ফিচারবিখ্যাত ব্যক্তি

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর: বাংলার মহাপণ্ডিত!

১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্ম নিলো একটি শিশু। তার পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ। তিনি শিশুপুত্রের নাম রাখলেন, ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। পরবর্তীতে তিনিই হয়ে ওঠেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। যার পাণ্ডিত্য দুই বাংলার মানুষ মনে রাখবে চিরকাল। চলুন আজ জেনে নিই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

জন্ম ও পরিচয়:

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। মায়ের নাম ভগবতী দেবী। বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের আদি নিবাস ছিল অধুনা হুগলি জেলার বনমালীপুর গ্রাম। ঈশ্বরচন্দ্রের পিতামহ রামজয় তর্কভূষণ ছিলেন সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে সুপণ্ডিত ব্যক্তি। তিনিই ঈশ্বরচন্দ্রের নামকরণ করেছিলেন। ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতায় স্বল্প বেতনের চাকরি করতেন। ঈশ্বরচন্দ্র মায়ের সঙ্গে গ্রামেই বেড়ে উঠতে থাকেন।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
ভগবতী দেবী
ভগবতী দেবী

শিক্ষাজীবন:

পাঁচ বছর বয়সে ঈশ্বরচন্দ্র গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি হন। কিন্তু সেই পাঠশালার শিক্ষক সনাতন বিশ্বাস ঈশ্বরচন্দ্রের প্রতি সদয় আচরণ করেননি। যে কারণে ১৯২৮ সালে আট বছর বয়সে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কলকাতার একটি পাঠশালায় ভর্তি হন। ১৯২৯ সালে পাঠশালায় শিক্ষা সমাপ্ত হলে তিনি ভর্তি হন সংস্কৃত কলেজে (বর্তমানে সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুল) সেখানে ব্যাকরণের তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন তিনি। তার বয়স তখন নয় বছর। বিদ্যাসাগরের আত্মকথা থেকে জানা যায়, মোট সাড়ে তিন বছর তিনি ওই শ্রেণিতে অধ্যয়ন করেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান ছাত্র এবং ১৮৩৯ সালের মধ্যেই ”বিদ্যাসাগর” উপাধি লাভ করেন। পরে তিনি দু-বছর ওই কলেজে ব্যাকরণ, সাহিত্য, অলঙ্কার, বেদান্ত, ন্যায়, তর্ক, জ্যোতির্বিজ্ঞান, হিন্দু আইন এবং ইংরেজি বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। তাছাড়া প্রতি বছরই তিনি বৃত্তি এবং গ্রন্থ ও আর্থিক পুরস্কার পান।

কর্মজীবন:

১৮৪১ সালে সংস্কৃত কলেজে শিক্ষা সমাপ্ত হবার পর সেই বছরই ২৯ ডিসেম্বর মাত্র একুশ বছর বয়সে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান পণ্ডিতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি কলেজের অনেক সংস্কার করেন। এর আগে এ কলেজে পড়ার অধিকার ছিল কেবল ব্রাহ্মণ ছাত্রদের। তিনি সব শ্রেণির হিন্দুদের জন্যে এ কলেজের দ্বার উন্মুক্ত করেন। তিনি কলেজে পড়ার জন্যে নামমাত্র বেতন চালু করেন এবং প্রতিপদ ও অষ্টমীর বদলে রবিবার সপ্তাহিক ছুটি চালু করেন। কলেজের ডিগ্রি নিয়ে যাতে ছাত্ররা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদ লাভ করতে পারে, সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি সে প্রতিশ্রুতিও আদায় করেন। কিন্তু তিনি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনেন কলেজের পাঠ্যক্রমে। পূর্বে ব্যাকরণ এবং বীজগণিত ও গণিত শেখানো হতো সংস্কৃতে, কিন্তু তিনি সংস্কৃতের বদলে ব্যাকরণ বাংলার মাধ্যমে এবং গণিত ইংরেজির মাধ্যমে পড়ানোর নিয়ম চালু করেন। ইংরেজি ভাষা শেখাকে তিনি বাধ্যতামূলক করেন এবং ইংরেজি বিভাগকে উন্নত করেন। বাংলা শিক্ষার ওপরও তিনি জোর দেন। তবে তারচেয়ে ব্যাপক পরিবর্তন করেন দর্শন পাঠ্যক্রমে। তিনি সাংখ্য এবং বেদান্ত দর্শনকে ভ্রান্ত এবং প্রাচীনপন্থী বলে বিবেচনা করতেন। সে জন্যে, তিনি বার্কলের দর্শন এবং অনুরূপ পাশ্চাত্য দর্শন শিক্ষাদানের বিরোধিতা করেন এবং তার পরিবর্তে বেকনের দর্শন এবং জন স্টুয়ার্ট মিলের তর্কশাস্ত্র পড়ানোর সুপারিশ করেন। অনেকে তাঁর সমালোচনা করলেও, তাঁর এ সংস্কার ছিল সুদূরপ্রসারী এবং শিক্ষা পরিষদ তাঁর এ সংস্কারের প্রশংসা করে এবং পুরস্কারস্বরূপ ১৮৫৪ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁর বেতন বৃদ্ধি করে।

