ইতিহাসফিচারলোকসংস্কৃতিশিল্প ও সাহিত্য

চর্যাপদ-এ লোকায়ত সমাজচিত্র!

সামগ্রিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে তিন যুগে ভাগ করা হয়েছে। এর প্রথম যুগের নাম হলো প্রাচীন যুগ। তবে কেউ কেউ আরও কয়টি নামে এ যুগকে অভিহিত করেছেন। সে নামগুলো হলো: আদ্যকাল, গীতি-কবিতার যুগ, হিন্দু-বৌদ্ধ যুগ, আদি যুগ, প্রাক-তুর্কি যুগ, গৌড় যুগ ইত্যাদি। তবে প্রাচীন যুগ নামটির ব্যবহার ব্যাপক ও যথার্থ যুক্তিসঙ্গত। এ যুগের তথা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন হলো চর্যাপদ গ্রন্থটি। চর্যাপদ এর আবহে প্রাচীন যুগের সাহিত্য সম্পর্কে বলা হয় যে, প্রাচীন যুগের সাহিত্যে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষের বিশ্বাস, ধারণা ও দর্শন লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। চর্যাপদ এ ধর্মের বিষয়টি সমাজ জীবনের চিন্তা-ভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। তাই ধর্মের কথায় এখানে মুখ্য। তবে এ যুগের সাহিত্যে লোকজীবন, লোকায়ত সমাজচিত্র ও লোকায়ত মানুষের কথাও এসেছে। চর্যাপদ-এ ফুটে উঠেছে লোকায়ত মানুষের চিত্র।

চর্যাপদ:

বাংলা ভাষায় রচিত প্রাচীন যুগের প্রাচীনতম গ্রন্থটির নাম হলো চর্যাপদ। গ্রন্থটির মূলনাম আজও অজ্ঞাত তবে চর্যার পাদটীকাকার মুনিদত্তের টিকা বা ভাষ্যরচনা থেকে পাওয়া অনুমিত শিরোনাম যথাক্রমে ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ ও ‘চর্যাগীতিকোষবৃত্তি’।

তবে বাংলায় তা ‘চর্যাপদ’ কিম্বা ‘চর্যাগীতি’-এই দুই নামেই পরিচিত। অধ্যাপক মণীন্দ্রমোহন বসু, রচিত ‘চর্যাপদ’ ও ড. সুকুমার সেন রচিত ‘চর্যাগীতি’ এর প্রমাণ।

১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল রাজদরবারের গ্রন্থাগার থেকে এর পুঁথি আবিষ্কার করেন। তাঁরই সম্পাদনায় ‘চর্যাগীতি কোষ’, কৃষ্ণাচার্যের ‘দোহাকোষ’, সরহবজ্রের ‘দোহাকোষ’ ও ‘ডাকার্ণব’ পুঁথিকে একত্র করে ১৯১৬ সালে হাজার বছরের পুরাণ বাংলা ভাষায় ‘বৌদ্ধগান ও দোহা’ এই শিরোনামে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ’ কলকাতা থেকে প্রকাশ করেন। তিনি পুঁথির সূচনায় একটি সংস্কৃত শ্লোক থেকে নামের যে ইঙ্গিত পেয়েছিলেন তাতে এটি চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয় নামেও পরিচিত। তবে সংক্ষেপে এটি ‘বৌদ্ধগান ও দোহা’ বা ‘চর্যাপদ’ নামেই অভিহিত হয়ে থাকে।

চর্যাগীতিতে লুইপাদ, সরহপাদ, কাহ্নপাদ প্রভৃতি নাম উপাধিযুক্ত মোট ২৪ জন পদকর্তার ৫১ টি পদ সংকলিত হয়েছিল। তার মধ্যে সাড়ে ছেচল্লিশটিপদ অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে।

চর্যাগীতিতে সংকলিত পদগুলির মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক পদের রচয়িতা কাহ্নপাদ যার মোট পদসংখ্যা ১০টি। তারপর ভুসুকুপাদ যার মোট পদসংখ্যা-৮টি এবং সরহ বা সরহপাদ এর পদ সংখ্যা-৪টি, বাকি পদ কর্তাগণের কেউ ৩টি কেউ ২টি এবং কেউ ১টি করে পদ রচনা করেন।

আরও পড়ুন# বলপয়েন্ট কলম যেভাবে এলো!

