ে মন খারাপ করতেন কিংবা ঝগড়া করতেন ভাইবোনের সাথে। ভাবুন তো, ঠিক ঐ বয়সেই আপনাকে নিতে হলো আস্ত একটি সাম্রাজ্যের দায়িত্ব, আপনি হয়ে গেলেন রাজা কিংবা সম্রাট! কী? অবাক হচ্ছেন? চলুন আজ জেনে নেই এমনই এক কিশোর রাজা তুতেনখামেন বা তুতানখামুন, যিনি মাত্র ৮ বছর বয়সেই সিংহাসনকে অলংকৃত করেছিলেন।

কিশোর রাজা তুতেনখামেন

কে এই তুতেনখামেন?

তুতেনখামেন ছিলেন একজন ফারাও রাজা। প্রাচীন মিশরের রাজা বা সম্রাটদের ‘ফারাও’ উপাধি দেওয়া হতো। তেমনই এক রাজা ছিলেন আখেনাতেন। সেই আখেনাতেনের পুত্র ছিলেন তুতেনখামেন। অবশ্য রাজা তুতেনখামেনের মমি আবিষ্কারের পরও তুতেনখামেনের আসল পরিচয় জানতো না কেউ। পরে ২০১০ সালে তুতেনখামেনের সমাধি আবিষ্কারের প্রায় ৮৮ বছর পর ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তুতেনখামেনের পিতা কে তা নিশ্চিত হন গবেষকরা। আখেনাতেনের স্ত্রী ছিলেন মিশরের আরেক বিখ্যাত ফারাও রানী নেফারতিতি। তবে তুতেনখামেন নেফারতিতির সন্তান ছিলেন না। বরং আখেনাতেনের বোনের গর্ভে জন্ম নেন তুতেনখামেন। অর্থাৎ তুতেনখামেনের মা ছিলেন সম্পর্কে তার ফুফু। রক্তের বিশুদ্ধতা রক্ষায় ফারাওদের মধ্যে নিজ বংশে এমনকি ভাইবোনদের মধ্যেও বিয়ের প্রচলন ছিল। ধারণা করা হয় এ কারণেই তুতেনখামেন জেনেটিক রোগে আক্রান্ত হন এবং তার একটি পায়ের হাড় ত্রুটিপূর্ণ ছিল। যে কারণে তিনি খুঁড়িয়ে হাঁটতেন।

কেন বিখ্যাত তুতেনখামেন?

তুতেনখামেন ছিলেন মিশরের একজন অখ্যাত রাজা। তিনি পিতার মৃত্যুর পর মাত্র তেরো বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন এবং তার ঠিক দশ বছর পর মাত্র আঠারো বছর বয়সেই ম্যালেরিয়ায় আক্তান্ত হয়ে মারা যান। তবুও তুতেনখামেন বিখ্যাত হয়ে আছেন দু’টি কারণে।

১. তার সমাধিটিই ফারাওদের মধ্যে প্রথম পরিপূর্ণ অক্ষত অবস্থায় আবিষ্কৃত হয়।

২. তুতেনখামেনের সমাধির দেয়ালে ছিলো একটি অভিশপ্ত বাক্য যা পরবর্তীতে অনেক রহস্যজনক ঘটনার জন্ম দেয়।

প্রিয় পাঠক, চলুন জেনে নেই তুতেনখামেনের সমাধি ও মমি আবিষ্কারের পেছনের গল্প!