শিক্ষার আধুনিকায়ন ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর:

১৮৫৪ সালে চার্লস উডের শিক্ষা সনদ গৃহীত হওয়ার পর সরকার গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেয়। এ উদ্দেশে ১৮৫৫ সালের মে মাসে বিদ্যাসাগরকে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদের অতিরিক্ত সহকারী স্কুল পরিদর্শকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তিনি নদিয়া, বর্ধমান, হুগলি এবং মেদিনীপুর জেলায় স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। দুবছরের মধ্যে তিনি এ রকমের বিশটি স্কুল স্থাপন করেন। এছাড়া তিনি এসব স্কুলে পড়ানোর জন্যে, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য একটি নর্মাল স্কুল স্থাপন করেন। তিনি নিজ গ্রামে নিজ খরচে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

এসব বাংলা মডেল স্কুল ছাড়া, সরকার বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনেরও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তখন রক্ষণশীল সমাজ মনে করতো যে, স্ত্রীশিক্ষা দেওয়া নিষিদ্ধ। সমাজের তীব্র বিরোধিতার মুখে এ ধরনের স্কুল প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে কিনা—সরকার সে সম্পর্কে নিশ্চিত ছিল না। অন্যদিকে, বিদ্যাসাগর ছিলেন স্ত্রীশিক্ষার বিশেষ সমর্থক। সরকার সেজন্যে এ কাজের দায়িত্ব দেয় তাঁর ওপর। তিনি বালিকা বিদ্যালয় খোলার বিষয়ে স্থানীয় লোকদের সমর্থনে বর্ধমানে একটি স্কুল স্থাপন করেন। পরে ১৮৫৭ সালের নভেম্বর থেকে ১৮৫৮ সালের মে মাসের মধ্যে আরও পঁয়ত্রিশটি স্কুল স্থাপন করতে সমর্থ হন।

আরও পড়ুন# যেভাবে গদি হারালেন বরিস জনসন!

কিন্তু শিক্ষা কর্তৃপক্ষের পরিচালকের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার কারণে তিনি এ কাজ বেশিদিন চালিয়ে যেতে পারেননি। তাই তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদ এবং স্কুল পরিদর্শকের পদ-উভয় ত্যাগ করেন। এ রকমের উচ্চপদে বাঙালিদের মধ্যে সম্ভবত তিনিই অধিষ্ঠিত ছিলেন। পরে শিক্ষা সম্প্রসারণের কাজে, বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষা দেওয়ার কাজ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করেন। এ সময়ে তিনি বেথুন সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত হন। এই সোসাইটির কাজ ছিল স্ত্রীশিক্ষা বিস্তার এবং পরিবার ও সমাজে নারীদের মর্যাদা বৃদ্ধির। তিনি স্কুল স্থাপনের জন্যে ধনী জমিদারদেরও উৎসাহ প্রদান করেন।

ধনী পরিবারের ছেলেদের ইংরেজি শেখানোর উদ্দেশে ১৮৫৯ সালে কলকাতা মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন স্থাপিত হয়। কিন্তু দুবছরের মধ্যে এ স্কুল বন্ধের উপক্রম হলে বিদ্যাসাগর এ স্কুল পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৮৬৪ সালে তিনি এর নাম রাখেন হিন্দু মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউট। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি নিয়ে তিনি এ স্কুলে এন্ট্রেন্স পরীক্ষার জন্য ছাত্রদের শিক্ষা দিতে থাকেন এবং ক্রমান্বয়ে সাফল্য লাভ করেন। ১৮৭২ সালের গোড়ার দিকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এ বিদ্যালয়কে কলেজ এবং ১৮৭৯ সালে ডিগ্রি কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ:

শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো পাঠ্যপুস্তক রচনা ও প্রকাশ করা। ১৮৫১ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ‘বিদ্যাসাগর’ নামে একটি পুস্তক রচনা করেন। এটি প্রকাশের আগ পর্যন্ত প্রথম শিক্ষার্থীদের জন্যে এ রকমের কোনো আদর্শ পাঠ্যপুস্তক ছিল না। তাঁর বর্ণপরিচয়ের মান এতো উন্নত ছিল যে, প্রকাশের পর থেকে অর্ধশতাব্দী পর্যন্ত এই গ্রন্থ বঙ্গদেশের সবার জন্যে পাঠ্য ছিলো। দেড়শো বছর পরেও এখনও এ গ্রন্থ মুদ্রিত হয়। বর্ণপরিচয়ের মতো সমান সাফল্য লাভ করেছিল বোধোদয় (১৮৫১), কথামালা (১৮৫৬), চরিতাবলী (১৮৫৬) এবং জীবনচরিত (১৮৫৯)। সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা ও (১৮৫১) বর্ণপরিচয়ের মতো অভিনব— এর আগে বাংলা ভাষায় কোনো সংস্কৃত ব্যাকরণ ছিল না। চার খন্ডে লেখা ব্যাকরণ কৌমুদীও (১৮৫৩-৬৩) তাঁর ব্যাকরণ রচনার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক অবদান।

বর্ণপরিচয়
বর্ণপরিচয়

নারী শিক্ষায় অবদান ও বিধবা বিবাহের প্রচলনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর:

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নারীশিক্ষায় অগ্রগণ্য ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ছিলেন। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ও তৎকালীন সমাজ সংস্কারকরা নারী শিক্ষা বিস্তার নিয়ে জনমত তৈরি করেন। এছাড়াও সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে এবং বিধবা বিবাহের পক্ষে সরব হন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি শাস্ত্রীয়ভাবে বিধবা বিবাহের বৈধতার প্রমাণ দেন। বিধবাদের পুনর্বিবাহ প্রবর্তনের পক্ষে একটি আইন প্রণয়নের জন্যে তিনি সামাজিক আন্দোলন আরম্ভ করেন। তিনি এর পক্ষে বহু স্বাক্ষরসংবলিত একটি আবেদনপত্র সরকারের কাছে পাঠান। পরে এরকমের আরও ২৪টি আবেদনপত্র সরকারের কাছে পাঠানো হয়। অনেকগুলি আবেদনপত্র আসে ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চল থেকে। এসব আবেদনপত্রে প্রায় পঁচিশ হাজার স্বাক্ষর ছিল। অপরপক্ষে, রক্ষণশীল সমাজ আইন প্রণয়নের বিরোধিতা করে সরকারের কাছে আঠাশটি আবেদনপত্র পাঠান। বিরোধীদের পক্ষেই পাল্লা ভারী ছিল, তা সত্ত্বেও ১৮৫৬ সালের জুলাই মাসে বিধবাবিবাহ আইন পাশ হয়। বিদ্যাসাগর এবং তাঁর বন্ধুরা মিলে ১৮৫৬ সালের ডিসেম্বর মাসে রক্ষণশীল সমাজের বিক্ষোভ এবং প্রচন্ড বাধার মুখে ঘটা করে এক বিধবার বিবাহ দেন। পাত্র ছিল সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগরের একজন সহকর্মী। তাছাড়া নিজের একমাত্র পুত্রের সঙ্গেও এক বিধবার বিবাহ দেন তিনি। বিধবাবিবাহ আইন প্রণয়নে সাফল্য লাভ করায় পরে কুলীনদের বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ রোধ আইন পাস করার পক্ষে সরকারের কাছে আবেদন জানান।

বৈবাহিক জীবন:

১৮৩৪ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিয়ে করেন। সেসময় তার বিয়ের কোন ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু পিতার অনুরোধ রাখতে তিনি বিয়ে করতে রাজি হন। তার স্ত্রীর নাম ছিল দিনময়ী দেবী। দিনময়ীর দেবী সাথে বিয়ের পর বিদ্যাসাগরের লেখাপড়া এবং অন্যন্য কাজে মনোযোগ বাড়ে। নানা দিক থেকে উন্নতি করেন।

আরও পড়ুন# নকশি পাখা: সুতোয় গাঁথা স্বপ্ন যেন!

বিদ্যাসাগরের মনে কোনরূপ ধর্মীয় গোঁড়ামি না থাকলেও স্ত্রীর সাবীত্রী ব্রত উদযাপনে সর্বদা সহায়তা করেছিলেন।

মৃত্যু:

১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মৃত্যুবরণ করেন। এরমাধ্যমে শেষ হয় ঈশ্বরচন্দ্রের মহিমান্বিত জীবনের। তার মরদেহের সৎকার হয়েছিল কলকাতার নিমতলা ঘাটে।

শেষ কথা:

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন বাংলার কুসংস্কারচ্ছন্ন সমাজের এক আলোর দিশারি। তিনি তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞাবলে জয় করে নিয়েছেন মহাকাল। এই বাংলা যতদিন থাকবে, ততদিন তিনি বেঁচে থাকবেন কোটি বাঙালির হৃদয়ে। বাংলার মেয়েদের আজকের এই অগ্রযাত্রার জন্যে আমরা ঈশ্বরচন্দ্রের কাছে চিরঋণী হয়ে থাকব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button