চর্যাপদ-এ লোকায়ত সমাজচিত্র:

চর্যাপদে লোকায়ত মানুষের ও সমাজের চিত্র সুন্দর করে ফুটে উঠেছে। সচেতনভাবে আবার কখনবা তাদের অজান্তেই সমকালীন সমাজের সত্য চিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে। চর্যার সিদ্ধাচার্য কবিরা সহজিয়া সাধন পদ্ধতি ও ধর্মীয় তত্ত্ব কথাকে প্রকাশ করতে গিয়ে তৎকালীন সমাজ ও লৌকিক জীবনের নানা চিত্রের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন ফলে তাঁদের অজান্তেই চর্যাপদগুলিতে তৎকালীন পরিবেশ, প্রকৃতি ও সমাজের জীবন্ত খণ্ডচিত্র ফুটে উঠেছে। যা তৎকালীন লোকায়ত মানুষের সামগ্রিক বিষয় সম্পর্কে ধারণা দেয়।

ভৌগোলিক অবস্থান:

চর্যাগীতিতে তৎকালীন ভৌগোলিক বাংলার একটি রূপ ফুটে উঠে। ভারতের পূর্ব-প্রান্তিক একটা বিরাট অঞ্চল যেমন- বিহার, উড়িষ্যা, বাঙলা, আসামের বিষয়টি এসেছে। নদীমাতৃক বাংলার ভূ প্রকৃতি, জলপথে যাতায়াত বা যোগাযোগ ব্যবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে। নৌবাহী নৌকা টান অ গুণে”- সরহপাদের এই পদটি সহ বিভিন্ন পদে তৎকালীন সময়ের যোগাযোগের বিষয়টি উঠে আসে। আবার তৎকালীন সময়ে ছিল প্রচুর অরণ্য আর কোথাও কোথাও ছোট খাট টিলা।
” উষ্ণা উষ্ণা পাবত তহি বসই সবরী বালী। “(২৮ নং পদ)

সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা:

চর্যাপদের বিভিন্ন পদে তৎকালীন সমাজের অন্তজ শ্রেণির মাঝিমাল্লা, তাঁতি, শবর, মাহুত, ডোম্বী, শুঁড়ি, কাপালিক, নট প্রভৃতি সম্প্রদায়ের উল্লেখ পাওয়া যায় এবং নৌকা বাওয়া, দুগ্ধ দোহন, চাঙারি বোনা, পশু শিকার, তাঁত বোনা প্রভৃতি জীবিকার পরিচয় পাওয়া যায়। তৎকালীন সময়ে এরা লোকালয় থেকে দূরে বাস করতো। এদের বাসস্থান নির্দিষ্ট ছিল তার ইঙ্গিত বিভিন্ন চর্যায় পাওয়া যায়।
“উঁচা উঁচা পাবত তঁহি বসহি সবরি বালী” (২৮)

সমাজে এদের অস্পৃশ্য বলা হতো। উচ্চবিত্তরা এদের সম্মান করতো না কারণ তারা ছিল নিগৃহীত ও নিপীড়ত। সামাজিক অর্থনৈতিক মর্যাদা বলতে কিছুই ছিল না। ব্যাধ কর্তৃক হরিণ শিকারের কথা ভুসুকুপাদের ৬ সংখ্যক কবিতায় বলা হয়েছে। ডোম্বীরা তাঁত বুনতো এবং চাঙ্গারি বানাতো। অর্থাৎ সবমিলিয়ে আর্থিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে এদের বিপর্যস্ত, অবহেলিত অবস্থা বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে।

সমাজের বাস্তবতা:

চর্যাপদে তখনকার শ্রমজীবী নিম্ন শ্রেণির মানুষের দারিদ্র্য লাঞ্ছিত জীবনের বাস্তবচিত্র উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
“হাঁড়িত ভাত নাহি নিতি আবেশী ”

তৎকালীন সময়ে মানুষের অভাব-অনটন লেগেই থাকতো। তাদের সংসারে নিত্য অশান্তি লেগেই থাকতো। আবার অভাবের সংসারে অতিথিদের আনাগোনা ছিল। সুখ বলে কিছু ছিল না তাদের জীবনে।

আরও পড়ুন# মঙ্গলপুর: জন-মানবশূন্য এক গ্রামের গল্পকথা!