তুতেনখামেন এর সমাধি আবিষ্কার: 

সময়টা ১৯০৩ সাল। গাড়ি দুর্ঘটনায় আহত হলেন ব্রিটিশ ধনকুবের লর্ড কার্নারভন। সুস্থতার জন্যে হাওয়া বদল করতে তিনি চলে গেলেন মিশরের রাজধানী কায়রোতে। তখনও তিনি জানতেন না, ইতিহাসের পাতায় নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছেন তিনি! নিতান্ত শখের বসেই মিশরের পিরামিড, মমি, ফারাও আর প্রত্নসম্পদ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করলেন। সেখানেই তার পরিচয় হলো আরেক ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ হাওয়ার্ড কার্টারের সঙ্গে। তখনই লর্ড কার্নারভনের মাথায় চেপে বসলো তুতেনখামেনের সমাধি আবিষ্কারের ভূত। শুরু হলো ‘ভ্যালি অব কিংস’ -এ খোঁড়াখুঁড়ির বিশাল কর্মযজ্ঞ। জলের মতো টাকা খরচ করলেন লর্ড কার্নারভন। কিন্তু হদীস মিললো না সহসা। সূত্র বলতে ছিলো থিওডোর ও কার্টারের আবিষ্কার করা কিছু লিলেন কাপড়ের টুকরা, যাতে লেখা ছিল ফারাও রাজা তুতেনখামেনের নাম। ১৯১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে শুরু হলো আনুষ্ঠানিক কর্মযজ্ঞ। তারপর কেটে গেলো আরও পাঁচটি বছর। কিন্তু পাওয়া গেলো না নতুন কোন সূত্র। জলের মতো পয়সা খরচ করেও কোনো ফল না পাওয়ায় আগ্রহ হারিয়ে ফেললেন লর্ড কার্নারভর। কিন্তু নাছোড়বান্দা কার্টার হাল ছাড়েননি তখনও। কার্নারভনকে বুঝিয়ে শুনিয়ে আরও একটা বছর চেয়ে নিলেন তিনি। রাজি হলেন লর্ড কার্নারভন। তবে শর্ত দিলেন, এ-ই শেষ। এরপর কিছু খুঁজে না পেলে আর একটি কানাকড়িও খরচ করবেন না তিনি। উপায় না পেয়ে রাজি হলেন কার্টার। ১৯২২ সালের নভেম্বরে আবারও শুরু হলো খোঁড়াখুঁড়ির কাজ।

হাওয়ার্ড কার্টার
হাওয়ার্ড কার্টার
রাজকীয় সিলমোহরসহ তুতেনখামেনের সমাধির দরজা
রাজকীয় সিলমোহরসহ তুতেনখামেনের সমাধির দরজা

আরও পড়ুন# অ্যাঞ্জেলিনা জোলি: হার না মানা এক অভিনেত্রীর গল্প! 

নভেম্বর মাসের ৪ তারিখ, সকাল দশটা। আর পাঁচটা স্বাভাবিক দিনের মতো শুরু হয়েছিল খোঁড়াখুঁড়ি। কার্টারের এক শ্রমিক মাটি খুঁড়তে গিয়ে সন্ধান পেলেন মাটির তলায় চাপা পড়া এক সিঁড়ির। ডেকে আনা হয় কার্টারকে। তারপর খুঁড়তে খুঁড়তে সিঁড়ির শেষ মাথায় সন্ধান মিললো এক দরোজার। সেই দরজায় লাগানো আছে ফারাও রাজাদের রাজকীয় সিলমোহর! উল্লাসে ফেটে পড়লেন হাওয়ার্ড কার্টার ও তার শ্রমিক দল। পত্রপাঠ টেলিগ্রাম করা হলো লর্ড কার্নারভনকে। খবর শুনে এক মুহূর্ত দেরি করলেন না তিনি। স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন মিশরের উদ্দেশ্যে। যতই হোক, ইতিহাসের সাক্ষী যে তাকে হতেই হবে!

