বয়সভেদে বদলে যাওয়া কিছু বই

বয়স বাড়ার সাথে সাথেই বইয়ের প্রতি ভালোলাগারও ভিন্নতা দেখা যেতে শুরু করে। তাই আজকে আমরা নিয়ে এসেছি বয়সভেদে বদলে যাওয়া কিছু বই যা আপনার পাঠ যাত্রাকে আরো সমৃদ্ধ করে তোলবে।

বদলে যাওয়া কিছু বই

ছেলেবেলার শিশুসাহিত্য, রূপকথা আর রাজা-রানীর কাহিনি বাদ দিয়ে ভালো লাগতে শুরু হয় কিশোর ক্লাসিক, থ্রিলারধর্মী আর এডভেঞ্চার আছে এমন বদলে যাওয়া কিছু বই।

এরপর আরেকটু বড় হয়ে কিশোরী বয়সে পা রাখতে গিয়ে ভালোবাসা জন্মে প্রেমের উপন্যাস কিংবা ঝোঁক বাড়তে শুরু করে কবিতার প্রতি।

মঙ্গলপুর: জন-মানবশূন্য এক গ্রামের গল্পকথা!

সেই বয়স  থেকেই মূলত কবিতা উপলব্ধি করার একটা সময় শুরু হয়। এমন কিছু বইয়ের পাঠ পরবর্তী  অনুভূতি নিয়ে লিখছি—

মেমসাহেব

মেমসাহেব বইটি যেবার প্রথম পড়ি তখন আমার বয়েস অল্প। কিশোরী বয়স সবে, ক্লাস এইটে কি নাইনে পড়ি কেবল। বাড়িতে অনেক লুকিয়ে থাকা বইয়ের মাঝে তখন এই বইটা হুট করেই চোখে পড়েছিল।

বেশ পুরনো বই, আমাদের বাড়িতে আবার পুরনো বইয়ের ভান্ডার ছিল। কিছু খুঁজতে গিয়েই ডজনখানেক বই বেরিয়ে আসত। এই বইটিও সেভাবেই অন্য বই খুঁজতে এসে বেরিয়ে গেল।

কাগজটা বেশ পুরনো হয়ে গিয়েছিল দেখলাম, তবু লেখাগুলো এত গোটা গোটা যে পড়ার লোভ সামলাতে পারিনি। তাছাড়া প্রচ্ছদটাও এত দারুণ! দুপুরে ভাত খেয়ে স্কুল থেকে ফিরে ঘন্টা দুয়েক বিশ্রাম করার নিয়ম ছিল তখন। ওই সময়টাতেই গা এলিয়ে বই পড়তাম।

হয়তো কখনো কখনো বুকের ওপর বইটা রেখে কখন যে ঘুমিয়ে যেতাম, তাও স্মরণ হতো না।এই বইটাও সেরকমই এক দুপুরে পড়তে শুরু করেছি।

তখনও ভাবতে পারি নি বইটি জীবনে এত গভীর জায়গা করে রাখবে। পড়তে গিয়েই কাহিনীর ভাঁজে এত ডুবে গিয়েছিলাম যে রাত দিন এক করে একেবারে বইটা শেষ করে তবেই উঠলাম।

মেমসাহেব বইটি মূলত একটি পত্র উপন্যাস। উপন্যাসের নায়ক বাচ্চু, যিনি তার দোলাবৌদিকে পত্র লিখে জানিয়েছেন তার  জীবনের  কথা। জানিয়েছেন তার মেমসাহেবের কথা।

বইটিতে তার জীবনের শুরু থেকেই সবকিছু বর্ণনা করে চলেছেন একে একে,মা হারা তিনি কীভাবে বেড়ে উঠেছেন জীবনের সেই সূচনালগ্ন থেকে শুরু করে একে একে কিশোর, তরুণ বয়সের সমস্তটাই।

কৈশোর মনে দাগ কাটা চার বই

জীবনে নারীর সান্নিধ্য তিনি পাননি, নারী বলতে জীবনে একমাত্র যার পদচারণা ছিল তাকে তিনি পুরো পত্রতে সম্বোধন করে গেছেন মেমসাহেব হিসেবেই। মেমসাহেবের আসল নামটা অজ্ঞাত রেখেছেন পত্রের শেষ পাতাতেও।

জীবনে প্রতিটি মানুষই কিছু না কিছু গুরুত্ব বহন করে।তবে কেউ একজন থাকে যিনি বাকিদের সবার চাইতে আলাদা। মেমসাহেব ছিলেন তার জীবনের সেই একমাত্র আলো, একমাত্র ব্যক্তি।

