বলপয়েন্ট কলম যেভাবে এলো!

বলপয়েন্ট কলম নামটা শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে নানান রঙের নানান ব্র‍্যান্ডের কলমের কথা। যার নিবের ডগায় থাকে একটি ঘূর্ণায়মান বল। নিবের ডগায় এই বলটির কারণেই বলপয়েন্ট কলম নামে ডাকা হয় এ ধরনের কলমগুলোকে। আপনাদের মনে কখনো কি এই প্রশ্ন এসেছে- কীভাবে এলো এই বলপয়েন্ট কলম? চলুন, আজ জেনে নেওয়া যাক বলপয়েন্ট কলম আবিষ্কারের কথা।

বলপয়েন্ট কলম যেভাবে এলো

সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ ভাষাকে করতে চেয়েছে সহজবোধ্য। প্রাচীনকালে মানুষ কেবল মুখের ভাষায়ই ভাবের আদান প্রদান করত। এক সময় প্রয়োজন দেখা দিলো লিখে ভাব আদান প্রদানের। তখন মানুষ কাদামাটিতে, পাথরে খোদাই করে লিখে রাখত বিভিন্ন চিহ্ন বা সংকেত। যা থেকেই পরবর্তীতে বিভিন্ন অর্থবহ লেখ্য রূপে বিবর্তিত হয়েছে আমাদের মুখের ভাষাসমূহ।

গবেষকদের মতে, খৃষ্টের জন্মের ৫১০০ বছর আগে সুমেরীয় সভ্যতায় জন্ম হয়েছিল ভাষার প্রথম লিখিত রূপ। সুমেরীয় ভাষাকে পৃথিবীর প্রথম লেখ্য ভাষা হিসেবে ধরা হয়।

কলমের ব্যবহারের প্রচলন:

প্রাচীনকালে লেখালেখির জন্যে কলমের ব্যবহার ছিল না। ধারণা করা হয় মিশরীয়রা প্রথম কলমের ব্যবহার শুরু করে ৪৫০০-৫০০০ বছর আগে। ধারালো পাথর বা চোখা অস্ত্র দিয়ে পাথরের গায়ে, গাছের বাকল/পাতায়, পশুর চামড়ায় কিংবা গুহার দেয়ালে লিখে রাখা হত ভাষার লিখিত রূপ। কখনো আবার সাংকেত বা হায়ারোগ্লিফিক লিপি খোদাই করে রাখা হতো। মিশরীয় সভ্যতার হায়ারোগ্লিফিক লিপির কথা কে না শুনেছে! তখন কলম হিসেবে ব্যবহৃত হতো পাথর বা অস্ত্র!

দ্বিতীয় শতাব্দীর সময়ে চীনারা কাগজ আবিষ্কার করলে কালি কলমে লেখন পদ্ধতির দ্রুত বিস্তার লাভ ঘটে।

কলমের আধুনিক রূপ:

কালি ও কলমে লেখার প্রচলনের পর কালিতে ডুবিয়ে লেখার পদ্ধতি চালু হয়। তখন নলখাগড়ার কঞ্চির মাথা কেটে কালিতে ডুবিয়ে নয়তো পাখির পালক দোয়াতের কালিতে ডুবিয়ে লেখা হতো। ওয়াটারম্যান কর্তৃক ঝর্ণা কলম আবিষ্কৃত হওয়ার পর পালটে যেতে থাকে কলমের আধুনিকতার গতিপথ। বাণিজ্যিকভাবে তৈরি হতে থাকে ঝর্ণা কলম বা ফাউন্টেন পেন। তৈরি হয় কলম প্রস্তুতকারী বেশিকিছু প্রতিষ্ঠান ও ব্র‍্যান্ড। যে ধারা আজও প্রচলিত আছে দেশে দেশে।

বলপয়েন্ট কলম যেভাবে এল!
ঝর্ণা কলম

বলপয়েন্ট কলম আবিষ্কার:

