ক্রিকেটখেলাধুলা

ক্রিকেট ইতিহাসে “দানবীয়” গতির দশ ডেলিভারি!

শোয়েব আকতারের বোলিংয়ের বিপক্ষে সৌরভ গাঙ্গুলীর পিচে ছটফট করা কিংবা অ্যালান ডোনাল্ডের গতির সামনে আজহারউদ্দিনের লম্ফঝম্ফ ছিল ক্রিকেটীয় আচারের যুগান্তকারী সংযোজন। পিউর ক্লাস কিংবা ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান ব্র্যাডম্যানকেও লারউডের গতি দিয়েই অসস্তিতে ফেলা হয়েছিল বারংবার। দুর্দমনীয় রান বন্যাকে দমন করেছিলেন সেই সিরিজে।

ক্রিকেট শুরুর মাঝামাঝি এক পর্যায়ে ক্রিকেটে একটা কথার প্রচলন ছিল ‘যত গতি ঠিক ততই ক্ষতি’। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে সে ধারণা বিলুপ্ত হয়ে বিপরীত ফলাফল দার করিয়ে গেছে ক্রিকেট ময়দানে। ক্রিকেট গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা, দুর্দমনীয় গতি সেই অনিশ্চয়তার মাত্রাকে বহুগুণে বাড়িয়ে ক্রিকেটকে আরও উপভোগ্য করেছে শতরুপে শতবার। একজন শোয়েব আক্তার কিংবা একজন ডেল স্টেইন নৈপুণ্যে অনিশ্চয়তার ডানায় চড়ে ক্রিকেটের সৌর্ন্দয্য ছাড়িয়ে গেছে নতুন মাত্রায়।

শোয়েব আকতারের বোলিংয়ের বিপক্ষে সৌরভ গাঙ্গুলীর পিচে ছটফট করা কিংবা অ্যালান ডোনাল্ডের গতির সামনে আজহারউদ্দিনের লম্ফঝম্ফ ছিল ক্রিকেটীয় আচারের যুগান্তকারী সংযোজন। পিউর ক্লাস কিংবা ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান ব্র্যাডম্যানকেও লারউডের গতি দিয়েই অসস্তিতে ফেলা হয়েছিল বারংবার। দুর্দমনীয় রান বন্যাকে দমন করেছিলেন সেই সিরিজে।

তবে এই গতি পরিমাপ করার কোনো গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি ক্রিকেটে ছিল না একসময়। এরপর একে একে আসতে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তি। সময়ের বিবর্তনে  ক্রিকেটে বোলিংয়ের গতি পরিমাপ করার জন্য রাডার গান ব্যবহার শুরু করে ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা। গতিশীল বলের গতি কোনো ত্রুটি ছাড়াই এর সাহায্যে সঠিকভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হয়। এই রাডার গান ব্যবহার করে এখন পর্যন্ত আইসিসির অনুমোদিত অফিসিয়াল টুর্নামেন্ট কিংবা সিরিজের গ্রহণযোগ্য যে রেকর্ডগুলো সংরক্ষিত করা হয়েছে, আমরা আজ তার মাঝে প্রথম ১০টি সম্পর্কে জানব।

১০. ডেল স্টেইন: ১৫৬.২ কি.মি./ঘণ্টা

২০০০ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১৫৫.৭ কি.মি./ঘণ্টা গতির একটি রেকর্ড গড়েন তিনি নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। পরবর্তীতে ২০১০ সালে আইপিএল এ কলকাতা নাইট রাইডার্সের বিপক্ষে নিজের রেকর্ড ভেঙ্গে ১৫৬.২ কি.মি./ঘণ্টা গতির রেকর্ড গড়েন।

