প্রযুক্তিফিচারবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

কৃষি খাতে প্রযুক্তির বিপ্লব!

প্রযুক্তির রমরমা ব্যবহারে দিনকে দিন বদলে যাচ্ছে কৃষি খাতের চিত্র। বীজতলা থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি। গত দুই যুগ আগের কৃষি কাজের সাথে বর্তমান সময়ের তুলনা করলে বিস্তার ফারাক লক্ষ্য করা যায়। কৃষকের লাঙল-জোয়াল আর হালের বলদের জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে আধুনিক লাঙল ট্রাক্টর, কম্বাইন্ড হার্ভেপার, পাওয়ার টিলার,  ব্রডকাস্ট সিডার পাওয়ার রিপার মেশিন। আবার বীজ বপন থেকে নিড়ানি, সার দেয়া, কাটা, মাড়াই, ফসল ঝাড়া ও প্যাকেটিং – সব কিছুতেই প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পুরাতন কালের নীতি বদলেছে। ফলে একদিকে যেমন সাশ্রয় হচ্ছে সময় অন্যদিকে কৃষি হচ্ছে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষিতে প্রযুক্তির এ বিপ্লব একদিনে আসেনি। দীর্ঘ সময় ধরে নানা গভেষণা, নানা পট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান সময়ে এসে পৌঁছেছে।

শুরুর কথা

মানুষ কৃষিকাজ শুরু করে সেই আদিমকাল থেকেই। মানব সভ্যতা বিস্তারের প্রথম দিকে যখন স্বীকারকৃত পশু আর ফলফলাদিই ছিল মানুষের খাদ্যের একমাত্র পন্থা, তখন পুরুষরা লোকালয় ছেড়ে অনেক দূরে যেতো খাবার সংগ্রহ করতে। নারীরা থাকতো বাসস্থান গুহাতে। এই গুহাবাসী নারীরাই প্রথম কৃষির উদ্ভাবন করে।

নারীরা প্রথম কৃষি কাজ শুরু করেছিল

তখন থেকেই কৃষি কাজের প্রচলন শুরু হলেও গত দুই তিন শতাব্দী আগ পর্যন্ত কৃষিকাজ সম্পাদিত হতো সেই প্রাচীন পন্থায়। যখন ইউরোপীয় উপমহাদেশে রেনেসার বিপ্লব ঘটলো, বাষ্প ইঞ্জিনের চালু হলো তখন থেকে শুরু হলো কৃষির আধুনিকায়ন। প্রথম দিকে কেবল নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দিকে নজর দিয়ে প্রযুক্তির বিকাশ ঘটে। তাই কৃষির অগ্রযাত্রা খুব বেশি একটা ঘটার সুযোগ পায়নি। কিন্তু গত শতাব্দীতে খুব দ্রুত গতিতে কৃষি প্রযুক্তির বিকাশ ঘটে। কেবল হাতিয়ার বা যন্ত্র নয়, নতুন নতুন জাতের বীজ, নতুন উৎপাদন পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়।

আরও পড়ুন# নারীরাই বেশি ভিটামিনের অভাবে ভোগেন!

বর্তমান কৃষি প্রযুক্তি

১৯৬১ সালে বিশ্বের মোট খাদ্য উৎপাদন ছিল ৭৪১.৪৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন। ২০২১ সালে সে সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২৭৬৯.২ মিলিয়ন মেট্রিক টন। এই সময়ে প্রতি বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১.৭ ভাগ। সেই অনুপাতে খাদ্য শস্য বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২ গুন। এ দ্বারা বোঝা যায় বিশ্ব এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ! পৃথিবীর মোট জমি বৃদ্ধি পায়নি, কিন্তু জনসংখ্যা বেড়েছে বছরে প্রায় দুই গুণ। তারপরেও মোট হিসাবে পৃথিবীতে খাদ্যের ঘাটতি নেই বরং উদ্বৃত্ত থেকে যাচ্ছে কিছু অংশ। এ তথ্য থেকে বোঝা যায় বর্তমান কৃষিতে কি পরিমাণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। উৎপাদন বাড়াতে নানা কৃত্রিম জাতের ফসল লাগানো হচ্ছে। আগে এক জমিতে বছরে দুই থেকে তিনবারের বেশি ফসল ফলানো যেতো না, এখন বছরের প্রত্যেক মাসেই ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে। এমনকি মৌসুমি ফসলকেও ১২ মাস চাষ করা যাচ্ছে। এবার আসি ফসল উৎপাদন প্রক্রিয়ার দিকে। আগে কৃষকদের রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে জমিতে বীজ বপন করতে হতো। বর্তমানে এই দায়িত্ব নিয়েছে সিড রিপার মেশিন। জমি চাষ করতে ব্যবহৃত হচ্ছে পাওয়ার টিলার, ট্রাকটার গাড়ি। ফসলের রোগ প্রতিরোধে দেওয়া হচ্ছে প্রতিরোধি ঔষধ আবার স্বল্প জমিতে অধিক ফলন পেতে প্রয়োগ করা হচ্ছে নানা জৈব-অজৈব সার। ফসলের জিন গত পরিবর্তণেও মিলেছে দারুণ সাফল্য। এক কথায় গোটা উৎপাদন ব্যবস্থায়-ই হয়ে গেছে এখন প্রযুক্তি নির্ভর।

হাইব্রিড বীজ ব্যবহারে স্বল্প জমিতে আধিক ফসল হচ্ছে

আধুনিক ধান কাটা যন্ত্র

আগামীর প্রযুক্তি

ভবিষ্যৎ কৃষিপ্রযুক্তির সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো ন্যানো প্রযুক্তি। বহিঃবিশ্বে ন্যানো প্রযুক্তি নিয়ে ইতিমিধ্যে কাজ শুরু হয়ে গেলেও বাংলাদেশের কৃষিবিদ গণ বিষয়টির সাথে খুব বেশি পরিচিত নন। ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহার করে আগের থেকে খুব সহজ উপয়ে ফসলের রোগ নির্ণয়, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, ন্যানো ফার্টিলাইজার, ন্যানো পেস্টিসাইড, ন্যানো হার্বিসাইড এর মতো কাজ করা যাবে।

ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহারে বদলে যাবে কৃষি

এছাড়াও ফুড প্যাকেজিং, মৃত্তিকা দূষণ নির্ণয় ও দূরীকরণ, ফসল উন্নয়ন (জাত), জলবায়ু পরিবর্তনে উদ্ভিদে অভিঘাত সহনশীলতা বৃদ্ধি, সেচের ক্ষমতা বৃদ্ধির মত কৃষির নিত্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। কৃষিতে যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। তাই ধারণা করা হচ্ছে আগামীতে গোটা বিশ্বের কৃষি কাজকে যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে খুব সহজেই সমন্বয় করা যাবে। যা বৈশ্বিক উৎপাদন বৃদ্ধিতে দারুণ সহায়ক হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button