লাইফস্টাইল

গোরুর মাংসের তিনটি সহজ ও মজাদার রেসিপি!

সামনেই আসছে কোরবানির ইদ। আর বাঙালীর কোরবানির ইদ মানেই গোরুর মাংসের বিভিন্ন পদ। গোরুর রেসিপির তো আসলে শেষ নেই ,তবে আজকে আমরা গোরুর মাংসের তিনটি ঐতিহ্যবাহী, সহজ ও মজাদার রেসিপি নিয়ে আলোচনা। কীভাবে গোরুর মাংস খুব সহজে ও মজাদার স্বাদে রান্না করা যায়!

গোরুর মাংসের তিনটি সহজ ও মজাদার রেসিপি

গোরুর মাংসের কালাভুনা:

গোরুর মাংসের কালাভুনা খুবই জনপ্রিয় এবং ঐতিহ্যবাহী একটি রেসিপি। এর উৎপত্তি দক্ষিণ পার্বত্য চট্টগ্রামে। এটিকে চাঁটগাইয়া ভাষায় বলে হালা ভুনা। তবে, এর জনপ্রিয়তা পুরো বাংলাদেশেই রয়েছে।

কিন্তু, অনেকে মনে করেন যে, গোরুর মাংসের কালা ভুনা মানে মাংসগুলোকে ভেজে কালো করে ফেলা। আদতে এমন৷ গোরুর মাংসের কালাভুনা এমন একটা দুর্দান্ত রেসিপি যেদি বিভিন্ন প্রকার মশলার সংমিশ্রণে কালো করা হয়। তো, চলুন জেনে নেই গোরুর মাংসের কালাভুনার রেসিপি।

প্রয়োজনীয় উপকরণ:

মাংস মাখানোর উপকরণ : গোরুর মাংস দেড় কেজি (হাড় ও চর্বিসহ), পেঁয়াজ ১/২ কাপ(কিউব করে কাটা), পেঁয়াজ কুচি ১ কাপ, তেজপাতা ২টা, কালো বড় এলাচ (৩-৪ টা), দারুচিনি (৩-৪ টা), স্টার এনিস (৩-৪ টা), ছোট সাদা এলাচ (২ টি), লবঙ্গ (৬-৭ টা), গোলমরিচ (৬-৭ টি), পেঁয়াজ বেরেস্ত ১/২ কাপ, শুকনো মরিচ গুঁড়া (২ চামচ), হলুদ গুঁড়ো (১/২ চামচ), ধনিয়া গুড়া (১ চামচ), লবণ স্বাদ মতো, আদা বাটা (১/২ চামচ), রসুন বাটা (১/২ চামচ), সয়াবিন তেল ১ কাপ।

সেদ্ধ মাংসে দেওয়ার:

গোলমরিচের গুঁড়ো (১/২ চামচ), জায়ফল (১/২ টি), জয়ত্রী (১গ্রাম), ভাজা জিরা গুঁড়া (১/২ চামচ), গরম মসলা (১/২ চামচ), রাঁধুনী গুঁড়া (১/২ চামচ)।

মাংস ফোঁড়ন দেওয়ার:

সরিষার তেল (১কাপ), শুকনো মরিচ ১ টি।

রান্নার পদ্ধতি:

প্রথমে একটা নিয়ে তার মধ্যে মাংস দিন, এরপর তেলপাতা, এলাচ, দারুচিনিসহ মাংস মাখানোর সকল উপকরণ দিয়ে হাত দিয়ে ভালো করে মেখে নিন। যেন প্রতিটা মাংসে মশলা খুব ভালো করে মিশে যায়৷ এরপর একপাশে ১০ মিনিটের জন্য ম্যারিনেট করে রাখুন। ১০ মিনিট পর কড়াইটা চুলায় বসিয়ে দিন। চুলার আঁচ মিডিয়াম লো রাখবেন। এবার ঢাকনা দিয়ে মাংস সেদ্ধ করুন। তবে ৫ মিনিট বাদে বাদে ঢাকনা তুলে নাড়াচাড়া করবেন। কিন্তু কোনো পানি ব্যবহার করবেন। এমনিতেই মাংস হতে যথেষ্ট পানি বের হবে।

#আরও পড়ুন: কোরবানির ইদে যেভাবে প্রস্তুতি নেবেন!