সমাজের অরাজকতা:

সেই সময়ে সমাজে অরাজকতা বিরাজমান ছিল। সর্বত্রই চোর-ডাকাত, জলদস্যুর ভয় ছিল। তার প্রমাণও চর্যাপদে রয়েছে। সাধারণ মানুষেরা চাইতো সন্তান পরিবার নিয়ে সুখে বেঁচে থাকার। এদের মধ্যে প্রবল সেই আগ্রহ থাকলেও সত্যিকার সুখ এদের কপালে জুটতো না। পারিবারিক ও সামাজিক কারণে সুখতো দূরের কথা, শান্তিও দূরের অন্ত। ছোটোখাটো চুরি ডাকাতি নিত্য লেগেই থাকতো সবসময়। সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতো। যেমন-
“কানেট চৌরে নিল”
“সোনা রূঅ মোর কিম্পি ণ থাকিউ”

তখনকার সময় তালা-চাবির ব্যবহার থাকলেও চোর থেকে নিস্তার ছিল না। শেষ পর্যন্ত থানা কাছারি বা কোটালের শরণাপন্ন হতে হতো সাধারণ অসহায় মানুষদের। কিন্তু হাঁক পেড়ে যখন ডাকাতি হতো, তখন নির্দয় লুঠেরা ডাকাতেরা এসে সব লুটে নিতো, এমনকি ঘরের বৌকেও ধরে নিয়ে যেত, তখন বাঁচা ও মরা সমান, প্রাণে বাচা তখন ছিল মুখ্য বিষয়। এই সমস্ত নির্যাতন তারা সহ্য করতো।

“আপনে নাহি মো কাহেরি সঙ্কা। তা মহা মুদেরি টুটি গেলি কংখা।”(৩৭)
“জীবস্তে মঅলেঁ নাহি বিশেষণ।” (৪৯)

সমাজ ব্যবস্থা:

চর্যাপদে বাঙলার সমাজ ব্যবস্থার উল্লেখ আছে। তৎকালীন সময়ের সমাজ ব্যবস্থা ছিল কৃষি নির্ভর। কৃষকরা পরম যত্নে ফসল ফলাতে। কিন্তু তাদের ফসলের বড় অংশ চলে যেতো উচ্চ বিত্তদের ঝুঁলিতে। নিম্নবর্গের মানুষদের শ্রমের যথার্থ মূল্যায়ন হতো না।

প্রেম-পরকীয়া:

অন্তহীন দুঃখের মধ্যেও মানুষ সুখের চিন্তা করে যার চিত্র চর্যাপদেও ফুটে ওঠে। তাদের জীবন যন্ত্রণাদায়ক হলেও তারা সুখের আশায় দিন কাটাতো। কল্পনা করতো সুখী জীবনের ছবি। ২৮ সংখ্যক পদে তেমনি একটি সুখী দাম্পত্য প্রেমের ছবি ফুটে উঠেছে। এ সময়েও প্রেম বা দাম্পত্য কহলের যেমন উল্লেখ আছে তেমনি দাম্পত্য প্রেমেরও উল্লেখ আছে। আবার রাতের বেলায় বাড়ির বউদের অভিসারে যাওয়ার কথাও উল্লেখ আছে। অর্থাৎ পরকীয়া প্রেমে লিপ্ত হবার বিষয়টি উঠে এসেছে।
” দিবসহি বহুড়ী কাউহি ডর ভাই।
রাতি ভইলে কামরু জাই।” (২ নং পদ)

ডোমনিদের অবস্থান:

তৎকালীন সমাজে ডোমনিদের অবস্থান নিম্নে ছিল। কেউ তাদের ভালো চোখে দেখতো না। তাদের খারাপ নজরে দেখা হতো, সমাজে স্থান দেওয়া হতো না, তেমনিভাবে অস্পৃশ্য ডোমনিরা সমাজের থেকে বিতাড়িত হয়ে নগরের বাইরে বসবাস করত।
” নগর বাহিরি রে ডোম্বি তোহোরি কুড়ি আ। “(১০ নং পদ)

সামাজিক প্রথা:

যৌতুক প্রথা সমাজের একটি ভয়াবহ ব্যাধি যা প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। বর্তমান সমাজে যেমন যৌতুক প্রথা, বিবাহ প্রথা এবং বিবাহের সময় আনন্দ, অনুষ্ঠান হয় তেমনিভাবে তৎকালীন সমাজেও এই সব নিয়ম রীতি ছিল। আবার বিবাহ উৎসবে যৌতুক প্রথা ও প্রচলিত ছিল সেযুগেও। যা চর্যাপদে উঠে এসেছে।
“জাউতুকে কি অ আনতু ধাম”
” কাহ্ন ডোম্বী বিবাহে চলিআ।
ডোম্বী বিবাহিআ আহরিউ জাম।
জউতুকে কিঅ অনুত্তর ধাম। “( ১৯ নং পদ)

গৃহস্থালির জিনিসপত্র:

দৈনন্দিন জীবন ও সংসারে অনেক প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর প্রয়োজন হয়। তৎকালীন সময়েও যার ব্যতিক্রম ছিল না। দৈনন্দিন সংসারে তাই প্রয়োজনীয় দ্রব্যের নামও চর্যাপদে পাওয়া যায়। নিত্যব্যবহার্য বাসনপত্র, অলঙ্কার ও প্রসাধন সামগ্রী ও সংসারের অন্যান্য দ্রব্য পাওয়া যায়। আবার গৃহস্থে ব্যবহৃত হাতিহায় যেমন- দা, টাঙ্গি, কুঠার প্রভৃতির উল্লেখ আছে। এককথায় চর্যাপদে গৃহস্থ সংসারের স্পষ্ট ছবি ফুটে ওঠে।
” দুলি দুহি পীঢ়া ধরণ ণ জাই। “(২ নং পদ)
” ধমণ চরণ বোন পিণ্ডী বইঠা। ” ( ১নং পদ)

অরণ্য-প্রাণী:

তৎকালীন সময়েও এ দেশ যেমন ছিল নদীমাতৃক দেশ তেমনি ছিল সুগভীর অরণ্যের বিপুল বিস্তার। খুব সহজেই অরণ্য সৃষ্টির অবকাশ ছিল এখানে কারণ প্রচুর রোদ বৃষ্টি এবং পলিমাটি পড়া উর্বর জমির জন্য। বিশেষত তখন জনসংখ্যা ছিল খুবই কম এবং সেই সময় বিপুল অরণ্যে ঘেরা ছিল চারিদিক। আর সেই অরণ্যে খুব বেশী পাওয়া যেত হাতী, হরিণ, সিংহ, শৃগাল, শশক আরও কতো প্রাণী। চর্যাপদে এসব প্রাণীর কথাও আছে। গঙ্গা নদীর নাম পাওয়া যায়।
” হরিণা হরিণির নিলঅ ণ জাণী ।।
হরিণী বোলই সুণ হরিণা তো। “( ৬ নং পদ)

“জিম জিম করিণা করিণিরে রিসই
তিম তিম তথতা মঅগল বরিসই।।”( ৯ নং পদ)

“গঙ্গা জউনা মাঝে রে বহই নাঈ।” (১৪ নং পদ)

খাদ্য:

খাদ্য মানুষের মৌলিক চাহিদা। তবে বাঙালীর প্রধান খাদ্য যে ভাত তা চর্যাপদেও স্পষ্ট। সেই সময় সমাজে মানুষ ভাত, মাছ, হরিণের মাংস, দুধ, ফলমূল ইত্যাদি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করত। তবে হরিণের মাংস ছিল তাদের পছন্দের খাবার। এছাড়া একশ্রেণির মানুষের মাদকাসক্তি ও নেশাগ্রস্ত ছিল। তৎকালীন সমাজে নৈতিক অবস্থা উন্নত না থাকায় আদিম যুগ থেকেই এখানে মদের ব্যবহার ছিল। মাদকাসক্তি ও নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির উন্মত্ত আচরণের স্পষ্ট ছবি চর্যাপদে ফুটে উঠেছে।
“এক সে শুন্ডিনী দুই ঘরে সান্ধই
চীঅণ বাকলত বারুণী বান্ধই।”( ৩ নং পদ)

একান্নবর্তী পরিবার:

শুধু স্বামী-স্ত্রী নিয়ে নয় তৎকালীন সময়ে মা, বাবা, পুত্র, বধূ, শ্বশুর, শাশুড়ি, ননদ, শালী প্রভৃতি আত্মীয়তাবাচক পাত্র-পাত্রী দ্বারা পরিবারের গঠন এবং অন্তঃপুরের জীবনচিত্র পাওয়া যায়।বর্তমান সমাজের মতো পরিবারের আর্দশ ছিল একান্নবর্তীত পরিবার। আবার চর্যাপদে মা, শ্বশুর, শাশুড়ী, ননদ ও শালীকে মেরে ফেলার ঘটনাও রয়েছে।
” মারি সাসু ননন্দ ঘরে সালী।
মাঅমারি কাহু ভইঅ কবালী।। ” (১১ নং পদ)

বিনোদন:

সেকালে সঙ্গীতচর্চার প্রচলন ছিল। এছাড়া মানুষ শত কষ্টের মধ্যেও একটু অবসর কাটিয়ে বিনোদন উপায় খুঁজে নিত। বর্তমান কালের মত সেকালেও নৃত্যগীতবাদ্য ও অভিনয়কলার ব্যাপক চর্চা ছিল। যা সেসময়ের মানুষের বিনোদনের খোরাক মেটাতে সহায়তা করতো। নৃত্য-গীত-অভিনয় ছাড়াও সেসময়ে বিভিন্ন ক্রীড়ার প্রচলন ছিল। বর্তমান সময়ের মতো জনপ্রিয় ক্রীড়া ছিল দাবা যা সেকালেও ছিল। অবসর সময়ে তারা তারা বিভিন্ন ক্রীড়া উপভোগ করে সময় কাটাতো।
” এক সো পদমা চউসট্ ঠী পাখুড়ি
তহি চড়ি নাচই ডোম্বি বাপুড়ি।। “( ১০ নং পদ)
” করূণা পীঢ়িহি খেলহু নঅবল। ” (১২ নং পদ)