১৯২২ সালের ২৯ শে নভেম্বর তারিখে এলো এই চূড়ান্ত মাহেন্দ্রক্ষণ। লর্ড কার্নারভন, মিশরীয় যুবরাজ আর সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে খোলা হলো সেই সিল করা দরজা। দরজা খুলতেই পিলে চমকে উঠলো সবার! চোখ ততক্ষণে কপালে উঠে গেছে সবার। রাশি রাশি ধনরত্ন, সোনা দানা, হীরা জহরতে ভরপুর হয়ে আছে সমাধিকক্ষের ভেতরটা। তার একপাশে রাখা একটি সোনায় মোড়ানো কফিন। বুঝতে আর বাকি রইলো না, এখানেই মমি করে রাখা হয়েছিল তুতেনখামেনকে। এর আগে এমন অক্ষত সমাধিকক্ষ আগে কখনও দেখেনি মানুষ! আরেকদফা উল্লাস শুরু হলো। সারা বিশ্বে এই আবিষ্কারের খবর রটে গেলো পত্রিকাগুলোর বদৌলতে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো একের পর এক খবর ছাপাতে থাকলো এই সমাধিক্ষেত্র নিয়ে। মৃত্যুর প্রায় ৩৫০০ বছর পর রীতিমতো সেলিব্রেটিতে পরিণত হলো তুতেনখামেন! একে একে তার সমাধিকক্ষের ভেতর থেকে বের করে আনা হলো ৩ হাজারেরও বেশি নিদর্শন। সেসব নিদর্শনগুলো এখন সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে মিশরের কায়রো মিউজিয়ামে

তুতেনখামেন এর কফিন
তুতেনখামেন এর কফিন
তুতেনখামেন এর সমাধিতে পাওয়া ধনরত্ন
তুতেনখামেন এর সমাধিতে পাওয়া ধনরত্ন

তুতেনখামেনের অভিশাপ : 

তুতেনখামেনের সমাধি আবিষ্কারের পর তার সমাধিক্ষেত্রের দেয়ালে পাওয়া গেল কিছু হায়ারোগ্লিফিক লিপির! সেখানে লেখা ছিল,

“যে রাজার চিরশান্তির ঘুম নষ্ট করবে, তার ওপর নেমে আসবে অভিশাপ।”

সেদিন থেকেই ঘটতে শুরু করে অদ্ভুত সব ঘটনা।

১৯২৩ সালের ৫ এপ্রিল এই খনন অভিযানে অর্থের যোগানদাতা লর্ড কার্নারভন মৃত্যুবরণ করেন। কেউ কেউ বলেন তিনি সামান্য এক মশার কামড়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। আবার কারও কারও মতে, শেভ করার সময় গলা কেটে অতিরিক্ত রক্তপাত হয়ে মারা যান তিনি। লর্ড কার্নারভনের মৃত্যুর কয়েক-ঘণ্টা পরেই তার কুকুরটি কোনো একটা কিছুকে তাড়া করতে গিয়ে মারা যায়।

সমাধিতে যারা পা রেখেছিলেন তাদের মধ্যে আমেরিকান ধনকুবের জর্জ গোল্ড অন্যতম, যিনি পেশায় ছিলেন রেলপথ নির্বাহী। ১৯২৩ সালে তুতেনখামেনের সমাধি পরিদর্শনকালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর আর সুস্থ হননি। কয়েক মাস নিউমোনিয়ায় ভুগে তিনি মারা যান। সমাধির ভেতরের ছবি ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন তৎকালীন মিশরের যুবরাজ আলি কামেল ফাহমি। ১৯২৩ সালে নিজ পত্নীর হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান যুবরাজ। তুতেনখামেনের মমি সর্বপ্রথম এক্স-রে করেছিলেন স্যার আর্চিবোল ডগলাস বে। এক্স-রে করার পরের দিনই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। সেই অসুস্থতা তার শরীরে বিদ্যমান ছিল বহুদিন। ১৯২৪ সালের ২৪ জানুয়ারি তার মৃত্যু হয়।  ফ্র্যাঙ্ক র‍্যালে নামক একজন ফটোগ্রাফার ছবি তুলেছিলেন তুতেনখামেনের কবর ঘরে। তিনি অন্ধ হয়ে ভগ্নহৃদয়ে মৃত্যুবরণ করেন। দক্ষিণ আফ্রিকার ধনী ব্যবসায়ী ওল্ফ জোয়েল শখের বশে সাক্ষী হয়েছিলেন তুতেনখামেনের মমি দেখার। এর কিছুদিন পরেই সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে স্ট্রোক হয় তার। তাতে মারা যান তিনি। সমাধিটি দেখতে এসেছিলেন সুদানের গভর্নর জেনারেল স্যার লি স্ট্যাক। তাকেও গুলি করে হত্যা করা হয় কায়রোতে। আর্থার মেস নামক এক খননকর্মী ছিল কার্টারের দলে। আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় তিনি বেঘোরে প্রাণ হারান ১৯২৮ সালে।