৯. শেইন বন্ড: ১৫৬.৪ কি.মি./ঘণ্টা

শেইন বন্ডকে বলা হয় অভাগা একজন ফাস্ট বোলার, যার ক্যারিয়ার সংক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিল শুধুমাত্র ইনজুরির কারণে। ভিন্ন ধরনের স্টাইলের কারণেও অনেক ক্রিকেটপ্রেমীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিলেন তিনি। ২০০৩ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১৫৬.২ কি.মি./ঘণ্টা গতির রেকর্ডটিও করেন তিনি।

০৮. মোহাম্মদ সামি: ১৫৬.৪ কি.মি./ঘণ্টা

ওয়াসিম এবং ওয়াকারের শেষের দিকে তার ক্যারিয়ার শুরু হওয়ায় ভাবা হয়েছিল তিনি হবেন তাদের উত্তরসূরী। কিন্তু গতির সাথে লাইন-লেংথের সমন্বয় করতে না পারায় ক্যারিয়ারটা হয়ে যায় খুবই সংক্ষিপ্ত।  ২০০৩ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৫৬.৪ কি.মি./ঘণ্টা গতির বলটি করেন সামি।

০৭. মিচেল জনসন: ১৫৬.৮ কি.মি./ঘণ্টা

২০১৩ সালের অ্যাশেজে তিনি নিয়মিত ১৫০+ কি.মি./ঘণ্টা গতিতে বল করে ইংলিশ ব্যাটসম্যানদেরকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়ে আলোচনায় আসেন। এই সিরিজেরই চতুর্থ টেস্টে ১৫৬.৮ কি.মি./ঘণ্টা গতিতে বল করে রেকর্ডটি করেন তিনি। একই সাথে সেই সময়ের অন্যতম সেরা গতিশীল বোলার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এই অস্ট্রেলিয়ান।

০৬. ফিডেল অ্যাডওয়ার্ডস: ১৫৭.৭ কি.মি./ঘণ্টা

২০০৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওয়ান্ডারার্সে একটি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে তিনি এই কৃতিত্ব গড়েন তিনি । ফিডেল সমসাময়িক যুগে সেই পাল্লায় আর যোগ দিতে পারেননি কোনো বোলার। অনেকদিন অক্ষত ছিল তার এই গতির রেকর্ড।

০৫. অ্যান্ডি রবার্টস: ১৫৯.৫ কি.মি./ঘণ্টা

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিখ্যাত পেস আক্রমনের অন্যতম সদস্য ছিলেন অ্যান্ডি রবার্টস। হোল্ডিং, মার্শাল, গার্নার কিংবা রবার্টস- প্রত্যেকেই গতিতে সেরা হলেও তার যুগের বেশিরভাগ ব্যাটসম্যান গতিশীল বলে তাকেই স্বীকৃতি দিয়েছেন। ১৯৭৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়াকা গ্রাউন্ডে তিনি এই রেকর্ড গড়েন।

০৪. জেফ্রি থমসন: ১৬০.৬ কি.মি./ঘণ্টা

থমসনের যুগের অনেক ব্যাটসম্যানদের বিশ্বাস, তিনি পরবর্তী যুগের ব্রেট লি কিংবা শোয়েব আকতারের চেয়েও বেশি গতিতে বোলিং করা একমাত্র ব্যক্তি। ক্যারিয়ারে চূড়ান্ত সময়ে কিউইদের বিপক্ষে ১৬০.৬ গতির কামান ছোড়েন তিনি।

০৩. শন টেইট: ১৬১.১ কি.মি./ঘণ্টা

খুবই অল্প সময়ের ক্যারিয়ার ছিল এই অস্ট্রেলিয়ান বোলারের। কিন্তু যতদিন খেলে গিয়েছেন, ততদিন গতির সাথে আপোষ করেননি। প্রথাগত ফাস্ট বোলারদের মতো উচ্চতা না পাওয়া সত্ত্বেও তার বোলিংয়ে পেস এবং স্কিডের সাথে সাথে লাইন-লেংথও ভালো ছিল। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২০১০ সালে নেপিয়ারে তিনি এই রেকর্ডটি গড়েন।