ট্রেনের কামড়ায় একদিন আনমনেই  দেখা হয়ে যাওয়া কোন রমনী যে তার পুরো সত্ত্বা জুড়ে পরবর্তীতে বিরাজ করবে লেখক তা ভাবতে পারেননি।লেখকের জীবনের মানে খুঁজে দিয়েছিলেন তার মেমসাহেব।

প্রতিটি সফল পুরুষের পেছনে বলা হয় কোন নারীর হাত থাকে, লেখকের জীবনের সফলতার গল্পের পেছনে ছিলেন মেমসাহেব।

যার অগাধ বিশ্বাস, ভালোবাসা আর ত্যাগেই লেখক তার জীবনের সাফল্যের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছাতে পেরেছিলেন। চরম অনিশ্চয়তা জেনেও মেমসাহেব কখনো তাকে ছেড়ে যাননি,বরং আস্থা রেখেছেন।প্রেমিকা হয়েও সহর্ধমিনীর মতো পাশে থেকে সাহস জুগিয়ে গেছেন।

মেমসাহেবের প্রচেষ্টা আর বিশ্বাসই লেখককে প্রতিদিন একটু একটু করে নিজের গন্ডির বাইরে পা বাড়াতে সাহস জুগিয়েছিল।নিজেকে পরীক্ষা করার সুযোগ করে দিয়েছিল।যার এক পর্যায় সফলতা,যশ,খ্যাতি এসে ধরা দিলেও জীবন নামক গল্পের মোড় ঘুরে যায় ভিন্ন দিকে।

জীবনে সবকিছু পেয়েও সবকিছু হারিয়ে যাওয়ার এক নিপুণ আর নিখুঁত উপন্যাস মেমসাহেব।

মেমসাহেব নিমাই ভট্টাচার্য রচিত এক অপূর্ব উপন্যাস।বইটির প্রচ্ছদ করেছিলেন অজিত গুপ্ত।বইটির প্রথম সংস্করণ হয় ১৯৮৫ সালে।এরপর বহুবার এর সংস্করণ এসেছে।

তাঁর রচিত প্রথম বই ‘রাজধানীর নেপথ্যে’, প্রকাশিত হয় ১৯৬৪ সালে।তবে ১৯৬৮ সালে ‘মেমসাহেব’ প্রকাশিত হবার পরেই তিনি পাঠকসমাজে  বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।’মেমসাহেব’ বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান লাভ করে।

হায়ারোগ্লিফের দেশে

প্রাচীন মিশর আর তার মমি রহস্য বরাবরই আমার কাছে ছিল এক অজানা বিস্ময়। মাঝেমাঝে বন্ধুদের সাথে এ ব্যাপারে বেশ আড্ডা হতো।

তবে যেটুকু জানতে পারতাম তার চাইতে রহস্য আর ভীতির সঞ্চারই বেশি হতো। অত অল্প জানায় যে মন তৃপ্তও হতো না, তাইতো রহস্য উন্মোচনের আগ্রহ থেকেই প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার কোন বই সামনে আসলেই গোগ্রাসে পড়ে ফেলতাম।

কলেজের গন্ডি পেরোতে গিয়ে ততদিনে আমি মিশর সভ্যতার বেশকিছু রহস্য বিশেষ করে মূল আকর্ষন মমি রহস্য উন্মোচন করে ফেলেছিলাম বলা চলে।

তবে গত বছরে বেশ ভালো একটি বই পড়েছি, যাতে মমি খাওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর তথ্য ছিল।

মমি নিয়ে নানা তথ্য জানলেও মমি খাওয়ায় মতো ব্যাপার আগে শুনিনি,তাইতো গা গুলিয়ে ওঠার উপক্রম হলো।এমন সব অজানা তথ্য দিয়ে মোড়ানো বইটি হলো  অনিবার্ণ  ঘোষ রচিত হায়ারোগ্লিফের দেশে।বাংলা সাহিত্যে মিশরীয় সভ্যতা নিয়ে হয়ত বহু বই পড়েছি,তবে এই বইটির উপস্থাপন বেশ সুখপাঠ্য।