তালিকায় আছে হাওয়ার্ড কার্টারের পার্সোনাল সেক্রেটারি রিচার্ড বেথেলও। তিনিই কার্টারের পেছনে সবার আগে সমাধিতে প্রবেশ করেছিলেন। ১৯২৯ সালের ১৫ নভেম্বর লন্ডনের একটি অভিজাত ক্লাবের কামরা থেকে তার পুড়ে যাওয়া লাশ উদ্ধার করা হয়।  রিচার্ড বেথেল তার বাড়িতে তুতেখামেনের সমাধি থেকে পাওয়া কিছু প্রত্ন সম্পদ তার বাড়িতে সাজিয়ে রেখে দিয়েছিলেন। রিচার্ডের বাবা বৃদ্ধ লর্ড ওয়েস্টবেরি প্রায় সময়ই আপনমনে বিড়বিড় করে বলতেন, “এই জিনিসগুলো অভিশপ্ত। এগুলোতে ফারাওয়ের অভিশাপ রয়েছে।” তিনি নিজের লেখা সর্বশেষ চিরকুটে লিখে যান, “এই বিভীষিকা আমি আর সহ্য করতে পারছি না, আমি এর থেকে চির মুক্তি চাই।” তারপর তিনি সাত তলা দালান থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। মৃত্যুর পাঁচ দিন পর লর্ড ওয়েস্টবেরির কফিনকে একটি গাড়িতে চাপিয়ে গোল্ডার্স গ্রিনের কবরখানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তখন সেই গাড়িতে ধাক্কা লেগে আট বছরের এক বালক নিহত হয়।

এ সমস্ত রহস্যের কারণে এখনও আলোচিত তুতেনখামেনের মমি!

অভিশাপ না গুজব?

শুরু থেকেই অধিকাংশ মিশরবাসীদের বিশ্বাস ছিল ফারাওয়ের সমাধিক্ষেত্রের ক্ষতিসাধন করা হলে, তার প্রতিশোধ নেবেন ক্ষমতাধর ফারাওরা। কারণ, একদম ছেলেবেলা থেকেই তারা মুখে মুখে প্রচলিত এই গল্প শুনে বড় হয়েছে। কার্টারের এই অভিযানের শুরু থেকেই বিভিন্ন অভিশাপের বানানো গল্প ছড়াতে থাকে, কিন্তু তখনও এই কাজে সংশ্লিষ্ট কারও মৃত্যু হয়নি। প্রথম রটা গুজবটা ছিল, সমাধির মূল ফটকের দেয়ালে নাকি লিখা আছে, “যে রাজার ঘুম ভাঙাবে, তার উপর নেমে আসবে মৃত্যুর পরছায়া।” আবার এ রকম কথাও শোনা যায়, এই লেখাটি কার্টার পেয়েছিলেন সমাধির পাশের রাখা এক চিরকুটে। যদিও বাস্তবে এই কথার কোনো ভিত্তি নেই। প্রাচীন মিশরীয় দেবতা আনুবিসের এক মূর্তিতে খচিত ছিল, “আমি দেবতা আনুবিস। আমি এমনভাবে এখানের বালুকণাকে আটকে দিই যেন কারও পক্ষে এই গোপন প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করা সম্ভব না হয়। আমি এই সমাধির রক্ষাকর্তা।” কিন্তু একজন সাংবাদিক সেই খবরকে রসিয়ে মৃত্যু সম্পর্কিত এক লাইন জুড়ে দেন। ফলে উক্তিটি দাঁড়ায় এ রকম, “আমি দেবতা আনুবিস। আমি এমনভাবে এখানের বালুকণাকে আটকে দিই যেন কারও পক্ষে এই গোপন প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করা সম্ভব না হয়। আমি এই সমাধির রক্ষাকর্তা। যারা সমাধিতে প্রবেশ করে রাজার শান্তির নিদ্রা ভাঙানোর চেষ্টা করবে, আমি তাদের করুণ মৃত্যু প্রদান করব।”

আরও পড়ুন# বলপয়েন্ট কলম যেভাবে এলো!