০২. ব্রেট লি: ১৬১.১ কি.মি./ঘণ্টা

শোয়েব আকতারের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বীই ছিলেন এই অস্ট্রেলিয়ান পেসার। ক্যারিয়ারের একটা সময় তিনিও অনবরত ১৫০ কি.মি./ঘণ্টা গতিতে বল করে যেতেন। ২০০৫ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে একটি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে তিনি ১৬১.১ কি.মি./ঘণ্টা গতিতে বল করেন। ইতিহাসের দ্বিতীয় বোলার হিসেবে তিনি ১০০ মাইল/ঘণ্টার রেকর্ড স্পর্শ করেন।

০১. শোয়েব আকতার: ১৬১.৩ কি.মি./ঘণ্টা

ফাস্ট বোলাররা যদি ঘণ্টায় ১০০ মাইল গতিতে বল করতে পারেন, তাহলে সেটি বিবেচিত হয় অসামান্য অর্জন হিসাবে। এই অর্জনটি যে মোটেই সহজ কোনো বিষয় নয়, সেটি রেকর্ড দেখলেই বুঝতে পারা যায়। ক্রিকেট ইতিহাসের অফিশিয়াল ম্যাচ বিবেচনা করলে, এই কাজটি এ পর্যন্ত কেবলমাত্র একজন বোলারই করতে পেরেছেন। তিনি হলেন শোয়েব আকতার। ২০০৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের নিক নাইটের বিপক্ষে তিনি একটি বল করেছিলেন ১৬১.৩ কি.মি./ঘণ্টা গতিতে। ক্যারিয়ারের একটা সময়ে তিনি প্রতিনিয়ত ১৫০ কি.মি./ঘণ্টা গতিতে বল করে যেতেন।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে গতির ডেলিভারির বিশ্ব রেকর্ড শোয়েব আখতারের দখলে। ২০০২ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে ১৬১.১ কিমি. প্রতি ঘণ্টা বেগে একটি বল করেছিলেন শোয়েব। যা এখনও সবচেয়ে বেশি গতির ডেলিভারি হিসেবে স্বীকৃত।

কিন্তু শোয়েবেরই স্বদেশি পেসার মোহাম্মদ সামির দাবি, তিনি এই রেকর্ড ভেঙেছেন। তাও কি না একবার নয়, দুই দুইবার! সম্প্রতি পাক টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ দাবি করেছেন সামি। স্পিড গানে সমস্যা বলে রেকর্ড হিসেব করা হয়নি- এমনটাই দাবি তার।

সামি বলেছেন, ‘একটি ম্যাচে আমি দুইটি ডেলিভারি করেছিলাম ঘণ্টায় ১৬০ কিমির বেশি গতিতে। একটি ছিল ১৬২, অন্যটি ১৬৪! এরপর আমাকে বলা হলো যে স্পিড গান কাজ করছে না, তাই এগুলো হিসেবে আনা হবে না।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘তাই এ বলগুলো রেকর্ড হিসেবে রাখা হয়নি। কিন্তু আপনি যদি সবমিলিয়ে দেখেন ১৬০ কিমির বেশি গতিতে করা বলের সংখ্যা খুব কম, মাত্র এক-দুইটি। বিষয়টা এমন নয় যে ধারাবাহিকভাবে এই গতি বল করা যায়। মাঝেমধ্যে হয়ে থাকে এমন।’

পাকিস্তানের হয়ে ৩৬ টেস্ট, ৮৭ ওয়ানডে ও ১৩ টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন সামি। ক্যারিয়ারজুড়ে নিয়মিতই ১৪৫-১৫০ কিমি. প্রতি ঘণ্টা বেগে বোলিং করেছেন তিনি। তিন ফরম্যাট মিলে সামির উইকেটসংখ্যা ২২৭টি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button