যখন ২০-২৫ পর দেখবেন মাংস থেকে তেল আলাদা হয়ে গেছে, খুব ভালো করে মাংস কষা কষা হয়েছে। এই পর্যায়ে সেদ্ধ মাংসে দেওয়ার মশলাগুলো একে একে দিয়ে দিন আর ভালো করে নাড়ুন কিছুক্ষণ। এরপর ঢাকনা দিয়ে চুলার আঁচ লো করে রাখুন। তবে মাঝে মাঝে অবশ্যই নেড়েচেড়ে দেবেন।

যখন দেখবেন সব মশলা বেশ ভালোভাবে মাংসের সাথে মিশে গেছে। এবার ফোঁড়নের পালা, একটি প্যান নিয়ে তাতে সরিষার তেল দিন। তেল গরম হলে পেঁয়াজ ও রসুন কুচি দিন। বাদামি করে ভেজে নিন। এইবার আদা কুচি ও শুকনো মরিচ দিন। ভালো করে বাদামি হলে এইবার কালাভুনার সেদ্ধ মাংসের কিছুটা এই প্যানে ঢেলে ফোঁড়ন দিন। এই পর্যায়ে চুলার জ্বাল বেশি রাখবেন। এক মিনিটের মতো ঢেকে এই প্যানে রাখুন।

এবার এই প্যানের মাংসগুলোকে বাকি মাংসগুলোর ভেতর দিয়ে ভালো করে নেড়েচেড়ে মিশিয়ে নিন। এইভাবে ৫ মিনিট ভালো করে কষিয়ে নিন। এরপর এর মধ্যে পেঁয়াজ কুচি, গরম মসলা ও রাঁধুনি গুঁড়ো দিন হাফ চামচ করে। এরপর নাড়তে থাকুন যতক্ষণ পর্যন্ত পেঁয়াজ বাদামি না হয়৷ পেঁয়াজের রং বদলে গেলে কালাভুনার ফ্লেভারও আসতে শুরু হবে। এবার ঢাকনা দিয়ে চুলা বন্ধ করে দিন। এভাবেই রাখুন ৫-১০ মিনিটের মতো।

এরপর গরম গরম পরিবেশন করুন চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী গোরুর মাংসের কালাভুনা।

মেজবানি মাংস:

মেজবানি মাংস চট্টগ্রামের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী আরেকটি রেসিপি। চট্টগ্রামের মানুষ মৃত্যু ব্যক্তির চার দিনে করা গোরুর মাংসের রেসিপি হলো এই মাংস। চট্টগ্রামের মানুষ এই অনুষ্ঠানকে চারদিন্না বা মেজবান বলে। সে যাই হোক, মেজবানি মাংস রান্নার বার্বুচিরা বেশকিছু কৌশল অবলম্বন করে। কানাভুনার মতো এই রান্না একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এই রেসিপিতেও প্রচুর পরিমাণ মসলা ব্যবহার হয় এবং ঝালের পরিমাণও বেশি থাকে। তবে চলুন জেনে নেওয়া যাক, মেজবানি মাংস রান্নার রেসিপি।

প্রয়োজনীয় উপকরণ:

গোরুর মাংস (হাড়, কলিজা ও চর্বিসহ)- দেড় কেজি, হলুদ গুঁড়া হাফ চামচ, মরিচ গুঁড়া ৩ চামচ, সরিষার তেল হাফ কাপ, পেঁয়াজ কুচি হাফ কাপ,লবণ স্বাদ মতো, কাঁচা মরিচ ৪-৫ টা।

মেজবানি মসলা বানানোর উপাদান:

আস্ত ধনে এক চামচ, জিরা ১ চামচ, রাঁধুনি ১ চামচ, সাদা সরিষা দেড় চামচ, গোলমরিচ এক চামচ, শুকনো মরিচ ৫/৬ টি,সাদা এলাচ ৬/৭ টি, কালো এলাচ ৬/৭ টি,দারুচিনি ২ টুকরো, লবঙ্গ ৬/৭টি, জয়ত্রি ১ টি, জয়ফল হাফ, তেজপাতা ২ টি।

মাংস মাখানোর উপাদান:

টমেটো ১টি, পেঁয়াজ বাটা ৩ চামচ, আদা বাটা দেড় চামচ, রসুন বাটা ১ চামচ, তেজপাতা ১ টি, কালো এলাচ ১ টি, লবণ স্বাদ মতো, নারকেল বাটা ১ চামচ, চিনা বাদাম বাটা দেড় চামচ।