তুতেনখামেনের অভিশাপের গল্পটি শুরু হলে প্রথম দিকেই স্থান পায় গোখরো কর্তৃক কার্টার ক্যানারি পাখি বধ। গুজবটি ছড়ায় মূলত কার্টারের মিশরীয় এক পরিচারক। প্রকৃতপক্ষে, কার্টার তার পোষা পাখিটাকে কাজের সময় রেখে যেতেন তারই বন্ধু মিনি বার্টনের কাছে। কার্টারের ডায়েরি থেকেও কোবরা সংক্রান্ত কোনো ঘটনা পাওয়া যায় না। একবার গুজব ছড়ায়, তুতেনখামেনের কফিনের উপরে মিশরীয় চিত্রলিপিতে এক অভিশপ্ত বাণী বর্ণিত ছিল, যা দেখে শ্রমিকরা ভয়ে কাজ বন্ধ রাখে বেশ কিছুদিন। কিন্তু শিক্ষাহীন বা স্বল্প শিক্ষিত শ্রমিকেরা হাজার বছরের পুরনো হায়ারোগ্লিফিকের মর্মোদ্ধার করবে কীভাবে? এজন্য হতে হয় ঝানু বিশেষজ্ঞ, করতে হয় বিস্তর পড়াশোনা। তাই সত্যের কষ্টিপাথরে এই গুজবটিও মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়। আবার তুতের সমাধি বা শবাধারের ছবিগুলোতে অভিশপ্ত কোনো বাণী পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে বেশি জল ঘোলা হয় লর্ড কার্নারভনের মৃত্যুকে ঘিরে। একদিন শেভ করার সময় ভুলবশত তিনি গালের মশার কামড়ের একটি জায়গা ব্লেডের আঁচরে কেটে ফেলেন। যা পরবর্তীতে রূপ নেয় ব্লাড ইনফেকশনে। এই সংক্রমণের পর মৃত্যু হয় তার। মৃত্যুর ফলে অভিশাপ তত্ত্বের পালে হাওয়া লাগে আরও ঝড়ো বেগে। একইদিনে লন্ডনে তার কুকুর ‘সুশি’ মারা যাওয়ায়, দুই মৃত্যুকে কোনোরকম জোড়াতালি দিয়ে চমৎকার ও মুখরোচক ভৌতিক গল্প ছড়াতে থাকে সংবাদপত্রগুলো।

তাছাড়া, ১৯০৩ সালে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় তিনি আগে থেকেই দুর্বল ছিলেন। এর বাইরেও তিনি ফুসফুস-জনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। শবাধারে জন্মানো ব্যাকটেরিয়া তার ফুসফুসের সমস্যাকে আরও বেশি বাড়িয়ে দিয়েছিল, যার ফলে তার মৃত্যু ঘটাটাই স্বাভাবিক ছিল তার। কার্নারভনের মৃত্যুর পর ‘কায়রোতে মানসিক ভারসাম্যহীনতা ছড়িয়ে পড়েছে’ এরকম আরেকটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তখন কায়রোতে মানসিক ভারসাম্যহীনতা রোগটি বিরাজমান ছিল। সমাধিক্ষেত্রটিতে হাজার হাজার বছর কোনো মানুষের পদচিহ্ন না পড়ার পাশাপাশি সেটা বদ্ধ থাকায়, তাতে অনেক প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুর সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। দুর্বল শারীরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পন্ন কারও জন্য সেই ব্যাকটেরিয়া মারাত্মক দুর্ভোগ ডেকে আনতে পারে। এটাও হতে পারে কয়েকজনের মৃত্যুর অন্যতম কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাচীন কিছু মমি ছত্রাকের জীবাণু (Aspergillus niger, Aspergillus flavus) বহন করে, যেগুলো সরাসরি ফুসফুসের রক্ত জমাট বাধা বা রক্তপাতের জন্য দায়ী। ফুসফুসের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার (Pseudomonas, Staphylococcus) সন্ধানও সমাধির দেয়ালে মিলেছে।

