যে কুয়াশা সকাল এনেছিল | আবুল হাসনাত বাঁধন

যে কুয়াশা, সকাল এনেছিল | আবুল হাসনাত বাঁধন

এক.

পৌষের কুয়াশা মোড়ানো সকাল। বাসের দরজার পাশের সিটে বসে সস্তা দামের সিগারেটে টান দিচ্ছিল বুলু। আসল নাম – বুলবুল আহমেদ। সবাই ‘বুলু’ বলে ডাকে ওকে। সিগারেটের ধোঁয়ার ফাঁকে হঠাৎ একটা মুখাবয়বে আটকে গেল ওর চোখ। সিগারেটটা আস্তে করে ফেলে দিলো সে। স্কুলের এক ছাত্রী দেরি করে, হন্তদন্ত হয়ে স্কুলে আসছে। বুলুর মনে হলো, নীল আকাশে একটা শালিক পাখি উড়তে উড়তে ভেসে আসছে। বুলু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মেয়েটার রসুন রঙের মুখ, গালের ডান পাশের ছোট্ট তিল, আর দ্রুত চলমান পাগুলোর দিকে। এর আগেও বুলু অনেক মেয়ে দেখেছে, কিন্তু এই মেয়েটা একদম অন্যরকম। ছিপছিপে গড়ন, উচ্চতা মাঝারি, দেখতে অনেকটা হিন্দি সিনেমার নায়িকাদের মতন। বিজিসি একাডেমির পটিয়াগামী স্কুল বাসের হেল্পার বুলুর নিজেকে একমুহূর্তের জন্য মেয়েটার পাশে বলিউডের আমির খান ভাবতে ইচ্ছে হলো।

সারাদিন এলোমেলো ভাবনায় কাটে বুলুর। ভেবেছিল, বিকালে দেখা পাবে মেয়েটার। কিন্তু না, কোনো এক অজানা কারণে মেয়েটা বিকেলেও স্কুল বাসে উঠেনি। মনটা দমে গিয়েছিল বুলুর। রাতে বাড়ি ফেরে প্যাকেটভর্তি সিগারেট শেষ করে মোবাইল নিয়ে বসলো অশালীন ভিডিয়ো দেখতে। কিন্তু পারল না, ফোনের স্ক্রিনে বারবার মেয়েটার চোখ ভাসতে লাগলো। এক পর্যায়ে ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে মারল বুলু। এসব অশ্লীলতার সাথে মেয়েটার পবিত্র মুখ মেলাতে চায় না সে। বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে একসময় ঘুমে তলিয়ে যায় বুলু।

আরও পড়ুন: বাবার চিঠি | আবুল হাসনাত বাঁধন

আবার ভোর হয়। শীতের সকাল। একসময় রোদ্দুর এসে ছুঁয়ে যায় প্রকৃতির ত্বক। আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠে প্রকৃতি। শুরু হয় দৈনন্দিন জীবনের পথচলা। এই শহরে বুলুদের উঠতে হয় অনেকের আগে, ঘুম ছাড়তে হয় শহর জেগে ওঠার আগে। আজ হয়তো ওপরের অদৃশ্য সত্ত্বা কোনো সুন্দর উপহার সাজিয়ে রেখেছিলেন বুলুর জন্য। হ্যাঁ, আজ অর্পিতা বাসে ওঠে, এবং বসে দরজার পাশের সিটটাতেই। বুলুর দরজায় দাঁড়িয়ে, ‘ওস্তাদ, বায়ে প্লাস্টিক!’ টাইপ ডায়লগ দেওয়ায় নিয়োজিত। তাদের মধ্যকার দূরত্ব এক হাত মতন! বুকের বা’ পাশে অদ্ভুত একটা শিহরণ বয়ে যায় বুলুর। হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি বুঝতে পারে সে। গলা ছেড়ে গাইতে ইচ্ছে করছিল তার। কিন্তু সম্ভব হয়নি। মাঝে মাঝে মেয়েটার কণ্ঠ ভেসে আসছিল কানে। কথাগুলো বুলুর কাছে মনে হচ্ছিল, একটা ডাহুক পাখির ক্ষীণ সুরের গান। একসময় বাস স্কুলে পৌঁছে যায়। ভ্রমণটার সমাপ্তি ঘটে।