ঝর্ণা কলম তৈরির পর পালটে যায় কলমের ব্যবহার। এ কলম ব্যবহার করে লেখা যেত সহজেই। অভিকর্ষ বলের প্রভাব কাজে লাগিয়ে এ কলমে লেখা হতো বিধায় নিরবিচ্ছিন্নভাবে লেখা যেত দীর্ঘ সময় ধরে। বেড়ে গিয়েছিল লেখার গতিও। এমনকি কালি শুকিয়ে যেত না। কিন্তু ঝামেলা পিছু ছাড়েনি ঝর্ণা কলমকে। অভিকর্ষ বলের প্রভাবে লেখা হত বলে বক্রতলে এই কলমে লিখতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হত। পকেটে থাকা কলমের কালি চুইয়ে নষ্ট হত কাপড়চোপড়। তাছাড়া দোয়াত থেকে কলমে কালি ঢালার ঝামেলা তো ছিলই। কালির অপচয়ও ছিল এক বড় সমস্যা। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে নতুন এক ধরণের প্রয়োজন দেখা দেয়।

সময়টা ১৮৮৮ সাল। জন লাউড নামের এক ব্যবসায়ী  এমন একটি কলম খুঁজছিলেন যা দিয়ে চামড়াজাত পণ্যে লেখা যাবে। কেননা ফাউন্টেন কলম দিয়ে তা করা যেত না। তখন তিনি এমন একটি কলম বানাতে সক্ষম হন যাতে একটি ছোট খোপে কালি জমা থাকতো। আর কলমের মাথায় ‘ঘুরতে পারে’ এমন একটি স্টিলের বল লাগানো ছিল। ঐ বছরের ৩০শে অক্টোবর লাউড কলমটির পেটেন্ট নিলেও তা আর উৎপাদন করেননি। সাধারণ লেখালেখির কাজেও কলমটি সুবিধাজনক ছিল না। লাউডের কলম থেকে শুরু করে পরবর্তী এই সাড়ে তিনশ কলমের সবচেয়ে বড় ঝামেলা ছিল ‘কালি’। কালি পাতলা হলে বলের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেত আর ঘন হলে জমে যেত। তাপমাত্রা কমলে, বাড়লেও একই সমস্যা দেখা দিত। তবে জন লাউডের এই কলমটিই ছিল বলপয়েন্ট কলমের আদি রূপ।

আরও পড়ুন# ধামরাইয়ের রথযাত্রা: বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকউৎসব

কিন্তু জন লাউডের পেটেন্ট নেওয়ার পঞ্চাশ বছর পরে বলপেন নতুন মাত্রা পায় হাঙ্গেরির ল্যাডিসলাস বিরোর হাত ধরে। প্রথম উন্নতমানের বলপেন আবিষ্কারের কৃতিত্ব তারই। ল্যাডিসলাস বিরো ছিলেন একজন ভাস্কর, সাংবাদিক ও চিত্রশিল্পী। পাশাপাশি তিনি একটি ছোট পত্রিকা সম্পাদনার কাজও করতেন। এই কাজ করতে গিয়ে তাকে বারবার ঝর্ণা কলমে বোতল থেকে কালি ঢুকাতে হতো। সমস্যা ছিল আরও। অতিরিক্ত কালি কাগজে লেগে যেত আবার মাঝে মাঝে ঝর্ণা কলমের তীক্ষ্ণ মাথা লেগে কাগজ ছিঁড়েও যেত। সব মিলে একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা। বারবার কালি ঢুকাতে আর কালির দাগ পরিস্কার করতে করতে তিনি পাগল হয়ে যেতেন। তাই কীভাবে এমন কোন কলম বানানো যায় যাতে তাঁকে আর এসব সমস্যা পোহাতে হবে না সেই চিন্তা তার মাথায় ঘুরতে লাগলো। তিনি খেয়াল করে দেখলেন পত্রিকা ছাপাতে যে কালি ব্যবহার করা হয় তা কিছুক্ষণের মাঝেই শুকিয়ে যায়, আর কাগজে দাগও লাগে না। তাহলে লেখার কাজে এই কালি ব্যবহারে সমস্যা কোথায়?