অনেক মিশরবিদের ধারণা, তুতের মমি আবিষ্কারের শত বছর আগেই ইংল্যান্ডে ছড়িয়ে গিয়েছিল মমি সংক্রান্ত সকল অভিশাপের উপাখ্যান। ইংরেজ কিছু লেখক তখন মমি নিয়ে লিখতে শুরু করে রহস্যপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর সকল গল্প। এর মধ্যে লেখক লুইজা এলকটের ‘লস্ট ইন অ্যা পিরামিড’ বইটির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সে গল্পে পিরামিডের গোলকধাঁধায় আটকে যাওয়া এক বিবাহিত দম্পতিকে খুন করেছিল ফারাওয়ের বিদেহী আত্মা! অভিশাপ সংক্রান্ত গুজব ছড়ানোর দৌড়ে গণমাধ্যম ও সংবাদপত্র সবচেয়ে বেশি এগিয়ে ছিল। এর পেছনে অবশ্য সুনির্দিষ্ট কিছু কারণও বিদ্যমান। প্রত্যেক পত্রিকাই চাইত, প্রথম পৃষ্ঠায় তুতেনখামেনের খবর প্রচার করতে। কারণ, সেসময় এটাই ছিল সারাবিশ্বের অন্যতম হট-টপিক। বিশ্বের নামি-দামি সকল গণমাধ্যম ঝাঁপিয়ে পড়ায় খনন কাজে বেশ অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এতে প্রচণ্ড বিরক্ত হয়েছিলেন লর্ড কার্নারভন। তাই, তিনি লন্ডন ভিত্তিক বিখ্যাত সংবাদপত্র ‘দ্য টাইমস’ এর সাথে এক চুক্তি করে বসেন। চুক্তি অনুযায়ী, শুধু ‘দ্য টাইমস’ এর সাংবাদিকেরা সমাধির ভিতর ঢুকতে পারবে। এই কর্মকাণ্ডে নাখোশ হয়েছিল অন্যান্য সংবাদপত্র, কারণ মমি সম্পর্কিত সকল খবরের জন্য তাদেরকে দ্য টাইমসের দিকে তীর্থের কাকের মতো চেয়ে থাকতে হতো। উপায়ান্তর না পেয়ে বা ক্রোধের বশে তারা সকল তুতের সমাধি নিয়ে উদ্ভট, আজগুবি, ও অবান্তর সকল খবর ছাপাতে লাগলো!   তারকাদের মাঝে প্রথম লর্ড কার্নারভনের অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে কথা তুলেন লেখক মেরি কোরেলি। তার কাছে নাকি একটি আরবি পুঁথি সংরক্ষিত ছিল, যেটা থেকে তিনি জানতে পেরেছিলেন মমির অভিশাপ কতটা ভয়ংকর হতে পারে। তিনি জনসাধারণের নিকট প্রশ্ন রেখেছিলেন, কীভাবে শুধু একটি মশার কামড়ে মৃত্যু হতে পারে লর্ড কার্নারভনের? প্রশ্নটি জনতার মনে আরও রহস্যের জন্ম দেয়। সাথে ব্যবসায়িক স্বার্থ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে তাতে মালমশলা মেশানোর জন্য ইংল্যান্ড ও আমেরিকার সংবাদপত্রগুলো তো ছিলই। সেই গুজবের স্রোতে বাকি সবার মতো গা এলিয়ে দিয়েছিলেন শার্লক হোমসের স্রষ্টা আর্থার কোনান ডয়েলও। তার মতে তুতেনখামেনের অভিশাপের ফলেই মৃত্যু হয়েছে লর্ড কার্নারভনের। গুজব হয়ে উঠলো আরও শক্তপোক্ত আর জোরালো। ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল ২০০২ সালে প্রকাশিত এক আর্টিকেলে জানায়, খননকাজের সাথে যুক্ত ৪৪ জন ব্যক্তির অধিকাংশই স্বাভাবিকভাবে এবং পরিণত বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যারা কোন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের মৃত্যুও ঘটেছে সমাধি খননের ১০ বছরের মধ্যে। টানা সাত বছর ধরে তুতের সমাধি সৌধ পাহারা দিয়েছিলেন খননদলের আরেকজন সদস্য রিচার্ড অ্যাডামসন। তিনি বেঁচেছিলেন আরও ৬০ বছর পর্যন্ত। অনেক মিশরবিদের ধারণা, কার্টার চোর ডাকাতের লুটপাটের হাত থেকে তুতের চ্যাম্বারকে বাঁচানোর জন্যই ইচ্ছা করেই অভিশাপের এই গুজব রটিয়েছেন।

