ফিচার

প্রয়াণ দিবসে ড. এপিজে আবদুল কালাম!

“কথায় আছে, ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর’।

বিশ্বাস করলেই সব সম্ভব। অসম্ভব তখনই হয়ে যায় যখন আমরা বিশ্বাস করতে পারি না!”

সাফল্য তখনই ধরা দেয় যখন আমরা নিজেদের প্রতি বিশ্বাস রাখি, আস্থা রাখি। আজ পর্যন্ত পৃথিবীর যে প্রান্তে যিনি যত বড়োই কাজ করেছেন, তা হয়েছে বিশ্বাস এর মাধ্যমেই।

নিজের প্রতি আস্থা আর বিশ্বাস রেখেছেন বলেই নিজ মেধাকে পরিশ্রমের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছেন। বাধা-বিপত্তি জয় করে ঠিক লক্ষ্যে পৌঁছে গেছেন।

একটি বিশ্বাস, একটি লক্ষ্য এবং অক্লান্ত পরিশ্রমই তাদেরকে তাদের লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছে। তাই বাধা-বিপত্তি জয় করে ঠিক লক্ষ্যে পৌঁছে যাওয়া এমনই এক ব্যক্তিত্বের জীবনাদর্শ আজ তুলে ধরব তার প্রয়ান দিবসে। এপিজে আবদুল কালাম – একজন বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি!

‘সমাজকে বদলাতে পারেন তিনজন মানুষ। বাবা, মা এবং শিক্ষক!’

এপিজে আবদুল কালাম

এপিজে আবদুল কালাম ১৯৩১ সালের ১৫ই অক্টোবর ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের রামেশ্বরমে সাধারন এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাদের পরিবারে দারিদ্রতা ছিল, ছিল অর্থকষ্ট, তবু পিতার মননের প্রাচুর্য ছিল অঢেল।

আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে আর পাঁচটা সাধারণ পরিবারের মতো হলেও জীবনবোধে সে পরিবার ছিল অসাধারণ।

তাইতো ছোটোবেলাতেই পারিবারিক প্রভাব, তার মনে গেঁথে দিয়েছিল বড় এবং ভালো মানুষ হওয়ার স্বপ্ন।

পরিবারের কাছ থেকেই তিনি নৈতিকতার শিক্ষা ও চেতনায় উদ্ভুদ্ধ হয়েছিলেন।

আরও পড়ুন: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মৃত্যুর জন্যে আইপিএল-ই দায়ী : ইংলিশ অধিনায়ক

তাই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, “দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে এবং মানুষগুলোকে সুন্দর মনের করে গড়ে তুলতে পারেন সমাজের তিনজন মানুষ—-বাবা, মা ও শিক্ষক।”

আর আধুনিক মানুষের মধ্যে নৈতিক শক্তির জাগরণের লক্ষ্যে তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তরুণ প্রজন্মকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারলে দেশ দুর্নীতিমুক্ত হবে।

তাইতো সবার প্রতি তার আহবান ছিল, তরুণ প্রজন্মকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে।

রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন এপিজে আবদুল কালাম

ভারতের রাষ্ট্রপতি দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে তিনি যেদিন প্রথম রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রবেশ করেছিলেন ; তার সাথে ছিল তার ব্যক্তিগত কিছু জিনিস , বইপত্র ও কেবল দুটো সুটকেস।

তিনি যেদিন রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে বেরিয়ে এলেন সেদিনও তার সাথে সুটকেস মাত্র দুটোই ছিল। দায়িত্বরত অবস্থায় তিনি যত উপহার-উপঢৌকন পেয়েছিলেন তার কিছুই তিনি সাথে নেননি।

বরং অবলীলায় সেগুলো ফেলে রেখে এসেছিলেন । এতে তার বক্তব্য ছিল, এর কিছুই ব্যক্তি কালামের নয়। সবই দেওয়া হয়েছে ভারতের রাষ্ট্রপতির সম্মানে।

তাই এসব উপহার রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে থাকা উচিত। এক্ষেত্রে তিনি তার নৈতিক শিক্ষার অপূর্ব উদাহরণ উপস্থাপন করেছিলেন।

২০০৭ সালে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পূর্ণ করার পরে তিনি সমগ্র ভারতবর্ষ চষে বেড়িয়েছেন শিশু -কিশোর ও তরুণসমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে, নৈতিকতার শিক্ষা দিতে।তিনি আজন্ম তার মহৎ লক্ষ্যের পেছনে ছুটে গেছেন, সেজন্যেই কাজ করে গেছেন।

এক মুহুর্তের জন্যেও থেমে থাকেননি, পিছপা হননি। নিজের স্বপ্ন তরুণ সমাজের চোখেও বুনে দিয়েছেন, জাগ্রত করেছেন। তাদের নিরন্তর পথচলায় পথ প্রদর্শক হয়ে পাশে থেকেছেন।

তিনি ছিলেন কর্মে বিশ্বাসী মানুষ, কর্মই ভাগ্য বদলাতে পারে তিনি তা দেখিয়ে দিয়েছেন।

কাজই ছিল তার আনন্দ। তার অনুরোধ ছিল—
“আমার মৃত্যুতে ছুটি ঘোষণা করো না। আমাকে যদি ভালোবাসো, একদিন বরং অতিরিক্ত কাজ করো।”

আরও পড়ুন: প্রোডাক্টিভ মুসলিম বই রিভিউ!

ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট বিজ্ঞানের প্রসারে তার অবদান অতুলনীয়। তিনি শুধু একজন বরেণ্য ব্যক্তি, বিজ্ঞানীই ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত সমাজসংস্কারক ও কল্যাণচিন্তক।

এপিজে আবদুল কালাম রচিত বইসমূহ

উইংস অব ফায়ার, ইগনাইটেড মাইন্ডস, ইনডমিটেবল স্পিরিট, ইউ আর বর্ণ টু ব্লোজম, মাই জার্নি, টার্নিং পয়েন্ট এর মতো বইয়ের রচয়িতা ছিলেন তিনি। যা মানুষকে বিশ্বাস ও আশার নতুন পথ তৈরি করে দিয়েছিল।

কালাম মানে কী?

তার নাম “কালাম” শব্দের অর্থ বাণী।যা তার পুরো জীবনের প্রতিচ্ছবি বলা যায়। তার পুরো জীবনই ছিল একটা বাণী, কেননা উনি যা বলে ও করে গেছেন তা আজ গোটা বিশ্ব অনুসরণ করার চেষ্টা করে।

শত কোটি মানুষের প্রেরণার উৎস তিনি।জীবনকে নতুন আঙ্গিকে দেখার ও ভাবার সুযোগ তিনিই করে দিয়েছিলেন। দেশকে বদলে দেওয়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন তা আজও মানুষের কাছে সবকিছুর ঊর্ধ্বেই আছে।

এই মহান ও গুণী ব্যক্তিত্ব ২০১৫ সালের ২৭ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। প্রয়ান দিবসে এই গুনী ব্যক্তিকে আমরা চির শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি।

লিখেছেন: জান্নাতুল ফেরদৌস [শিক্ষার্থী ও সমাজকর্মী]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button