যেই ভাবা সেই কাজ। তবেযেহেতু তিনি এই ব্যাপারে অভিজ্ঞ না, সাহায্য নিলেন তাঁরই ভাই জর্জ-এর কাছ থেকে। তারা দুজন মিলে বানিয়ে ফেললেন আগের থেকে আরও উন্নত বলপয়েন্ট কলম । কলমে ব্যবহার করা হল একটি শিস যাতে কালি ঢোকানো থাকবে। আর শিসের মাথায় লাগানো হল অতি ক্ষুদ্র একটি বল যা ঘুরতে সক্ষম। পদ্ধতি কিন্তু আগের মতই তবে ব্যবস্থাটা উন্নত। ফলে যখন কলমটিকে কাগজের উপর চালানো হবে, বলটি ঘুরবে আর শিস থেকে কালি এসে বলের ফাঁক দিয়ে বের হয়ে কাগজের গায়ে লাগবে। কি দারুণ ব্যাপার!ল্যাডিসলাস ও জর্জ-এর এই কলম দুটিতে আগের মত কালি নিয়ে আর সমস্যা থাকল না। ল্যাডিসলাস বিরো বলপেনের প্রথম আবিস্কারক না হলেও প্রথম কার্যকরী বলপয়েন্ট কলম আসে তারই হাত ধরে। ১৯৩৮ সালে তিনি তার বলপেনের ব্রিটিশ পেটেন্ট নেন।

বিরো ভাইদের গল্পের এখানেই শেষ নয়, এক গ্রীষ্মে সাগরপারে অগাস্টিন জুস্টো নামে এক লোকের সাথে তাদের দেখা হয়, যিনি ছিলেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট। কথায় কথায় তারা তাদের আবিষ্কারের গল্পও বাদ যায় না। তাদের বলপেনের মডেল দেখে প্রেসিডেন্ট জুস্টো আর্জেন্টিনায় এই বলপেনের একটি কারখানা স্থাপনে তাদেরকে আহ্বান জানান। তারপর ১৯৪৩ সালে ল্যাডিসলাস ও জর্জ আর্জেন্টিনায় চলে আসেন। কারখানা স্থাপন করার অর্থ যোগানে আগ্রহী লোকের অভাব হয় না সেখানে। উৎপাদন শুরু হয়, তারা প্রচারণা শুরু করে যে তারা এমন কলম বিক্রি করছে যা দিয়ে পানির নিচেও লেখা যায়। তাদের প্রদর্শনী দেখতে অনেক লোকের ভীড় হয়। তবে কারখানা চালু করলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারা ব্যর্থ হয় কেননা তখনও তাদের বলপেনে সমস্যা রয়ে গিয়েছিলো। তাদের কলমটিতে কার্তুজ থেকে কালি নেমে আসা নির্ভর করতো অভিকর্ষের উপর। ফলে কলমটি খাড়া করে না লিখলে লিখতে অসুবিধা হতো। তাই আবার তারা নেমে পরে এই অসুবিধা দূর করতে। এবার অভিকর্ষের উপর নির্ভরতা বাদ দিয়ে কৈশিকতার উপর ভিত্তি করে তাদের মডেল তৈরি করে। (কোন সরু নল দিয়ে অভিকর্ষের সাহায্য ছাড়া পৃষ্ঠটান আর আসঞ্জন বলের কারণে তরল পদার্থের উপরে উঠে আসাকেই কৈশিকতা বলে।) এরপর তাদের এই উন্নত বলপয়েন্ট কলম Birome ব্র্যান্ড হিসেবে তারা আর্জেন্টিনার বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি করে। বলা যায় বলপয়েন্ট কলম আবিষ্কারের সফলতার গল্পের এই দ্বিতীয় ধাপ আর দীর্ঘ হয়নি। তাদের স্বত্ব বিক্রি হয়ে যায় আমেরিকার এবারহার্ড কোম্পানির কাছে যা পরবর্তীতে কিনে নেয় এভারশার্প কোম্পানি। তবে কোনটিই তেমনভাবে সফল হয়নি।