রান্নার পদ্ধতি:

প্রথমে মেজবানি মসলা তৈরি করে। এইজন্য একটি গ্রিন্ডারে সব মেজবানি মসলার সব উপকরণ নিন, কেবল তেজপাতা ও কালো এলাচ বাদে। যাদের গ্রিন্ডার নাই তারা চাইলে বেটেও নিতে পারেন।

এবার মাংসগুলোকে মেখে নিন মাংস মাখানোর উপকরণ দিয়ে। খুব ভালো করে মেখে নিতে হবে।

তারপর চুলায় একটা হাঁড়ি বসিয়ে তাতে সরিষার তেল দিন৷ তেল গরম হলে পেঁয়াজ কুচি ভেজে নিন। পেঁয়াজ ভালো মতো ভাজা হয়ে এরমধ্যে হলুদ ও মরিচের গুড়া দিন। এবার সামান্য পানি দিয়ে কষিয়ে নিন। কষানো হলে মাখানো মাংসগুলো ঢেলে দিন। এবার ভালো করে নেড়ে সব উপকরণ মিশয়ে নিন এবং ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিন।

চুলার আঁচ এক্ষেত্রে কমিয়ে রাখবেন। এভাবেই ১০-১৫ মিনিট রাখুন। ১০ মিনিট পর নেড়েচেড়ে কষিয়ে নিন এবং যখন তেল আলাদা হবে সেই পর্যায়ে এক কাপ পানি দিয়ে আবার ঢাকনা দিয়ে ৪০ মিনিটের জন্য রাখুন। তবে অবশ্যই মাঝে মাঝে ঢাকনা তুলে নেড়েচেড়ে দেবেন এবং চুলার আঁচ মিডিয়াম রাখবেন।

৪০ মিনিট পরে তৈরি করে রাখা মেজবানি মাংসের মশলাটা দিয়ে আবার নেড়েচেড়ে দিতে হবে এবং ঢাকনা দিয়ে আরও ২০ মিনিটের মতো রাখুন। এই পর্যায়ে নামানোর ৫ মিনিট আগে আস্ত কাঁচামরিচ দিয়ে আরও কিছুক্ষণ রাখুন। ৫ মিনিট হলে নামিয়ে নিন।

এইবার গরম গরম পরিবেশন করি ঐতিহ্যবাহী মেজবানি মাংস।

#আরও পড়ুন: কোরবানির মাংস দ্রুত সেদ্ধ হওয়ার জাদুকরী টিপস!

গোরুর চুইঝাল:

গোরুর চুইঝাল মানে এক দুর্দান্ত ও মজাদার রেসিপি। এটি মূলত খুলনা অঞ্চলের বেশ বিখ্যাত একটি পদ। এই রেসেপির মূল আর্কষন হলো চুইঝাল নামক এক ধরণের মশলা। চুইঝাল নাম হলেও এই মশলা অতটা ঝাল নয়। এর বিশেষ ফ্লেভারের কারণেই এটি বেশি জনপ্রিয়। এই মশলাটি বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের মানুষ বেশি চাষ করেন। তো চলুন জেনে নেওয়া যাক অভিনব এই রেসেপির আদ্যপ্রান্ত!

প্রয়োজনীয় উপাদান:

গোরুর মাংস ১ কেজি, চুইঝাল ৫-১০ টুকরো, পিয়াজ ১ কাপ পরিমান , দারুচিনি ২ টা, তেজপাতা ২ টি, ছোট সাদা এলাচ ৪ টি , লবঙ্গ ৩-৪ টি, গোল মরিচ ৭ -৮ টি , শুকনো মরিচের গুড়ো ১ চামচ, হলুদ গুঁড়ো ১ চামচ , ধনে গুড়ো ১ চামচ , লবন স্বাদমতো, রসুন বাটা ১ চামচ , আদা বাটা ১ চামচ , তেল ১ কাপ, আস্ত রসুন ২ টি।

রান্নার পদ্ধতি:

প্রথমে একটা কড়াইয়ে মাংস নিয়ে নিন। এরপর একে একে সব মশলা দিয়ে দিন। কেবল মেঁথি, চুইঝাল ও আস্ত রসুন বাদে৷ এবার সবগুলো মসলার সাথে খুব ভালো করে মাংস মাখিয়ে নিন। মাংস যত ভালো মাখা হবে স্বাদ তত ভালো হবে। মাখানো হলে হাফ কাপ পানি দিয়ে দিন। এবার মাংসটাকে ঢাকনা দিয়ে চুলায় বসিয়ে দিন। এক্ষেত্রে ফুল আঁচে রান্না করতে হবে।

যখন পানি শুকিয়ে আসবে তখন চুলার আঁচ কমিয়ে নেড়েচেড়ে নেবেন। এরপর তেল মাংস হতে আলাদা হলে আস্ত রসুন (ছোলা ফেলে) ও চুইঝালগুলো দিয়ে দিন। তবে রসুনের ওপর দিকে চাকু দিয়ে চিঁড়ে দেবেন। এবার, মাংস অনবরত নেড়েচেড়ে দিন, যাতে নিচে লেগে না যায়।

এবার ঢাকনা দিয়ে ৫ মিনিটের মতো অপেক্ষা করুন। ৫ মিনিট পর ঢাকনা খুলে গুড়ো করে রাখা মেথি দিয়ে দিন। তবে অবশ্যই কাঁচা মেথি গুড়া দেবেন। এবার ভালো করে আবার নেড়েচেড়ে নিন এবং মাংসগুলো অনবরত নাড়াচাড়ার মাধ্যমে ভালো করে কষিয়ে নিন। কষাবেন ঠিক ততক্ষণ যতক্ষণে আস্ত রসুন ও চুইঝাল সেদ্ধ না হয়। রসুন ও চুইঝাল সেদ্ধ হলে ১ চামচ ভাজা জিরা গুড়া, ১ চামচ রাধুনি গুড়ো ও ১ চা চামচ গরম মসলা দিয়ে খুব ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে।

তারপর অনবরত নাড়াচাড়ার মাধ্যমে ভালো করে কষিয়ে নিতে হবে। আর তৈরি হয়ে যা নাড়া চাড়া দিয়ে কষিয়ে রান্না করতে হবে। কষানো হলে নামিয়ে নিন। এবার গরম গরম পরিবেশন করুন খুলনার বিখ্যাত চুইঝাল।

Recent Posts

  • বিনোদন জগৎ

ব্যাচেলর পয়েন্ট এর লগে আছি.কম এর MD গ্রেফতার

ব্যাচেলর পয়েন্ট বাংলাদেশের বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক। বর্তমানে ব্যাচেলর পয়েন্ট নাটকের সিজন ৪ চলতেছে।…

  • গল্প

মানুষের শরীরে কোন অ’ঙ্গটি জন্মের পর আসে, আবার মৃ’ত্যুর আগে চলে যায়?

মানুষের শরীরের কোন অ’ঙ্গটি জন্মের পর আসে ? জানেন কী? আমরা সবাই কম বেশি জানি।…

  • শিক্ষা

এসএসসিতে পা দিয়ে লিখে জিপিএ-৫ পেল কুড়িগ্রামের মানিক

এসএসসি রেজাল্ট ঃ এসএসসি ২০২২-এ পা দিয়ে লিখে জিপিএ-৫ পেয়ে আলোড়ন ফেলে দিলো জন্ম থেকেই…

  • খেলাধুলা

ইনজুরির কারণে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে খেলবেন না নেইমার! ক্যামেরুনের বিপক্ষে খেলা নিয়েও শঙ্কা

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে খেলবেন না নেইমার । এমনটাই জানিয়েছেন স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কা। এবারের বিশ্বকাপে ভাগ্য খারাপ…

  • ফিচার

ছুরি-বটির ঝামেলা ছাড়াই, নারিকেল আস্ত রেখে ছাল ছাড়ানোর কার্যকরী পদ্ধতি, রইল ভিডিও সহ পুরো নিয়ম

নারিকেলর ছাল ছাড়ানোর পদ্ধতি : নারিকেল আমরা কে না চিনি। নারিকেল আমাদের নিত্যদিনের খুবই পরিচিত…

  • গল্প

মাত্র দু-মিনিট সময় লাগবে গল্পটি পড়তে, মিস করলে জীবনের অনেক কিছু অজানা থাকবে

শিক্ষনীয় গল্প: সাইকোলজির টিচার ক্লাসে ঢুকেই বললেন, আজ পড়াবো না। স্যারের এমন কথা শুনে সবাই…