মেয়েটার নাম অর্পিতা দেবনাথ। অভিজাত হিন্দু পরিবারের মেয়ে। বিজিসি একাডেমিতে নবম শ্রেণির বিজ্ঞান শাখার ছাত্রী। পরিবারের আর্থিক অবস্থা বেশ স্বচ্ছল। আর এদিকে ২০ বছর বয়সী বাস হেল্পার বুলুর এই পৃথিবীতে কেউ নেই। আছে শুধু ড্রাইবার রমিজ ভাই। তার সাথেই থাকে, তার সাথেই খায়। জন্মের পর থেকে বাবাকে দেখেনি। প্রাইমারিতে পড়ার সময় মা অসুখে পড়ে মরে গেছে। তারপর থেকে ভীষণ একলা বুলু। ছন্নছাড়া জীবন, রাস্তায় ঘুরে এই সেই করা। সবশেষে রমিজ উদ্দিনের কাছেই ঠাঁই হলো তার। মাঝে মাঝে নিজের জীবনচিত্র নিয়ে ভাবে বুলু। ভেবে ভেবে ঈশ্বরকে অভিযোগ জানায়। বরাবরের মতন ঈশ্বর সবসময় নির্লিপ্ত।

দুই.

এ অবস্থা থেকে বুলু আর অর্পিতার যোগফল তৈরি করা, আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব। কিন্তু না, এটা মানব জীবন! জীবন মাঝে মাঝে সিনেমার চেয়েও বেশি সুন্দর। যেমন: বুলুর জীবনটাও একসময় রঙিন হয়ে উঠেছিল। ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতায় নত হয়েছিল বুলুর শির। একটা দমকা হাওয়ার মতো তার জীবনে এসেছিল অর্পিতা।

আরও পড়ুন: ‘তরুন্বিতা, ফিরবে তো?’ | আবুল হাসনাত বাঁধন

ছুটির পর, বাসে দরজার পাশের সিটে বসে অর্পিতার জন্য সিট রাখত বুলু। সিটটা অর্পিতার খুব প্রিয়। দাঁড়ানো কারও সাথে গাদাগাদিও হয় না, সেই সাথে নামতেও সুবিধা। প্রতিদিন অর্পিতার চোখে থাকত কৃতজ্ঞতার দৃষ্টি আর ঠোঁটে চৈত্রে রোদের মতন এক ফালি হাসি। ওদের সম্পর্কটা প্রথমে ছিল আংকেল আর আফা-মণি সম্বোধনে। এটুকুতেই অনেক বেশি খুশি ছিল বুলু। কিন্তু সময়ের আবর্তনে, সেটা তুমি সম্বোধন আর ‘বুলু-অর্পি’ ডাকে গিয়ে থেমেছে। এটা হয়তো সম্ভব হতো না, সেদিন যদি কলেজের বখাটে ছেলেগুলো অর্পিতাকে উত্যক্ত না করত। এ ঘটনার কারণে সেটাই হয়ে গেল; শ্রেণি বিভেদ, ধর্মের প্রাচীরের কারণে যেটা হওয়া সম্ভব ছিল না। অথচ, তবুও হলো সম্পর্কটা। ভালোই চলছিল। সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত ছিল টিফিন পিরিয়ডের সময়গুলো। এই সময়টাই ওরা লেকের পাড়ে বসে গল্প করত, স্কুলের পেছনের মাঠে ঘাস আর লজ্জবতীর প্রেম দেখত। ঝালমুড়ির ঠোঙা হাতে দুজনে আকাশে স্বপ্নের আল্পনা আঁকতো। বুলু ভাবত, ‘ইশশ! সময়গুলোকে যদি কাচের ফ্রেমে আটকে রাখা যেত!’

সময় থেমে থাকেনি! ছুটে চলেছে নিরন্তর গতিতে। শীত পেরিয়ে বসন্ত এলো। বসন্তের ফুলের সৌরভ, রুক্ষ গ্রীষ্ম, শীতল ধারার বর্ষা, পেঁজো তুলোর মতন উড়া শুভ্র মেঘের শরৎ। এভাবে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে বছর পেরুলো! এদিকে অর্পিতার মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ। পরীক্ষার আগে বিদায় অনুষ্ঠানে খুব কেঁদেছিল সে! পরীক্ষার পর আর স্কুলে আসা যাওয়া নেই তার। বুলুকে জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন আসতে হয় বাসভর্তি ছাত্রছাত্রী নিয়ে। অর্পিতার সাথে ফোনে কথা হয় দুপুরে কিংবা রাতে। একদিন অর্পিতা ত্রস্ত কণ্ঠে দেখা করতে বলল।