পার্শিয়ান পাহাড়গুলোতে একরকমের বিটুমিন পাওয়া যেত,যার নাম মামিয়া।

গ্রিক ডায়োস্কোরিডেস তাঁর বইতে মামিয়াকে মমি বলে ভুল করেন।সেই বইটাকে  অনুসরণ করে ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে এই অদ্ভুত ঔষধ ব্যবহারের ধুম পড়ে যায়। ১৫৮৬ সালে ব্রিটিশ মার্চেন্ট জন স্যান্ডারসন জাহাজে করে ৫০০ কিলো মমি নিয়ে আসেন লন্ডনে। সে গুলোকে গুঁড়ো করে সেই পাউডারের সঙ্গে আরও কিছু মসলা আর হার্বস মিশিয়ে আজগুবি ওষুধ তৈরি হতো।

সেই ওষুধ নাকি ফোঁড়া থেকে শুরু করে   প্যারালাইসিস পর্যন্ত সারিয়ে দেয়। আর যিনি  এই ঔষধের বিজ্ঞাপন করেছিলেন  তার নামটা শুনলে চমকে যেতে হয়, তিনি ছিলেন ফ্রান্সিস বেকন। যিনি সেইসময়কার বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক।

সেসময় মানুষ চড়া দামে পাগলের মতো এই ওষুধ কিনত। একসময় চাহিদা এত বেড়ে গিয়েছিল যে শেষের দিকে বেওয়ারিশ মৃতদেহ তুলে এনে  ব্যান্ডেজ করে আবার মাটিতে পুঁতে কিংবা রোদে শুকিয়ে গুঁড়িয়ে বিক্রি করতো। আর এসব চলতে থাকে আরো ২০০ বছর পর্যন্ত!

মমি সম্পর্কিত সকল  অজানা তথ্যগুলো জানতে  তাই হায়ারোগ্লিফের দেশে বইটি বেশ কার্যকর। পিরামিড, সাদা পোশাক পরা বেদুইন, বালি  আর মিসরের সমস্ত রহস্যময়ী  সব তথ্য দিয়ে মোড়ানো এই বই।

ইন্দুবালা ভাতের হোটেল

কল্লোল লাহিড়ী রচিত ইন্দুবালা ভাতের হোটেল বইটিও গতবার পড়েছি।বহুদিন পর যেন মরুভূমিতে  খরা কাটিয়ে পানির দেখা পেয়েছি, বইটি পড়ে এমনই এক অনুভূতি হয়েছিল।

এত সহজ, সাবলীল ভাষায় একজন বৃদ্ধার চোখে দুই বাংলার বিভেদ, ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা, ত্যাগ, লড়াই আর ঘুরে দাঁড়াবার গল্প তুলে ধরেছেন তা অনবদ্য।

খুলনার মেয়ে ইন্দুবালাকে বিয়ে দেওয়া হয় কোলকাতার এক পরিবারে। তিন সন্তান রেখে দোজবরে, মাতাল  স্বামীর প্রয়াণে ইন্দুবালা যখন দিশেহারা প্রায়, তখনি ছেলেবেলায় মায়ের কিংবা ঠাকুমার হাতের খাবারের স্বাদ আর স্মৃতি বুকে ধরেই তার যাত্রা শুরু হয় ইন্দুবালা ভাতের হোটেল দিয়ে।

রান্না এক প্রাচীন শিল্প, যা আঁকড়ে ধরেই ইন্দুবালা দেহে সাদা থান পেচিয়েও নিজের ভাগ্য লিখেন।

ইন্দুবালার ভাতের হোটেলে রোজ  রান্না হয়,ইন্দুবালা নিজ হাতে রান্না করেন বিউলির ডাল,মালপোয়া,আলুপোস্ত,আমড়ার চাটনি,কুমড়োর ছক্কা সহ আরও কত কি।এভাবেই সংসারের হাল ধরতে গিয়ে সত্তর বছরের ইন্দুবালা ফিরে তাকান তার খুলনায় কাটানো রঙিন দিনগুলোর দিকে।একবার, শুধু একবার  ফিরে আসতে চান বাংলাদেশে।

নারীরাই বেশি ভিটামিনের অভাবে ভোগেন!

শৈশবের স্মৃতিতে হারিয়ে যাওয়া ইন্দুবালার চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে, উনুনের গরম আঁচে তা কোথায় যেন আবার মিলিয়েও যায়।

ইন্দুবালা রাজনীতি, সমরনীতি বোঝে না। সে বোঝে মনের আকুতি। পেট পুরে তৃপ্তির ঢেকুর তোলা মানুষের মুখের হাসি।

বয়সভেদে বদলে যাওয়া কিছু বই ২য় পর্ব পড়তে অপেক্ষা করুন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button

Adblock Detected

Dear Viewer, Please Turn Off Your Ad Blocker To Continue Visiting Our Site & Enjoy Our Contents.