আরও পড়ুন# মঙ্গলপুর: জন-মানবশূন্য এক গ্রামের গল্পকথা!

রেল কোম্পানির মালিক জর্জ জে. গোল্ড কায়রোর ঠাণ্ডায় সর্দি হয়েছিল, তা থেকে নিউমোনিয়া। তখন সালফা ড্রাগ বা পেনিসিলিন আবিষ্কার হয়নি। প্রচলিত ঔষধ তাকে বাঁচাতে পারেনি। তখনকার যুগে এ রকম মৃত্যু ছিল স্বাভাবিক। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জেমস ব্রেস্টেড তুতেনখামেনের সমাধি খননের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি ১৯৩৫ সালের ৩ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন স্ট্রেপটোকক্কাস ব্যাকটেরিয়ায় আক্রমণে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল সত্তর। শবাধারে ওই ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব মিলেছে। তুতেনখামেনের সমাধির প্রত্ন সম্পদ নিয়ে গবেষণা করেছেন, এমন দুইজন ব্যক্তি হলেন স্যার এডওয়ার্ড অ্যা বাজ (৭৯) এবং প্রফেসর পি ই নিউবেরি (৮০) । দুজনেই স্বাভাবিকভাবে এবং স্বাভাবিক বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। প্রফেসর বাজের ভাষায়, “আমি তো মমি নিয়ে নাড়াচাড়া করেছি। কিন্তু কোনো শাপ আমায় ছুঁতে পারেনি।” আরও ডজনখানেক মৃত্যু ও দুর্ঘটনাকে সমাধি আবিষ্কারের সাথে পেঁচিয়ে সেই সময়টাতে প্রচুর গল্প ও রহস্য প্রচলিত হয়, যেগুলো এখনো অবধি রয়ে গেছে। অথচ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তুতের সমাধি আবিষ্কারের পর প্রথম ১০ বছরে মাত্র ২ জন পরিদর্শনকারীর মৃত্যু হয়, এবং প্রায় সকলের মৃত্যুই ছিল স্বাভাবিক।

শেষ কথা: 

তুতেনখামেনের সমাধি ও মমি নিয়ে গবেষণা আজও শেষ হয়নি। দীর্ঘকাল বন্ধ থাকার পর আবারও শুরু হয়েছে তুতেনখামেনকে নিয়ে গবেষণা। মিলছে চমকপ্রদ সব তথ্য। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে আরও সব রহস্যের জট খুলতে শুরু করেছে। একদিন পৃথিবী বাসী তুতেনখামেনকে নিয়ে আরও বেশি জানবে। তবে যত যাই হোক, তুতেনখামেন আর তার অভিশাপের গল্প সবসময় লোকমুখে ঘুরে ফিরে বেঁচে থাকবে তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button