আরও পড়ুন# কুষ্টিয়ার বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী তিলের খাজা

এরপর মঞ্চে আগমন ঘটে মিল্টন রেয়নোল্ডস নামে এক ব্যক্তির যিনি আমেরিকায় প্রথম সফলভাবে বলপয়েন্ট কলম উৎপাদন করেন। আর্জেন্টিনায় ছুটি কাঁটাতে গিয়ে বিরো ভাইদের কলম তার নজরে আসে। সেখান থেকে তিনি কয়েকটি কলম কিনে আমেরিকায় ফিরে আসেন। কলমের নকশায় অনেকগুলো পরিবর্তন এনে তিনি আমেরিকান পেটেন্ট গ্রহণ করেন। “রেয়নোল্ডস ইন্টারন্যাশনাল পেন কোম্পানি” নামে নিজের কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। জিম্বেলস স্টোরের সাথে চুক্তি করে আমেরিকায় প্রথম খুচরা কলম বিক্রি তাঁকে অভাবনীয় সাফল্য এনে দেয়। তবে পরবর্তীতে তা আর ক্রেতা ধরে রাখতে পারেনি। কারণ সমস্যার ভূত তখনও ছাড়েনি বলপয়েন্ট কলমকে । এরপর আরও বিভিন্ন জন বলপয়েন্ট কলম এর নানা সংস্করণ নিয়ে আসেন যাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য ছিলেন জে. ফ্রলি। ফ্রান সিচ নামের এক কেমিস্টের সহায়তায় তিনি নিয়ে আসেন “পেপারমেট” নামের এক কলম, যা যথেষ্ট সাফল্য লাভ করে। এভাবে বিভিন্ন ব্যক্তির চেষ্টায় সবদিক দিয়ে ত্রুটিমুক্ত একটি কলম প্রথম বাজারে আসে ১৯৪৫ সালে। সে বছর অক্টোবর মাসের এক সকালে নিউ ইয়র্কের জিম্বেলস ডিপার্টমেন্ট স্টোরে একটি কলম প্রথম সাড়ে বারো ডলারে বিক্রি হয়। প্রথম দিনই ১০ হাজার বলপয়েন্ট কলম বিক্রি হয়।

তবে বলপেনের জগতে চূড়ান্ত সফলতা যিনি লাভ করেন, তিনি মার্সেল বিক। বলপেনের নিম্ন মান আর উচ্চ দাম তাঁকে এই ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলে। তিনি বিরো ভাইদের প্যাটেন্টের জন্য তাদের রয়ালিটি দিয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি দুই বছর ধরে বাজারে প্রচলিত সব বলপয়েন্ট কলম নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যান। ১৯৫২ সালে সব সমস্যা দূর করে তিনি নিয়ে আসেন কম দামে অসাধারণ এক বলপেন  যার নাম ছিল Ballpen BIC.

শেষ কথা:

সভ্যতার প্রয়োজনে মানুষ কলমের বিভিন্ন রূপান্তর ঘটিয়েছিল। পরবর্তীতে মানুষের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গী হয়ে ওঠে এই বলপয়েন্ট। এখন ৫ টাকা থেকে ১০ টাকাতেই ভালো মানের বলপয়েন্ট কলম পাওয়া যায়। বাহারি এসব কলমের পেছনের ইতিহাসটা কিন্তু মোটেও সহজ ছিল না। আজকে মানুষের এই উন্নতির সময়ে বলপয়েন্ট কলম অভাবনীয় গুরুত্ব রেখেছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই!

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button

Adblock Detected

Dear Viewer, Please Turn Off Your Ad Blocker To Continue Visiting Our Site & Enjoy Our Contents.