গৃহপালিত পশু:

এছাড়াও সেকালেও গৃহপালিত পশুর মধ্যে গরুই ছিল যা বর্তমান কালেরও বিদ্যমান। বলদ ও গাভীর উল্লেখ পাওয়া যায় একাধিক চর্যায়। সেকালের গৃহপালিত পশুর মধ্যে ছিল হাতি যা অনুমান করা যায়।
“বলদ বিআএল গবিআ বাঁঝে। “(৩৩ নং পদ)

ধর্মমত:

সাহিত্যের ইতিহাসে চর্যাপদের যথার্থ মর্যাদা রয়েছে আবার লোকায়ত সমাজের সার্বিক চিত্রও চর্যাপদে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে ধর্মমতের বিষয়টিও এসেছে। বৌদ্ধ সহচার্যগণ তাদের ধর্মীয় রীতিনীতির নিগূঢ় রহস্য চর্যাপদের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। চর্যাপদের মাধ্যমে বৌদ্ধ সহচার্যগণ তাদের গোপন তত্ত্বদর্শন ও ধর্মচর্চাকে বাহ্যিক প্রতীকের সাহায্যে ব্যক্ত করেছেন। বৌদ্ধদের মহাযান ও সহজযানের কথা চর্যায় রয়েছে। মহাসুখ রূপ নির্বাণলাভ হলো চর্যার মূল ধর্মমত।

ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি:

তৎকালীন ধর্মীয় ও সামাজিক নানা আচার-বিচার, উৎসব-অনুষ্ঠান,ক্রিয়াকর্মের ও পরিচয় পাওয়া যায় চর্যার পদগুলিতে। “ডোম্বী বিবাহিআ অহারিউ জাম”- পদটিতে ধুমধাম করে বিবাহ অনুষ্ঠানের বর্ণনা পাওয়া যায়। উৎসব অনুষ্ঠানে ডমরু, মাদল, বাঁশী, বীণা প্রভৃতি বাদ্য বাজনা ও নৃত্যগীতের আয়োজন ও থাকতো। “নাচন্তী গাইল বাজন্তী দেবী” পঙ্কতিটি তারই সাক্ষ্যবাহী। তারা আনন্দে-উৎসবে একত্রে মেতে উঠতো সেসময়ে।

নারীর জীবন:

চর্যাপদে নারীর চিত্র চিত্রায়িত হয়েছে। এখানে নারীর যে চিত্র ফুটে উঠেছে তাতে বোঝা যায় নারী কোথাও অবহেলিত আবার কোথাও স্বাধীন সত্ত্বার অধিকারী। নারীর বিভিন্ন রূপের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এখানে। সংসারে নারীর অবদান যেমন আছে তেমনি তাদের প্রেম, বিরহ, বিবাহ, বিচ্ছেদ, পরকীয়া, অভিমান প্রভৃতি ফুটে উঠেছে। আবার চর্যাপদের বিভিন্ন পদে নারীর ব্যক্তিসত্ত্বার স্বীকৃতিও আছে।

চর্যাপদে তৎকালীন মানুষের জীবন ও সমাজ ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। চর্যাপদে শুধু উচ্চবিত্তেরই নয় অন্ত্যজ জীবনেরও বাস্তব চিত্র প্রস্ফুটিত হয়। তবে দেশের রাজনৈতিক মানুষের কথা এখানে পাওয়া যায় না তবে বিচার ব্যবস্থার বিষয়টি উল্লেখ আছে এখানে। ভণ্ড সাধু, চোর, চরিত্রহীন মানুষেরও উল্লেখ আছে। আবার সমাজের মধ্যে বিভেদ ছিল তা চর্যাপদে উল্লেখ রয়েছে। চর্যাপদে সাধনার ইঙ্গিত থাকায় সংসার জীবন অপেক্ষা যোগী জীবনকে বড় করে দেখানো হয়েছে। চর্যাপদের সামাজিক জীবনচিত্র খুব একটা সুখপ্রদ নয়। সর্বোপরি, চর্যাপদের মাধ্যমে জীবনের সার্বিক দিক ফুটে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button