আরও পড়ুন: সরলতা | আবুল হাসনাত বাঁধন

পরীক্ষার পর আর দেখা হয়নি দুজনের। অনেক দিন পর, পড়ন্ত বিকেলে দেখা হলো আবার। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ছে ধীরে ধীরে। দিগন্তের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলল অর্পিতা।
‘বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছে, বুলু। তাঁর বন্ধুরই ছেলে, এবার ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেছে। কিন্তু বিয়েটা আমি কিছুতেই করতে পারব না। কিছু একটা করো প্লিজ!’
‘আমি! আমি, কী করবো!?’ আমতা আমতা করে বলে বুলু।
‘চলো না পালিয়ে যাই! আমার টাকা পয়সা, চাকরি কিচ্ছু চাই না! তোমার সাথে না খেয়েও দিন কাটাতে পারব আমি!’
বুলু, অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে। ভাবে, তার কারণে মেয়েটার জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে। বড়োলোক বরের ঘরে খুব সুখে থাকবে অর্পিতা। অথচ বুলুর নিজের থাকার জায়গাটাও নেই! ঠিকমতো খাওয়াতে, পরাতেও পারবে না। সবদিক ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুলু। অর্পিতার দিকে না তাকিয়েই ক্ষীণ কণ্ঠে উত্তর দেয়, ‘এটা সম্ভব না, অর্পি!’ অর্পিতা আর কিছু বলে না। ধীরে ধীরে পিছিয়ে, একসময় মিলিয়ে যায়। বুলুও ফিরে আসে গোধূলির রক্তিম আভা গায়ে মেখে। ফেরার পথে জীবন ও ভালোবাসার কাছে নিজেকে পরাজিত সৈনিক মনে হতে থাকে বুলুর।

তিন.

ওইদিনের পর আর যোগাযোগ হয়নি কখনো দুজনের। পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে। রমিজ ভাই বেঁচে নেই। বাসের হেল্পার বুলু এখন পাক্কা ড্রাইবার। এখনো বিজিসির গাড়ি চালায় সে। স্কুলের আনাচে কানাচে অর্পিতার স্মৃতি হাতড়িয়ে বেড়ায়।

এবছর স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের পুনর্মিলনী হচ্ছে। বিগত সব ব্যাচের ছাত্রছাত্রীরা এসেছে আজ। হঠাৎ একটা চেনা মুখে চোখ আটকে গেল বুলুর। আজকেও কুয়াশায় মোড়া শীতের সকাল। সবকিছুই বহুবছর আগের সেই প্রথম দিনটার মতো। পরিবর্তন শুধু, স্কুল ড্রেসের জায়গায় সাদা শাড়ি আর অর্পিতার কোলে একটা ফুটফুটে বাচ্চা। অর্পিতা একবার তাকালো বুলুর দিকে। সেই দৃষ্টিতে ভালোবাসা নাকি ঘৃণা বুঝতে পারল না বুলু!

আরও পড়ুন: একাকিত্ব | আবুল হাসনাত বাঁধন

অনুষ্ঠানের পর দুজন মুখোমুখি দাঁড়ানো। অসংখ্য অব্যক্ত কথা গলায় দলা পাকিয়ে আছে। অর্পিতা ছোট্ট করে বলল, ‘বিয়ে করোনি কেন, বুলু?’
‘তোমার স্মৃতি সব সময় তাড়িয়ে বেড়ায় আমাকে। কিন্তু তোমার স্বামী?’
বুলুর প্রশ্নোবোধক চোখের দিকে অর্পিতা উত্তর করে, ‘ও দুবছর আগে অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে!’
অনেক্ষণ দুজনে চুপ করে থাকে। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে অর্পিতা বলে ওঠে, ‘তোমার বাসে আমাদের দুজনের জন্য জায়গা হবে, বুলু?’
বুলু ছলছল চোখে উত্তর দেয়, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই!’
দুটো প্রাচীন হাত, একটা আরেকটাকে পুরোনো অনুভবে আঁকড়ে ধরে সূর্যাস্তের দিকে এগোতে থাকে।

‘যে কুয়াশা, সকাল এনেছিল’ | © আবুল হাসনাত বাঁধন

রচনাকাল: (২১/০১/২০১৮)
স্থান: জয়কুঞ্জ, বরিশাল।


আবুল হাসনাত বাঁধন এর – ‘যে কুয়াশা, সকাল এনেছিল’ গল্পের মতো আরও নতুন নতুন রোমান্টিক গল্প পড়তে চাইলে অনুলিপিতে চোখ রাখুন! গল্পটা ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button

Adblock Detected

Dear Viewer, Please Turn Off Your Ad Blocker To Continue Visiting Our Site & Enjoy Our Contents.