ধর্মমোটিভেশনশিল্প ও সাহিত্য

বাবার চিঠি | আবুল হাসনাত বাঁধন

বাবার চিঠি | আবুল হাসনাত বাঁধন

আম্মু হঠাৎ ২০০০ সালের একটা চিঠি হাতে ধরিয়ে দিলো। আব্বুর লেখা। গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়লাম চিঠিটা। পড়ার পরে তব্দা খেয়ে গেলাম। চোখ ছলছল করছে।

আম্মার জন্য লেখা অংশের কয়েকটি লাইন ছিল →

‘ওইদিন বিদায় নেবার পর কেমন লাগছিল, তা এমন কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না প্রকাশ করার জন্য। বিদায় যে এমন বেদনার হয়, এত দুঃখ, এমন যে কষ্টের, তা আগে কখনো অনুভব করিনি এই ভাবে।

***, জিয়াতের কথা, জিয়াতের চলা, ওর চেহারা, দুষ্টুমি সব কিছু আমি এক মিনিটের জন্যেও ভুলতে পারছি না। মনে হয়, জিয়াতের সব কিছু আমাকে বিদেশে থাকতে দেবে না। তার পরেও যদি সুখের আশায় থাকতে হয়, অনেক কষ্ট বুকে নিয়ে থাকতে হবে।

***, জিয়াতের দিকে খেয়াল রাখবে। ***, আমি কোনো দিনও ভাবি নাই যে, জিয়াতের জন্য আমার এমন লাগবে। তুমি বলো, মনকে কী করে বুঝায়?’

আরও পড়ুন: বই এবং বই পড়া!

আমার জন্য লেখা ছোট্ট অংশ →

‘জিয়াত মণি, তুমি কেমন আছো? দাদুর বাড়ি থেকে নানুর বাড়িতে গিয়ে আন্টিকে কী বলছো? আর তোমাদের বাড়ি কোন জায়গায়? তোমার আব্বুর নাম কী? দাদুর বাড়িতে কে কে আছে? বিদেশ থেকে তোমার জন্য কী কী আনবো, ক্যাসেট করে জানাবে কেমন! (তখন মোবাইল ছিল না কারও! আমরা খালি ক্যাসেট কিনে, কথা রেকর্ড করে বিদেশে পাঠাতাম।) আর আল্লাহকে বলবে আমাকে বেশি করে টাকা দিতে এবং তাড়াতাড়ি দেশে আনতে কেমন! আর আমার বেশি বেশি আদর নেবে কেমন!’

– ইতি তোমার আব্বু।

তখন আমার বয়স সম্ভবত দুই কিংবা আড়াই হবে। সাড়ে ১৬ বছর আগের কথা আমার কিছুই মনে নেই। একটু একটু কথা বলতে শিখলেও চিঠি পড়ার মতো বয়স হয়নি। সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে কত চিঠি। আমার পড়ার সুযোগও হয়নি। আজ হঠাৎ কোথায় যেন এটা খুঁজে পেয়ে আম্মা আমার হাতে ধরিয়ে দিলো। ১৬ বছর আগের চিঠি পেলাম আজ।

আমরা সবাই মাকে নিয়েই অনেক লাফাই। কিন্তু যে লোকটা নীরবে আমাদের আগলে রাখেন, বাড়ির ছাদের মতো সব সময় আমাদের সব ঝড় ঝাপটা থেকে বাঁচান, তিনিই বাবা। আর যেসব বাবারা পরিবার, পরিজন ফেলে বিদেশে পড়ে থাকেন, আজীবন কষ্ট করেন পরিবারের সুখের জন্য, তাঁদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা অনেক বেশিই।

চিঠিটা পড়ে বুঝলাম বাবা হবার আনন্দ, মোহনীয় অনুভূতি। বাবারা একটু পাগলাটে টাইপেরই হয়। সন্তানের জন্য সবকিছু ত্যাগ করতেও দ্বিধাবোধ করেন না। আমার এইচএসসি রেজাল্টের পর, ফ্যামিলির ছোটো বড়ো সকলেই জনে জনে বাঁশ দিয়েছে, শুধুমাত্র আব্বু ছাড়া। উলটো আব্বু আমার মোবাইলে ফোন করে সান্ত্বনা দিয়েছে। বলেছে, ভাগ্যকে মেনে নিতে। যেখান থেকেই ফর্ম পাওয়া যায় সেখানে এক্সাম দিয়ে, আমার ইচ্ছে মতো জায়গায় অ্যাডমিশন নিতে। ফ্যামিলিতে উনিই একমাত্র লোক, যিনি কোনোদিন নিজের কোনো ইচ্ছে আমার ওপর চাপিয়ে দেননি।

এই পাগল লোকটার জন্য হলেও আমার ঢাবিতে একটা সিট প্রয়োজন। আমাকে পারতেই হবে। পারি, না পারি; অন্তত চেষ্টার ত্রুটি রাখব না।

অণুগল্প: বাবার চিঠি

লেখা: আবুল হাসনাত বাঁধন

তারিখ: ২২/০৮/২০১৬
স্থান: কোতোয়ালি, চট্টগ্রাম।

*****

এই ধরনের আরও লেখা পেতে অনুলিপিতে চোখ রাখুন! প্রবাসী বাবার সন্তানেরা ভালো লাগলে শেয়ার করতে পারেন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button